অটোর ভারে ন্যুব্জ নগর

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

ছয় বছরের আইমুনাকে নিয়ে এখন প্রায়ই ডাক্তারের কাছে যেতে হয় তার মা আসিয়াকে। প্রতিদিন সকালে মানুষের বাসায় কাজ করতে বের

2026-10-06T02:08:19+00:00
2026-10-06T02:08:19+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬,
২১ আশ্বিন ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬
জাতীয়
অটোর ভারে ন্যুব্জ নগর
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬, ২:০৮ এএম 
হাইকোর্টের সামনে সমাবেশে আসা রিকশার তার ছিঁড়ে নিচ্ছেন বিক্ষোভকারীরা । ছবি : সময়ের আলো
ছয় বছরের আইমুনাকে নিয়ে এখন প্রায়ই ডাক্তারের কাছে যেতে হয় তার মা আসিয়াকে। প্রতিদিন সকালে মানুষের বাসায় কাজ করতে বের হন তিনি। এলাকার কয়েকটি বাসায় কাজ শেষে যখন ফেরেন, তখন সন্ধ্যা নেমে আসে। গুলবাগের ঝিলপাড়ে তাদের ছোট্ট ঘরে ঢুকতেই মেয়ের কাশির শব্দ শুনতে পান। সেই কাশি মায়ের বুকের ভেতরটায় কেমন যেন তোলপাড় করে।

মেয়েকে নিয়ে শাহজাহানপুরের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের এক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন আসিয়া। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসক জানান, আইমুনার শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে শরীরে সিসা প্রবেশ করছে। কিন্তু কোথা থেকে আসছে সেই সিসা?

আসিয়াদের ঘরের পাশেই একটি অটোরিকশার গ্যারেজ। সেখানে থাকে ৩০টিরও বেশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। প্রতিটি গাড়ির ব্যাটারিতে থাকা সিসা যে আশপাশের পরিবেশে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তা জানতেন না গ্যারেজের আশপাশের বাসিন্দারা। চিকিৎসকের পরামর্শে বিষয়টি জানার পর তাদের সেই অজানা ঝুঁকির দিকটিই সামনে আসে।

একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় সাধারণত লেড-অ্যাসিড বা সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারিতে ব্যবহার করা হয়। একটি ১২ ভোল্টের ব্যাটারিতেও সিসা থাকে। চার্জ দেওয়া, ব্যাটারি পরিবর্তন কিংবা পুরোনো ব্যাটারি ব্যবস্থাপনার সময় সিসাজাত উপাদান পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন এমন পরিবেশে থাকলে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

রাজধানীর চিত্র আরও উদ্বেগের। গুলবাগ, শান্তিবাগ, মগবাজার, শাহজাহানপুর, মুগদা, বেগুনবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, বেড়িবাঁধ, মিরপুর, বাড্ডা, নতুনবাজার, রামপুরা, মান্ডা, যাত্রাবাড়ী থেকে শুরু করে রাজধানীর এমন কোনো এলাকা নেই, যেখানে ব্যাটারিচালিত রিকশার দেখা মেলে না। শহরের অলিগলি থেকে প্রধান সড়কের আশপাশ— সবখানেই এখন এই বাহনের উপস্থিতি।

বদলে যাচ্ছে পেশা
শুধু যাতায়াতের চিত্রই নয়, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বদলে দিচ্ছে মানুষের পেশার ধরনও। দ্রুত নগদ আয় এবং তুলনামূলক সহজে কাজ পাওয়ার সুযোগে অনেকে ছেড়ে দিচ্ছেন পুরোনো পেশা।

জামান নামে এক তরুণ কিছু দিন আগেও সিদ্ধেশ্বরীতে গাড়ি চালাতেন। মাসে বেতন পেতেন প্রায় ২৫ হাজার টাকা। এখন তিনি অটোরিকশা চালান। গাড়ি চালানো ছেড়ে অটোতে এলেন কেন জানতে চাইলে তার সহজ উত্তর, ‘এখন নগদ ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পাই। নগদ টাকায় অনেক লাভ।’

