মানুষ মাত্রই ভুল করে— এটি কেবল একটি প্রচলিত প্রবাদ নয়, মানব অস্তিত্ব ও স্বভাবের এক অমোঘ সত্য। মানুষকে সৃষ্টিই করা হয়েছে এমনভাবে, যেখানে ভুল করার স্বভাবজাত প্রবণতার পাশাপাশি ভুল থেকে শেখার, ভালো-মন্দ বিচার করার এবং নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নিহিত রয়েছে।
সৃষ্টিকর্তা মানুষকে মেধা ও বিবেক দিয়েছেন, যাতে সে পরিস্থিতি ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে সঠিক পথ বেছে নিতে পারে। কিন্তু এই মেধা ও বিবেক থাকা সত্ত্বেও মানুষ অনেক সময় বিভ্রান্তিতে আটকে থাকে। কারণ মানুষের চিন্তাজগৎ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া কখনোই সম্পূর্ণ স্বাধীন বা একক কোনো বিষয় নয়; বরং তার চারপাশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রতিনিয়ত প্রভাবিত করে।
যখন একটি সমাজ ন্যায়ের নীতি ও সত্যের বদলে অন্যায়, অসততা ও অপরাধকে প্রশ্রয় দিতে শুরু করে, তখন মানুষের নৈতিক চেতনা ও বিবেক ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। মানুষের মনে বিবেক, প্রবৃত্তি এবং মেধার মধ্যে এক নিরন্তর মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। কখনো সে মেধার প্রয়োগ ঘটিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করে, কখনো বিবেকের দংশনে আক্রান্ত হয়, আবার কখনো প্রবৃত্তির নানা রকম প্ররোচনা ও লোভের ফাঁদে আটকা পড়ে। এই ত্রিপক্ষীয় টানাপোড়েনের কারণে অধিকাংশ মানুষ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে।
যেহেতু মানুষ এই মনস্তাত্ত্বিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারে না, তাই ভুল বা অনৈতিক কাজ থেকেও মুক্ত থাকা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের সামনে সবসময়ই একাধিক পথ খোলা থাকে— বাস্তবতার প্রভাব ও নৈতিক শক্তির ওপর নির্ভর করে সে কখনো সঠিক পথ বেছে নেয়, কখনো ভুলের পথ বেছে নেয়। কোনো না কোনো পথ বেছে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া মানবজীবনে অন্য কোনো উপায় নেই।
যেহেতু মানুষ ভুল করতে পারে এবং প্রবৃত্তি ও পরিস্থিতির কাছে পরাজিত হতে পারে, তাই সমাজে অপরাধের উপস্থিতি একটি স্বাভাবিক বাস্তবতারই অংশ। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কোনো যুগ বা সমাজ পাওয়া যাবে না, যা পুরোপুরি অপরাধমুক্ত ছিল। আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক বাস্তবতার বাইরে নয়।
তবে অপরাধের স্বাভাবিক উপস্থিতি থাকা আর অপরাধ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়ে গোটা সমাজকে বিপর্যস্ত করে দেওয়া— এই দুটির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। গত দুই বছরের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই আমাদের সমাজে অপরাধের বিস্তার ও গভীরতা কতটা সংক্রামক হয়ে উঠেছে, তার এক নির্মম ধারণা পাওয়া যায়।
বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সারা দেশে মোট ৩,৭৮৬টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছিল। কেবল হত্যা নয়, অন্যান্য সহিংস অপরাধের চিত্রও ছিল ভয়াবহ। ২০২৫ সালে চুরি ৯,৬৭২টি, ছিনতাই ১,৯৩৫টি এবং ডাকাতির ঘটনা ঘটে ৭০২টি। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক দেখা যায় অপহরণের ক্ষেত্রে; বছরটিতে ১,১০১টি অপহরণের মামলা হয়, যা আগের বছরের তুলনায় ৭১ শতাংশ বেশি!
অপরাধের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ২০২৬ সালেও অব্যাহত রয়েছে। পুলিশ সদর দফতরের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই (জানুয়ারি থেকে জুন) সারা দেশে ১,৭৭৮টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে, যা ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসের (১,৫৮৫টি) তুলনায় ১২.২ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ ২০২৬ সালের প্রথম ভাগে গড়ে প্রতিদিন ৯টির বেশি হত্যার ঘটনা ঘটেছে, যার প্রায় ৪৪ শতাংশই ঘটেছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে।
অন্যদিকে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা এক মাসেই ২,০১১টিতে গিয়ে পৌঁছেছে, যা আগের মাসের চেয়ে ৩৫.৪ শতাংশ বেশি। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, অবৈধ ও উদ্ধার না হওয়া অস্ত্রের মহড়া এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শিথিলতাই অপরাধের এই ঊর্ধ্বগতির মূল কারণ।
এসব সংখ্যা কেবল এই কথা প্রমাণ করে না যে সমাজে অপরাধ বিদ্যমান, বরং এগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে সাম্প্রতিক অপরাধের ভয়াল বিস্তার আমাদের সামাজিক নিরাপত্তাকে কতটা ভঙ্গুর করে তুলেছে। মানুষ অপরাধ করে— এটি নতুন কোনো কথা নয়; আসল প্রশ্ন হলো, অপরাধ যখন এভাবে ভয়ানক হারে বাড়তে থাকে, তখন তার পেছনে কোন কাঠামোগত দুর্বলতা কাজ করছে?
মানুষের স্বভাবজাত অপরাধপ্রবণতাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা এবং সামাজিক শান্তি রক্ষা করার উদ্দেশ্যেই জন্ম হয়েছিল সামাজিক চুক্তি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার। নাগরিকরা নিজেদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার স্বার্থেই রাষ্ট্রের হাতে আইন প্রয়োগের একচ্ছত্র অধিকার তুলে দিয়েছিল। বিনিময়ে রাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল প্রতিটি নাগরিকের জীবন ও সম্পদের সুরক্ষা প্রদান করার। তাই মানুষ যখন অপরাধের দিকে ধাবিত হয়, তখন তাকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং অপরাধীকে শাস্তির আওতায় আনার মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
কিন্তু বর্তমানে দেশে অপরাধের এই অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধির পেছনে রাষ্ট্রের চরম অবহেলা ও দায়িত্বহীনতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অপরাধ বাড়ার মূল কারণ মানুষের অপরাধপ্রবণতা নয়, বরং রাষ্ট্রের অবহেলার কারণে তৈরি হওয়া ‘বিচারহীনতার
সংস্কৃতি’। যখন একটি সমাজে অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্ত তৈরি হয়, তখন অপরাধীদের ভেতর থেকে ভয় কেটে যায়। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, তদন্তে গাফিলতি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিরপেক্ষতার অভাব এবং রাজনৈতিক তোষণ নীতি অপরাধকে একটি লাভজনক কারবারে পরিণত করেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন তাদের পেশাদারিত্বের চেয়ে অন্য রাজনৈতিক বা কায়েমী স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত থাকে, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে অপরাধ করার প্রবণতা বাড়ে। অপরাধের প্রাথমিক বীজ হয়তো মানুষের ভেতর থাকে, কিন্তু রাষ্ট্র যখন তার দায়িত্ব পালনে শিথিলতা দেখায়, তখনই অপরাধের মাত্রা বাড়তে থাকে। সুতরাং রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তা ও অবহেলাই মূলত অপরাধকে বাড়িয়ে তোলার প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে।
অপরাধপ্রবণতা মানুষের একটি মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য হতে পারে, কিন্তু সেই অপরাধ দমনে রাষ্ট্র তার দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। রাষ্ট্র যদি কেবল পরিসংখ্যান প্রকাশ করে কিংবা অপরাধের জন্য ব্যক্তির নৈতিক অবক্ষয়কে দায়ী করে হাত ধুয়ে ফেলতে চায়, তবে তা হবে চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। অপরাধমুক্ত সমাজ হয়তো রূপকথা, কিন্তু একটি নিরাপদ ও শৃঙ্খলিত সমাজ গড়ে তোলা সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রের সদিচ্ছা ও কার্যকারিতার ওপর নির্ভর করে।
রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণের প্রথম ধাপ হলো আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা। অপরাধী যে-ই হোক, তার রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় বিবেচনা না করে দ্রুতগতিতে বিচার সম্পন্ন করতে হবে। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পেশাদার ও স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ দিতে হবে, যাতে আইন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হয়। শুধু পুলিশি পদক্ষেপই শেষ কথা নয়; অপরাধ প্রতিরোধে সামাজিক ও নৈতিক পরিবেশ তৈরির জন্য রাষ্ট্রকেই উদ্যোগী হতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, মানুষ প্রবৃত্তি ও পরিস্থিতির কারণে অপরাধ করবে— এটিই স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু অপরাধ বেড়ে যাওয়া এবং অপরাধের স্বর্গরাজ্য তৈরি হওয়া কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতার স্পষ্ট দলিল। মানুষ হিসেবে নাগরিকের যেমন ভুল করার প্রবণতা আছে, ঠিক তেমনি রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হলো সেই ভুল ও অপরাধ থেকে নাগরিককে রক্ষা করা।
রাষ্ট্র যদি তার এই মূল সামাজিক চুক্তি ভুলে গিয়ে দায়িত্ব অবহেলা করে, তবে সমাজে কোনো অবস্থাতেই শান্তি ফিরে আসতে পারে না। রাষ্ট্রকে তার কাঠামোগত অবহেলা ঝেড়ে ফেলে অপরাধ দমনে কঠোর ও কার্যকর ভূমিকা নিতেই হবে— কারণ দিনশেষে সমাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্য কোনো বিকল্প অভিভাবক নাগরিকের নেই।
লেখক : সাহিত্যকর্মী
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে