ডেটে যাওয়ার আগে সাধারণত সাজগোজ ও পরিচ্ছন্নতার দিকে বাড়তি নজর থাকে। পছন্দের পোশাক, চুলের স্টাইল, হালকা পারফিউম কিংবা ডিওডোরেন্ট- সবকিছুতেই থাকে প্রস্তুতি। তবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এর ঠিক বিপরীত এক প্রবণতা। নাম ‘ফেরোমোন ম্যাক্সিং’।
এই ট্রেন্ডের অনুসারীদের দাবি, ডেটে যাওয়ার আগে গোসল না করে এবং ডিওডোরেন্ট ব্যবহার না করে শরীরের স্বাভাবিক গন্ধ ধরে রাখলে নাকি অন্য ব্যক্তির কাছে আরও আকর্ষণীয় হওয়া যায়। কেউ কেউ এমনকি না ধোয়া পোশাক পরার কথাও বলছেন। তাদের ধারণা, শরীরের স্বাভাবিক গন্ধ যতটা স্পষ্ট থাকবে, আকর্ষণও তত বাড়বে।
ফেরোমোন ম্যাক্সিংয়ের মূল ধারণা হলো, মানুষের শরীর থেকে বের হওয়া স্বাভাবিক রাসায়নিক সংকেত বা গন্ধ অন্য ব্যক্তির মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। তাই অতিরিক্ত সাবান, গোসল, ডিওডোরেন্ট বা পারফিউম দিয়ে শরীরের নিজস্ব গন্ধ পুরোপুরি ঢেকে না রেখে, তা স্বাভাবিকভাবে থাকতে দেওয়াকেই আকর্ষণ বাড়ানোর উপায় হিসেবে দেখছেন এই ট্রেন্ডের অনুসারীরা।
প্রাণীদের ক্ষেত্রে ফেরোমোনের মাধ্যমে রাসায়নিক সংকেত আদান-প্রদানের বিষয়টি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। মানুষের শরীরের গন্ধ অন্য মানুষের শারীরিক বা মানসিক প্রতিক্রিয়ায় কোনোভাবে প্রভাব ফেলতে পারে- এমন কিছু গবেষণার ইঙ্গিতও রয়েছে। তবে মানুষের ক্ষেত্রে এমন কোনো নির্দিষ্ট ‘লাভ কেমিক্যাল’ এখনো শনাক্ত করা যায়নি, যা শরীর থেকে বের হয়ে অন্য কাউকে সরাসরি প্রেমে পড়তে বা যৌনভাবে আকৃষ্ট করতে পারে।
মানুষের স্বাভাবিক শরীরের গন্ধ আকর্ষণে কোনো ভূমিকা রাখে কি না, তা বোঝার জন্য ‘সোয়েটি টি-শার্ট’ ধরনের পরীক্ষাও করা হয়েছে। এসব গবেষণায় শরীরের স্বাভাবিক গন্ধ নিয়ে কিছু আকর্ষণীয় ফল পাওয়া গেলেও, সেখান থেকে এমন সিদ্ধান্তে আসার সুযোগ নেই যে গোসল না করলেই কারও প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যাবে।
শরীরের গন্ধ একজন মানুষকে অন্যের কাছে কিছুটা পরিচিত, পছন্দনীয় বা অপছন্দনীয় মনে হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু সেটিকে সরাসরি যৌন আকর্ষণ বা প্রেমে পড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। পরবর্তী গবেষণাগুলোতেও এ বিষয়ে মিশ্র ফল পাওয়া গেছে।
আসলে, প্রাকৃতিক গন্ধ এবং অপরিষ্কার থাকা এক বিষয় নয়। প্রত্যেক মানুষের শরীরের নিজস্ব গন্ধ থাকা স্বাভাবিক। জিনগত বৈশিষ্ট্য, খাবার, পরিবেশ এবং শরীরের স্বাভাবিক রাসায়নিক প্রক্রিয়াসহ বিভিন্ন বিষয় এতে প্রভাব ফেলে।
অন্যদিকে, ইচ্ছাকৃতভাবে দীর্ঘ সময় গোসল না করা বা অপরিষ্কার পোশাক পরাকে ‘প্রাকৃতিক গন্ধ ধরে রাখা’র সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়। শরীরে ঘাম, তেল, মৃত কোষ ও ব্যাকটেরিয়া দীর্ঘ সময় জমে থাকলে দুর্গন্ধ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ত্বকের বিভিন্ন সমস্যার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
তাই ডেটে যাওয়ার আগে শুধু শরীরের স্বাভাবিক গন্ধের ওপর ভরসা করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। গোসল করা, পরিষ্কার পোশাক পরা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিমিত ডিওডোরেন্ট বা সুগন্ধি ব্যবহার করাই ভালো।
মনে রাখতে হবে, আকর্ষণ শুধু গন্ধের ওপর নির্ভর করে না। কথাবার্তার ধরন, আত্মবিশ্বাস, আচরণ, ব্যক্তিত্ব, পরিচ্ছন্নতা এবং অন্য ব্যক্তির প্রতি সম্মান- সবকিছু মিলেই তৈরি হয় সম্পর্কের রসায়ন। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো ট্রেন্ড অনুসরণ করার আগে এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ও বাস্তব প্রভাব সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
সূত্র : ফাস্টপোস্ট, ইন্ডিয়া টুডে
সময়ের আলো/মহু