শাহজাহানপুরে বসবাসকারী বাবুল একসময় বাসের হেলপার ছিলেন। প্রতিদিন প্রায় ৮০০ টাকা আয় করতেন। এখন অটোরিকশা চালিয়ে প্রতিদিন ১ হাজার টাকার কম নিয়ে বাড়ি ফেরেন না বলে জানান তিনি।

বাসের হেলপারির কাজ ছেড়ে অটোতে কেন জানতে চাইলে বাবুল বলেন, ‘বাসের হেলপার হয়ে রাস্তায় যাত্রী ওঠানোর জন্য চিৎকার করতে ভালো লাগে না। অটো রাত ১০টার মধ্যে বন্ধ করে বাসায় ফিরতে পারি।’

শান্তিনগরের একটি কনফেকশনারিতে কাজ করতেন সাইদুল। এখন তিনি অটোরিকশা চালান। তার চলে যাওয়ায় আক্ষেপ করে কনফেকশনারির মালিক বলেন, ‘আমার ভালো সেলসম্যানটা চলে গেল।’

এমন ঘটনা এখন বিচ্ছিন্ন নয়। ছোট কারখানা, পোশাক কারখানা কিংবা বিভিন্ন শ্রমঘন পেশা থেকে মানুষ অটোরিকশা চালানোর দিকে ঝুঁকছেন বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। এর প্রভাব পড়ছে শ্রমবাজারেও। সিলেট, ময়মনসিংহ, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষিকাজের জন্য শ্রমিক সংকটের কথাও শোনা যাচ্ছে।

কারওয়ান বাজারের একটি মুরগির আড়তে কাজ করতেন সোলায়মান। কয়েক দিন ধরে তিনি কাজে আসছিলেন না। পরে আড়ত মালিক জানতে পারেন, সোলায়মান এখন তেজগাঁওয়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালাচ্ছেন।

কত অটো, কত ব্যাটারি?
রাজধানীতে মোট কত ব্যাটারিচালিত রিকশা চলছে, তার সঠিক সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে অটো মালিক সমিতির দাবি, শুধু ঢাকা শহরেই বর্তমানে ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে।

সমিতির সভাপতির অভিযোগ, ঢাকার ১৩টি প্রবেশপথ দিয়ে প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ লাখ অটোরিকশা রাজধানীতে ঢোকে। এর বড় একটি অংশ বুড়িগঙ্গাসহ বিভিন্ন নদীর ওপার থেকে আসে বলে তার দাবি।

সংখ্যা যতই হোক, এই বিপুলসংখ্যক অটোরিকশার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ব্যাটারি চার্জের বিশাল একটি অবকাঠামো। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য গ্যারেজ ও চার্জিং পয়েন্ট। এর কিছু বৈধ হলেও অনেকেই অনুমোদনহীন বলে অভিযোগ রয়েছে।

গত শনিবার রাতে মুগদায় একটি অভিযানে এমন একটি গ্যারেজে অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের সন্ধান পাওয়া যায়। সেখানে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০টি ব্যাটারিচালিত রিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হতো বলে জানা গেছে। ওই ঘটনায় গ্যারেজের এক মালিককে গ্রেফতারের পরদিন ব্যাটারিচালিত রিকশার চালক ও মালিকরা বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। তাদের দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু রাজধানীজুড়ে ৪৮ হাজার অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের অভিযোগও সামনে এসেছে। এত বিপুলসংখ্যক পয়েন্টে প্রতিদিন যে পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে, তার চাপ শেষ পর্যন্ত পড়ছে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপরই।

সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, ১০ থেকে ১২ লাখ অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দিতে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। কোথাও কোথাও এসব গ্যারেজকে ঘিরে মাদক কারবার ও চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে।

গতি বাড়ছে, কমছে নিরাপত্তা
অটোরিকশার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে সড়কে বিশৃঙ্খলার অভিযোগও। মালিক-চালকদের বিরোধ, অবৈধ পার্কিং, গ্যারেজকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি— সব মিলিয়ে অনেক এলাকায় তৈরি হয়েছে নতুন ধরনের সমস্যা। কোনো কোনো মোড়ে অটোরিকশার জট এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, পথচারীদের রাস্তা পার হওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে। দ্রুতগতির অটোরিকশার সামনে পথচারীদের অসহায় হয়ে পড়ার অভিযোগও রয়েছে।

সম্প্রতি রাজধানীর মালিবাগ, শান্তিনগর, কাকরাইল, বেইলি রোড, শাহজাহানপুর, রামপুরা, মৌচাক ও সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় চালকদের বিক্ষোভের সময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। একপর্যায়ে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক নারী অভিভাবক তার ছোট মেয়েকে নিয়ে অটোরিকশায় করে বাড়ি ফিরছিলেন। বিক্ষোভকারীরা তাদের নামিয়ে দেওয়ার পর ওই অটোরিকশাটি ভাঙচুর করে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। এ ধরনের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রীরা। যে বাহনটি তাদের দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কথা, সেটিই কখনো কখনো হয়ে ওঠে দুর্ভোগের কারণ।

অটোর বদলে প্যাডেলেই আস্থা আবুলের
গুলবাগের প্যাডেলচালিত রিকশাচালক আবুলকে অনেকবার অটোরিকশা চালানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি রাজি হননি। কেন অটো চালাতে চান না জানতে চাইলে তার সরল উত্তর, ‘অটো চালালে আমি কয়েক দিনের মধ্যে প্রতিবন্ধী হয়ে যাব।’ নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি আরও বলেন, এখন মানুষ অল্প দূরত্বেও অটোরিকশায় চড়ে। এমনকি সকালে সিদ্ধেশ্বরীর পার্কে হাঁটতে যাওয়া মানুষও অনেক সময় অটোরিকশা ব্যবহার করেন। তার মতে, এতে মানুষের হাঁটার অভ্যাসও কমে যাচ্ছে।

গবেষক আরশাদ আজিজও মনে করেন, সহজলভ্য ব্যাটারিচালিত রিকশার কারণে মানুষের হাঁটার প্রবণতা কমছে। তার মতে, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে মানুষের শারীরিক সুস্থতার ওপর। আগে যে দূরত্ব মানুষ হেঁটে কিংবা প্যাডেলচালিত রিকশায় যেতেন, এখন অটোরিকশা সহজলভ্য হওয়ায় সেই দূরত্বেও অনেকে মোটরচালিত বাহন বেছে নিচ্ছেন। দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর সুবিধাটিই সেখানে মুখ্য হয়ে উঠছে।

ব্যাটারির সিসা, বাতাসের অদৃশ্য ঝুঁকি
পদ্মা ডায়াগনস্টিকের চিকিৎসক হারানাথ দেবনাথ অটোরিকশার ব্যাটারি ও পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বলেন, মানুষের অজান্তেই ব্যাটারির ক্ষতিকর উপাদান শরীরে প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ করে সিসার সংস্পর্শ দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন। তার ভাষায়, সিসা কখন নাক-মুখ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করছে, অনেক সময় তা বোঝার উপায় থাকে না। কিন্তু দীর্ঘদিনের সংস্পর্শের পর এর নেতিবাচক প্রভাব ধরা পড়তে পারে।

আইমুনার কাশি তাই শুধু একটি শিশুর অসুস্থতার গল্প নয়। তার ছোট্ট ঘরের পাশের গ্যারেজ, সারি সারি অটোরিকশা, ব্যাটারির চার্জিং আর বাতাসে মিশে থাকা সম্ভাব্য দূষণ— সব মিলিয়ে এটি ঢাকার দ্রুত বদলে যাওয়া নগরজীবনেরই একটি ছোট ছবি।

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা মানুষের চলাচল সহজ করেছে, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে, অনেকের আয় বাড়িয়েছে। কিন্তু সেই সুবিধার পাশাপাশি ব্যাটারি বর্জ্য, চার্জিং ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ ব্যবহার, সড়ক নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়গুলোও সামনে এসেছে। এখন প্রশ্ন হলো— এই বাহনের বিস্তারকে কীভাবে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনা যায়, যাতে মানুষের চলাচলের সুবিধা বজায় থাকে, আবার আইমুনাদের মতো শিশুদের স্বাস্থ্যও ঝুঁকির মুখে না পড়ে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা
  বিষয়:   যাতায়াত  চিত্র  ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা  পেশা  নগদ  আয়  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: