নদী-সাগর থামলেও, থামবে না জেলেদের সংসারের হিসাব

হাতিয়া (নোয়াখালী) প্রতিনিধি

সারাদেশ

মেঘনার বুক তখনও ব্যস্ত। কোথাও জাল ফেলে মাছের অপেক্ষায় জেলেরা, কোথাও মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরছে নৌকা। মাঝিদের চোখে শেষবারের মতো

2026-10-07T19:08:22+00:00
2026-10-07T19:08:22+00:00
 
  বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬,
২২ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা
নদী-সাগর থামলেও, থামবে না জেলেদের সংসারের হিসাব
হাতিয়া (নোয়াখালী) প্রতিনিধি
প্রকাশ: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:০৮ পিএম 
নিষেধাজ্ঞার আগের শেষ দিনে হাতিয়ার মেঘনা নদীতে মাছধরা ট্রলার। ছবি : সময়ের আলো
মেঘনার বুক তখনও ব্যস্ত। কোথাও জাল ফেলে মাছের অপেক্ষায় জেলেরা, কোথাও মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরছে নৌকা। মাঝিদের চোখে শেষবারের মতো যতটা সম্ভব মাছ তুলে নেওয়ার তাড়া। কারণ রাত ১২টা পেরোলেই নদী তাদের জন্য বন্ধ। নৌকা ফিরবে ঘাটে, জাল উঠবে তীরে। শুরু হবে ২২ দিনের অপেক্ষা। তবে নদীতে মাছ ধরা বন্ধ হলেও জেলেদের সংসারের খরচ থেমে থাকবে না। নৌকার কিস্তি, শ্রমিকের বেতন, বাজার-সদাই, পুরোনো দেনা, সবই থেকে যাবে। ফলে মা ইলিশ রক্ষায় সরকারের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা একদিকে যেমন ইলিশের প্রজনন রক্ষার বড় উদ্যোগ, অন্যদিকে হাতিয়ার জেলে পরিবারগুলোর কাছে এটি আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যাওয়ার কঠিন সময়।

বুধবার (৭ অক্টোবর) নিষেধাজ্ঞার আগের শেষ দিনে হাতিয়ার মেঘনা নদী ও মাছঘাটগুলো ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে।

সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত নদী ও সাগরে সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ থাকবে। এ সময়ে মাছ ধরা, পরিবহন ও মজুতের ওপরও নিষেধাজ্ঞা থাকবে। নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে মৎস্য বিভাগের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নদীতে অভিযান চালাবেন।

বুধবার সকালে হাতিয়ার চেয়ারম্যান ঘাট থেকে স্পিডবোটে মেঘনায় যাওয়ার সময় চোখে পড়ে বেশ কয়েকটি মাছ ধরার নৌকা। কোনো নৌকা জাল ফেলেছে, কোনোটি আবার ধরা মাছ নিয়ে ফিরছে। নিষেধাজ্ঞা আসন্ন এ কথা জেনেও শেষ সময়টুকু কাজে লাগাতে ব্যস্ত জেলেরা।

সুখচর ইউনিয়নের বাসিন্দা নবীর উদ্দিন (৪০) একটি মাছ ধরার নৌকার মাঝি। তার নৌকায় কাজ করেন আটজন। মৌসুমের শুরু থেকে নদীতে মাছের সংকট থাকায় ভালো সময় কাটেনি তাদের। তবে গত দুই সপ্তাহে মাছ কিছুটা বাড়ায় আশার আলো দেখেছিলেন তারা।

নবীর উদ্দিন বলেন, মৌসুমের শুরু থেকে নদীতে মাছ ধরে লাভের মুখ দেখিনি। গত দুই সপ্তাহ ধরে ভালো মাছ ধরা পড়ছে। এখন আবার নিষেধাজ্ঞা। কাল থেকে বেকার থাকতে হবে। আগের দেনাও পরিশোধ করতে পারিনি। এ বছর পেটে-ভাতে থাকতে হবে।

তার কথায় শুধু একজন জেলের হতাশা নয়, ফুটে ওঠে নদীনির্ভর একটি পরিবারের অনিশ্চয়তা। মাছ ধরাই যাদের প্রধান আয়ের উৎস, তাদের কাছে ২২ দিন মানে ঘরে বসে থাকা নয়; বরং আয় ছাড়া সংসার চালানোর হিসাব।

নবীর উদ্দিনের পাশেই জাল ফেলে অপেক্ষা করছিলেন আব্দুল মাঝি। তিনি বলেন, আমার নৌকায় কাজ করেন ১০ জন মাঝি-মাল্লা। এর মধ্যে পাঁচজন বেতনভুক্ত শ্রমিক। মৌসুমের শুরুতে নদীতে মাছ কম থাকায় নৌকা নিয়ে নিয়মিত মাছ ধরতে নামিনি। প্রায় দুই সপ্তাহ আগে মাছ ধরতে শুরু করি। এর মধ্যেই শুরু হচ্ছে নিষেধাজ্ঞা। তাদের বেতন দিয়েই এখনো লাভের মুখ দেখিনি। এখন সরকার নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। আইন মেনে তীরে অবস্থান করব।

তবে নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে মাছ পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে তার। বর্ষা মৌসুম শেষের দিকে। ২২ দিন পর নদীতে নেমে আগের মতো মাছ পাওয়া যাবে কি না, সেটিই এখন তার প্রশ্ন।

মাছ ধরার পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়বে হাতিয়ার মাছঘাট ও আড়তগুলোতেও। বুধবার চেয়ারম্যান ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, ব্যবসায়ীরা শেষ করছেন হিসাব-নিকাশ। জেলেদের কাছ থেকে মাছ কেনা, পাওনা পরিশোধ, কর্মচারীদের ছুটি সবকিছু গুছিয়ে নিচ্ছেন তারা। 

সাদিয়া ফিস এজেন্সির মালিক মো. ছালা উদ্দিন বলেন, আমার আড়তে বিভিন্ন জেলার নৌকা মাছ বিক্রি করে। নিষেধাজ্ঞা শুরু হলে তারা নিজ নিজ জেলায় চলে যাবে। তাই সবার হিসাব বুঝিয়ে দিচ্ছি। আগামীকাল থেকেই তার আড়ত বন্ধ থাকবে। কর্মচারীদেরও ২২ দিনের ছুটি দেওয়া হবে। মৌসুমের শেষ সময়ে নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ায় নিষেধাজ্ঞা শেষে আবার ব্যবসা স্বাভাবিকভাবে চালু করা যাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

হাতিয়ার ছোট-বড় প্রায় ২০টি ঘাটে রয়েছে প্রায় ১০ হাজার মাছ ধরার নৌকা। মাছঘাটগুলোকে ঘিরে শুধু জেলেদের জীবিকা নয়, গড়ে উঠেছে বড় একটি অর্থনৈতিক চক্র। মাছ ধরার নৌকার মালিক, মাঝি-মাল্লা, আড়তদার, ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, বরফ ও মাছ সংরক্ষণ সংশ্লিষ্ট মানুষ। অনেকের আয় নির্ভর করে নদী ও সাগর থেকে মাছ ওঠার ওপর।

হাতিয়া সূর্যমুখী মাছঘাটের মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি জবিয়ল হক বলেন, উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় প্রায় দুই লাখ মানুষ মাছ ধরা ও মাছ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ২৪ হাজার। নিষেধাজ্ঞার সময়ে সরকার নিবন্ধিত জেলেদের মধ্যে চাল বিতরণ করে। তবে জেলের সংখ্যার তুলনায় সহায়তার পরিমাণ কম। মা ইলিশ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা যেমন প্রয়োজন, তেমনি এ সময়ে জেলে পরিবারগুলোর খাদ্যনিরাপত্তাও নিশ্চিত করা দরকার।

হাতিয়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফয়জুর রহমান বলেন, ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। এ সময়ে জেলেরা নদী বা সাগরে মাছ ধরতে যেতে পারবেন না। সরকার এ ব্যাপারে খুবই কঠোর। নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে মৎস্য বিভাগের মোবাইল টিমের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠে থাকবে। হাতিয়ার চারপাশের মেঘনা নদীতে প্রতিদিন দুটি টিম পাহারায় থাকবে বলেও জানান তিনি। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরলে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা হবে।

সময়ের আলো/আতা
  বিষয়:   নদী  সাগর  জেলে  সংসার  নিষেধাজ্ঞা  সময়ের আলো  হাতিয়া  নোয়াখালী 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: