দেশের ৩০ হাজার ৭৮৩টি বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবি জানিয়েছে শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোট। শিক্ষক-কর্মচারীদের বৈষম্য দূর করা, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত এবং অভিভাবকদের আর্থিক চাপ কমানোর লক্ষ্যে এ দাবি জানানো হয়েছে।
রোববার (৪ অক্টোবর) বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেয় সংগঠনটি।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, একটি দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হলো যুগোপযোগী ও মানসম্মত শিক্ষা। অথচ বাংলাদেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার প্রায় ৯৮ শতাংশের বেশি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
এতে আরও বলা হয়, একই শিক্ষাক্রম, একই পাঠ্যপুস্তক এবং একই সর্বজনীন শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেও সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন-ভাতা, উৎসব ভাতা, চিকিৎসা ভাতা ও বাড়িভাড়ায় বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। এই অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বৈষম্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অন্যতম অন্তরায়। বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রেক্ষাপটে শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকারকে বৈষম্যমুক্ত করা সময়ের দাবি বলেও স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোট বলেছে, এতে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় গুণগত মান ও স্বচ্ছতা বাড়বে এবং শিক্ষার সামগ্রিক মানও উন্নত হবে। পাশাপাশি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বেতন ও আনুষঙ্গিক ফি তুলনামূলক বেশি হওয়ায় সাধারণ পরিবারের ওপর যে বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে, জাতীয়করণের মাধ্যমে তা কমানো সম্ভব হবে বলে স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে জাতীয়করণ বাস্তবায়ন হলে প্রান্তিক ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানদের মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।
স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়, দীর্ঘমেয়াদে বৈষম্যহীন ও মানসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হবে। এর মাধ্যমে দেশের জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এ অবস্থায় দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয়করণ করে শিক্ষক-কর্মচারীদের বিদ্যমান বৈষম্য দূর করা এবং সবার জন্য সমান ও মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ হলে সরকারকে মোট ২৬ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা দিতে হবে বলে স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে সরকার বেতন-ভাতা বাবদ ১৭ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা দিচ্ছে। অতিরিক্ত দিতে হবে ৯ হাজার ১০০ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠান থেকে সরকারের আয় হবে ৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। ডিগ্রি পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জাতীয়করণ করা হলে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ৭০০ কোটি টাকা লাগবে।
এতে বলা হয়, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালের ১ জানুয়ারি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের প্রথম জাতীয় বেতনস্কেলে অন্তর্ভুক্ত করে বেতনের ৫০ শতাংশ প্রদান করেন। এ ছাড়া তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দুই দফায় ২০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধিসহ অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্ট গঠনের মাধ্যমে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মলিন মুখে হাসি ফোটান। এ ছাড়াও কর্মচারীদের ৫০ শতাংশ এবং শিক্ষকদের জন্য ২৫ শতাংশ উৎসব ভাতা প্রদান করেন।
স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়, বেগম খালেদা জিয়া শিক্ষকদের সমাবেশে ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমার সরকার ক্ষমতায় গেলে সব বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হবে।’
এ ছাড়া ২০২৪ সালে বিশ্ব শিক্ষক দিবসে লন্ডন থেকে স্কাইপির মাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আমার সরকার ক্ষমতায় গেলে শিক্ষকদের আন্দোলন সংগ্রাম করতে হবে না। জাতীয়করণের চেয়েও আপনাদের অধিক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হবে এবং শিক্ষকদের সম্মান ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করা হবে’—স্মারকলিপিতে এমনটাই উল্লেখ করা হয়েছে।
সময়ের আলো/জেডি