দেশের প্রায় সব জেলার মানুষ পর্যটক হিসেবে কুয়াকাটায় আসেন। পর্যটন কেন্দ্রের মূল বৈশিষ্ট্য হলো বিভিন্ন প্রান্তের সব ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রের মানুষের মিলনমেলা। এখানে আসা মানুষের কৃষ্টি-কালচার ও আচরণ দেখে স্থানীয়রা তাদের ধরন সম্পর্কে জানতে ও বুঝতে পারেন। মানুষের এই সমাগমকে কেন্দ্র করেই এই এলাকার অবহেলিত ও বেকার মানুষ পণ্য বিক্রির উদ্দেশ্যে নানা ব্যবসা শুরু করেন। গড়ে ওঠে বাণিজ্যিক জোন, যার ব্যতিক্রম নয় কুয়াকাটাও।
১৯৯৮ সালে কুয়াকাটাকে পর্যটন কেন্দ্র ঘোষণা করার আগেই সেখানে ছোট ছোট দোকান গড়ে উঠেছিল। সেগুলোতে শুধু চা ও হালকা খাবার বিক্রি হতো। রাতে থাকার ব্যবস্থা ভালো ছিল না, গোনায়েকটি হোটেল ছিল গোলপাতার ছাউনি ও বাঁশের বেড়ার দোচালা ঘরের মতো। পর্যটন কেন্দ্র ঘোষণার আগে মাঝে মধ্যে সেখানে স্থানীয় জেলা প্রশাসন, সামরিক বাহিনী ও আশপাশের মানুষের আনাগোনা দেখা যেত।
পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার ৯ নম্বর ধুলাসার ইউনিয়ন এবং কুয়াকাটা পৌর এলাকা নিয়ে পূর্বে গঠিত ছিল ৭ নম্বর লতাচাপলী ইউনিয়ন। তখনকার এই ইউনিয়নের ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল ছিল আলীপুর বাজার। কুয়াকাটা থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরের এই বাজারে স্থানীয় খাবারসহ সব ধরনের পণ্য পাওয়া যেত। ২০০০ সালের দিকে পর্যটকরা আসতে শুরু করলে লতাচাপলীর বাসিন্দারা নিম্নমানের আবাসিক হোটেল নির্মাণের দৌড়ে নামে। তখনও সৈকত ও বেড়িবাঁধের মাঝে ছোট ছোট দোকান দেখা যেত।

স্থানীয়দের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তি ও কোম্পানি যখন পর্যটনের সম্ভাবনা দেখে জমি কিনতে শুরু করে, তখন খাবার হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ঝিনুকের দোকানসহ নানা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। শুরু হয় দীর্ঘদিনের পরিত্যক্ত জায়গার কদর, রাতারাতি বেড়ে যায় জমির দাম। অসহায় থেকে বিত্তশালী হওয়ার সুযোগ কেউ হাতছাড়া করেননি। তবে মধ্যস্বত্বভোগীরা জমির মালিকের চেয়ে অনেক বেশি টাকা আয় করেছেন। এক সময় যারা তিন চাকার ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাতেন, আজ তারা অনেকেই বহুতল হোটেলের মালিক। বেকারত্ব ঘুচে অনেকেই ধনাঢ্য তালিকায় নাম লিখিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, শিক্ষার হারও বেড়েছে। বর্তমানে কুয়াকাটায় বেকার প্রায় নেই বললেই চলে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ধনাঢ্য পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্কও গড়ে উঠেছে। তবে মাছ শিকারের ওপর নির্ভরশীল ১৮ কিলোমিটারজুড়ে থাকা জেলে পরিবারগুলোর কষ্ট আজও কাটেনি।
দূরদূরান্ত থেকে একজন পর্যটক কুয়াকাটায় এসে বাস থেকে নেমে অটোরিকশায় ওঠেন, হোটেলে কক্ষ নেন, দুপুরে রেস্তোরাঁয় খান এবং বিকেলে সৈকতে ঘুরে ছবি তোলেন ও সমুদ্রে গোসল করেন। হয়তো গঙ্গামতি বা লেম্বুরবন ঘুরে সন্ধ্যায় আবার রেস্তোরাঁয় খান। পরদিন মিশ্রীপাড়া বা অন্য কোনো স্থানে যান। ফেরার সময় কেনেন শুঁটকি, শামুক-ঝিনুকের তৈরি পণ্য বা স্থানীয় সামগ্রী। দেখতে সাধারণ মনে হলেও এই একটি ভ্রমণের সঙ্গে হোটেলের কর্মচারী, রেস্তোরাঁর বাবুর্চি, অটোরিকশাচালক, ট্যুর গাইড, ফটোগ্রাফার, দোকানি, শুঁটকি ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাসহ বহু মানুষ জড়িয়ে আছেন।
বর্তমানে কুয়াকাটার পর্যটনকে কেন্দ্র করে আবাসিক হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও স্থানীয় কর্মসংস্থানের একটি বড় অর্থনৈতিক জোন তৈরি হয়েছে। ধীরে ধীরে কুয়াকাটা থেকে ঝাউবন, লেম্বুরবন, গঙ্গামতি, কাউয়ারচর ও মিশ্রীপাড়া পর্যটন স্পটগুলো বিকশিত হয়েছে।
একজন পর্যটক বেড়াতে এলেও তার মাধ্যমে সচল হয় বহু পরিবারের জীবিকা। এ কারণেই কুয়াকাটা কেবল একটি সমুদ্র সৈকত নয়, এটি পটুয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু। সমুদ্রের ঢেউ থেকে অর্থনীতির ঢেউ—কুয়াকাটার অর্থনীতির একটি বড় অংশই হলো পর্যটন। সমুদ্র সৈকত, ঝাউবন, গঙ্গামতি, লেম্বুরবন, কাউয়ারচর, মিশ্রীপাড়া ও রাখাইন সংস্কৃতি মিলিয়ে এখানে তৈরি হয়েছে বহুমাত্রিক পর্যটন পণ্য। পর্যটক যত বেশি দিন অবস্থান করেন, স্থানীয় অর্থনীতিতে তার ব্যয়ের পরিমাণও তত বাড়ে। একদিনের পর্যটক শুধু যাতায়াত ও খাবারে ব্যয় করলেও দুই-তিন দিন অবস্থান করা পর্যটক হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও কেনাকাটায় বেশি অর্থ ব্যয় করেন। তাই পর্যটকদের অবস্থানের সময় বাড়ানোই হতে পারে কুয়াকাটার পর্যটন অর্থনীতি প্রসারণের অন্যতম চাবিকাঠি।
কুয়াকাটার পর্যটন অর্থনীতির সবচেয়ে বড় খাত হলো আবাসিক হোটেল-মোটেল ও রিসোর্ট। কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের বাইরে থাকা হোটেলসহ বর্তমানে এখানে ২০০টির বেশি আবাসিক হোটেল রয়েছে, যেগুলোতে প্রায় ৩০ হাজার পর্যটকের থাকার ধারণক্ষমতা রয়েছে। তবে হোটেলের শ্রেণি, কক্ষসংখ্যা ও পর্যটকদের সঠিক ডেটা ছাড়া অর্থনীতির সঠিক আকার নিরূপণ করা কঠিন। একটি হোটেলের সঙ্গে ব্যবস্থাপক, রিসেপশনিস্ট, নিরাপত্তাকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, বাবুর্চি, ওয়েটার, ইলেকট্রিশিয়ান ও প্লাম্বারসহ নানা পেশার মানুষ যুক্ত। পাশাপাশি লন্ড্রি, খাবার সরবরাহ এবং মাছ, মাংস, সবজি, পানীয়, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহকারীরাও পর্যটন অর্থনীতির অংশ।
কুয়াকাটায় পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ স্থানীয় খাবার ও সামুদ্রিক মাছ। কাঁকড়া, চিংড়ি, কোরাল ও রূপচাঁদাস বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করে। পর্যটক বাড়লে রেস্তোরাঁর বিক্রি বাড়ে, যার সঙ্গে মাছ বিক্রেতা, জেলে, আড়তদার ও সবজি বিক্রেতারা জড়িত থাকেন।
কুয়াকাটার পর্যটনের প্রধান মৌসুম হলো শীতকাল। ছুটির দিন, ঈদ, দুর্গাপূজা বা দীর্ঘ সরকারি ছুটিতে পর্যটকদের চাপ বাড়ে। বুকিং দ্রুত শেষ হয়, রেস্তোরাঁ ও পরিবহনের চাহিদা বাড়ে। বিশেষ করে রাস পূজার ছুটিতে পর্যটকদের ব্যাপক আগমনে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভালো বিক্রি হয়।
যাতায়াতের প্রতিটি ধাপে স্থানীয় পরিবহন ও ট্যুর গাইড সেবার সুযোগ তৈরি হয়। এর মধ্যে পর্যটকদের ছবি তোলার বিষয়টি একটি ছোট কিন্তু দৃশ্যমান অর্থনৈতিক ইস্যু। সমুদ্রের সামনে বা সূর্যাস্তের ছবি তোলার জন্য অনেকে স্থানীয় ফটোগ্রাফারদের সহায়তা নেন। শামুক-ঝিনুক, শুঁটকি, আচার এবং রাখাইন নারীদের তৈরি পণ্যের বাজারও পর্যটকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয়।
কুয়াকাটার একটি বিশেষ সম্পদ হলো রাখাইন সংস্কৃতি। মিশ্রীপাড়া ও রাখাইন পল্লিকে কেন্দ্র করে বৌদ্ধ ঐতিহ্য, তাঁত, হস্তশিল্প ও স্থানীয় সংস্কৃতি পর্যটকদের আকর্ষণ করে। নারীদের তৈরি হস্তশিল্প ও তাঁতের পণ্য পর্যটন বাজারে কার্যকরভাবে তুলে ধরতে পারলে তাদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ আরও বাড়বে। এছাড়া হোটেল ও রিসোর্টের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, বিছানার চাদর ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সামগ্রী স্থানীয়ভাবে সরবরাহ করা গেলে কলাপাড়া ও মহিপুরসহ আশপাশের এলাকার কৃষক, জেলে ও ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন।
বাস্তব প্রেক্ষাপটে কুয়াকাটায় পর্যটকদের ব্যয় উপকূলের মানুষের কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতির বড় চালিকাশক্তি। এই অর্থনীতিকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে পর্যটক বাড়ানোর পাশাপাশি সেবার মান, অবস্থানের সময় এবং পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। তবেই ‘সাগরকন্যা’ শুধু পর্যটকদের কাছে সুন্দর থাকবে না, সাগরের পাড়ের মানুষের সংসারেও দীর্ঘস্থায়ী সমৃদ্ধি নিয়ে আসবে।
সত্য বলতে, কুয়াকাটা পর্যটকদের কাছে বিনোদনের খোরাক আর বিনিয়োগকারী ও স্থানীয়দের কাছে সংসার চালানোর মাধ্যম। পর্যটক স্থানীয়দের কাছে ভালো কিছু চায়, স্থানীয়রাও পর্যটকদের কাছ থেকে বেশি কিছু চায়—আকাঙ্ক্ষা এক হলেও ধরন দুই মেরুর ভিন্ন।
কুয়াকাটা এখন শুধু সমুদ্র দেখার জায়গা নয়; সমুদ্র, বন, চর, নদী, রাখাইন সংস্কৃতি, বৌদ্ধ ঐতিহ্য, স্থানীয় খাবার ও হস্তশিল্প মিলিয়ে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন গন্তব্য। প্রয়োজন শুধু এগুলোকে একটি পরিকল্পিত অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে আনা।
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুল মোতালেব শরীফ বলেন, কুয়াকাটা পর্যটন কেন্দ্র হওয়ার আগে শুধু একটি গ্রাম ছিল। রাখাইনদের বসবাস অনেক আগে থেকেই ছিল। এক সময় কলাপাড়া উপজেলা সদরে যেতে হতো নৌকা বা ছোট একতলা লঞ্চে, আর স্থানীয় যাতায়াতের মাধ্যম ছিল শুধু ভ্যান। জমিতে তেমন ফসল ফলত না, খাবারেও সব সময় বালুর মিশ্রণ থাকত। গভীর নলকূপ না থাকায় সরকারি খাস পুকুরের পানি পান করতে হতো। আজ সেই করুণ অবস্থা থেকে এখানকার মানুষের জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে ডাব, ফুসকা ও চা-বিস্কুটসহ সব ধরনের ব্যবসা কুয়াকাটায় রয়েছে এবং পাতার ঘর থেকে মানুষ আজ দালানে বসবাস করছে।
সময়ের আলো/জোই