একসময় কোনো প্রসাধনীর গায়ে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা দেখলে অনেক ক্রেতার মধ্যেই তৈরি হতো দ্বিধা। ত্বক ও চুলের যত্নের পণ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে উপাদান, মান ও নিরাপত্তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই থাকে বাড়তি সতর্কতা। তাই বিদেশি ব্র্যান্ডের পণ্যকে তুলনামূলক বেশি নির্ভরযোগ্য মনে করার প্রবণতা ছিল। কোরিয়া, ভারত, থাইল্যান্ড কিংবা ইউরোপের বিভিন্ন দেশের প্রসাধনী মানেই যেন বেশি ভালো, এমন একটি ধারণাও দীর্ঘদিন ধরে বাজারে ছিল।
অন্যদিকে দেশীয় পণ্যকে অনেকেই দেখতেন সাশ্রয়ী বিকল্প হিসেবে। তবে সেই চিত্র এখন ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। বিউটি শেলফে স্থানীয় ব্র্যান্ডের ক্লিনজার, সানস্ক্রিন, সিরাম, হেয়ার অয়েল কিংবা অন্যান্য পণ্য বিদেশি ব্র্যান্ডের পাশেই জায়গা করে নিচ্ছে। ক্রেতারাও শুধু পণ্যটি দেশি না বিদেশি, সেটি দেখেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না। বরং উপাদান, কার্যকারিতা, উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা হয়ে উঠছে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা।
ক্রেতাদের এই পরিবর্তনটি খুব কাছ থেকে দেখেছেন সাজগোজ লিমিটেডের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও চিফ কনটেন্ট অফিসার সিনথিয়া শারমিন ইসলাম। তার মতে, শুরুতে ক্রেতাদের বড় একটি প্রশ্ন ছিল পণ্যটি দেশে তৈরি নাকি বিদেশ থেকে এসেছে। এখন প্রশ্নের ধরন বদলে গেছে। পণ্যে কত শতাংশ নিয়াসিনামাইড রয়েছে, ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়েছে কি না, ঢাকার আর্দ্র আবহাওয়ায় তৈলাক্ত ত্বকে সেটি কেমন কাজ করবে, এমন নির্দিষ্ট প্রশ্নই বেশি আসছে।
ক্রেতার এই অনুসন্ধিৎসা স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর জন্য যেমন সম্ভাবনা তৈরি করছে, তেমনি বাড়াচ্ছে দায়বদ্ধতাও। শুধু আকর্ষণীয় প্যাকেজিং বা প্রচারণা দিয়ে এখন ক্রেতার আস্থা ধরে রাখা কঠিন।
কোভিড-১৯ মহামারি ও পরবর্তী সময়ে আমদানি করা পণ্যের প্রাপ্যতায় নানা পরিবর্তন স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর সামনে নতুন সুযোগ তৈরি করে। এই সময়ে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের পণ্য, ফর্মুলেশন ও উৎপাদন প্রক্রিয়া নিয়ে আরও বেশি কাজ করার সুযোগ পায়। ফলে প্রতিযোগিতাও ধীরে ধীরে দামের গণ্ডি ছাড়িয়ে মান ও কার্যকারিতার দিকে এগোয়।
স্পষ্ট উপাদান তালিকা, পণ্যের কার্যকারিতা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য, তৃতীয় পক্ষের পরীক্ষা কিংবা বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন এখন ক্রেতাদের কাছে বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে। অর্থাৎ পণ্যটি কোথায় তৈরি হয়েছে, তার চেয়ে সেটি কীভাবে তৈরি হয়েছে এবং ব্যবহারকারীর জন্য কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্ন সামনে আসছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিউটি কমিউনিটি, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ব্যবহারকারীদের রিভিউও এই পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে। একটি পণ্য কেনার আগে এখন ক্রেতারা বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ও তথ্য যাচাই করার সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে প্রচারের পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতাও হয়ে উঠছে গুরুত্বপূর্ণ।
সাজগোজ লিমিটেডের অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট ফারহানা এ. প্রীতির বলেন, অফার বা ছাড় একজন ক্রেতাকে প্রথমবার কোনো পণ্য ব্যবহারে আগ্রহী করতে পারে। কিন্তু তাকে আবার ফিরিয়ে আনতে হলে পণ্যের কার্যকারিতা ও মানের ওপরই নির্ভর করতে হয়।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বিউটি বাজারে মেড ইন বাংলাদেশ পরিচয়টি এখন আর শুধু সাশ্রয়ী দামের সঙ্গে যুক্ত নয়। স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর সামনে এখন বড় প্রশ্ন হলো, তারা কতটা ধারাবাহিকভাবে মান, কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারছে। আর ক্রেতারাও লেবেল দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বদলে লেবেলের ভেতরের তথ্য পড়তে শিখছেন। এই পরিবর্তনই দেশের সৌন্দর্য পণ্যের বাজারে তৈরি করছে নতুন প্রতিযোগিতার গল্প।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা