পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনায় বদলে যেতে পারে কুয়াকাটার ঝাউবন

ছগির হোসেন, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)

সারাদেশ

সমুদ্রের বিশাল জলরাশি, তার পাশে সারি সারি ঝাউগাছ—প্রকৃতির এমন মেলবন্ধন কুয়াকাটার সৌন্দর্যকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা। পর্যটন নগরী কুয়াকাটা থেকে মাত্র

2026-10-02T10:18:11+00:00
2026-10-02T10:20:42+00:00
 
  শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬,
১৭ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনায় বদলে যেতে পারে কুয়াকাটার ঝাউবন
ছগির হোসেন, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)
প্রকাশ: শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:১৮ এএম  আপডেট: ০২.১০.২০২৬ ১০:২০ এএম
কুয়াকাটার ঝাউবন। ছবি : সময়ের আলো
সমুদ্রের বিশাল জলরাশি, তার পাশে সারি সারি ঝাউগাছ—প্রকৃতির এমন মেলবন্ধন কুয়াকাটার সৌন্দর্যকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা। পর্যটন নগরী কুয়াকাটা থেকে মাত্র এক কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত ঝাউবন তাই শুধু বেড়ানোর জায়গা নয়; এটি উপকূলের সবুজ বেষ্টনীরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো ও যথাযথ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে ঝাউবন হয়ে উঠতে পারে কুয়াকাটার অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র।

১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে প্রায় ১৫ হেক্টর এলাকায় ঝাউবাগান গড়ে তোলে বন বিভাগ। উপকূলের প্রতিকূল আবহাওয়া, লবণাক্ততা, ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা এসব গাছ একদিকে যেমন সৌন্দর্য বাড়িয়েছে, অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব কমাতেও ভূমিকা রাখছে। সমুদ্রের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা ঝাউগাছের সারি ঝড়ের বাতাসের বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।

তাই ঝাউবন রক্ষা মানে শুধু একটি পর্যটন এলাকার সৌন্দর্য রক্ষা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে উপকূলীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিষয়টিও।

হারিয়ে গেছে জাতীয় উদ্যান
একসময় এই ঝাউবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল জাতীয় উদ্যান। পর্যটকদের জন্য সেখানে ছিল হাঁটার পথ, বাঁধানো ঘাট ও পুকুরসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। সারিবদ্ধ ঝাউগাছের সঙ্গে এসব স্থাপনা মিলে তৈরি হয়েছিল ভিন্ন এক পর্যটন পরিবেশ।

তবে সাগরের ভাঙনে ধীরে ধীরে সেই উদ্যান বিলীন হয়ে গেছে। সৈকতের পাশে এখনো কিছু অবকাঠামোর অংশ পড়ে আছে। একসময় যে জায়গাটি পর্যটকদের পদচারণায় মুখর থাকত, সাগরের ভাঙনে তার অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

তারপরও ঝাউবনের আকর্ষণ কমেনি। কুয়াকাটায় বেড়াতে আসা পর্যটকদের বড় একটি অংশ ছুটে যান এখানে। কেউ ছবি তোলেন, কেউ পরিবার নিয়ে সময় কাটান, আবার কেউ নিরিবিলি পরিবেশে কিছুটা সময় কাটাতে চান।

পর্যটক দম্পতি মো. আবুল খায়ের ও মোসা. জাহানারা বেগম বলেন, ঝাউবন কুয়াকাটার খুব কাছের একটি সুন্দর জায়গা। ঝাউগাছগুলো খুব ভালো লেগেছে। শুনেছি এখানে জাতীয় উদ্যান করা হয়েছিল। কিন্তু সাগরে ভেঙে নিয়ে গেছে। উদ্যানের সৌন্দর্য আমরা উপভোগ করতে পারিনি। তবে জায়গাটি সামনে ভালো কিছু হওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয়েছে।

পর্যটনের সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতি
যেখানে পর্যটক যান, সেখানে গড়ে ওঠে নানা ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। ঝাউ বন এর বাইরে নয়। পর্যটকদের আগমনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পরিবহন, খাবার, পানীয়, ছবি তোলা ও ছোট ছোট দোকানসহ বিভিন্ন সেবার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় ভ্রাম্যমাণ ডাব ব্যবসায়ী মো. মিরাজ বলেন, প্রতিদিন এই জায়গায় অনেক পর্যটক আসেন। ওয়াপদা সড়কের পাশে চার-পাঁচটি দোকান আছে। আমরা কয়েকজন নিয়মিত এখানে ব্যবসা করি। ঈদ, কোরবানি ও রাসমেলায় প্রচুর পর্যটক আসেন। তখন বেচাকেনাও অনেক বেড়ে যায়।

অর্থাৎ ঝাউবনের পর্যটন সম্ভাবনা বাড়লে এর সুফল শুধু পর্যটন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। স্থানীয় পরিবহন চালক, দোকানি, খাবার বিক্রেতা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও বিভিন্ন সেবাদাতার আয়ও বাড়তে পারে।

অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনায় বাড়ছে ঝুঁকি
তবে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝাউবনের ওপর চাপও বাড়ছে। গাছের গোড়ায় ময়লা জমা, অনিয়ন্ত্রিত দোকানপাট, অপরিকল্পিত স্থাপনা এবং পর্যটকদের অবাধ চলাচলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে পরিবেশ।

আগে ঝাউবনের ভেতর পর্যটকদের চলাচলের জন্য একটি হাঁটার পথ তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু সাগরের ঢেউ ও ভাঙনে সেটি অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন করে নির্দিষ্ট হাঁটার পথ তৈরি করা হলে পর্যটকেরা গাছের গোড়ায় নির্বিচারে চলাচল করবেন না। এতে গাছের ক্ষতির আশঙ্কাও কমবে।

পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহার করে ছোট ছোট ওয়াকওয়ে, নির্দিষ্ট বসার জায়গা, পর্যাপ্ত ডাস্টবিন, পানির ব্যবস্থা ও নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে। সন্ধ্যার পর পর্যটনের সুযোগ তৈরি করা হলেও অতিরিক্ত আলো, শব্দ ও অনিয়ন্ত্রিত বিনোদন থেকে বিরত থাকতে হবে।

ঝাউবন-গঙ্গামতি হতে পারে পর্যটন করিডর
ঝাউবনের অন্যতম বড় সুবিধা এর অবস্থান। এখান থেকে পূর্বদিকে এগোলেই গঙ্গামতি ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল। গঙ্গামতি রিজার্ভ ফরেস্ট ঝাউবন সৈকতের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল।

বর্তমানে ঝাউবন থেকে গঙ্গামতি যেতে একটি ছোট খাল নৌকায় পার হতে হয়। পর্যটকদের জন্য এটি যেমন বাড়তি অভিজ্ঞতা, তেমনি অনেক সময় বিড়ম্বনারও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পরিকল্পিত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে কুয়াকাটা জিরো পয়েন্ট, ঝাউবন, গঙ্গামতি ও গঙ্গামতি বনাঞ্চলকে একটি পর্যটন করিডরের আওতায় আনা সম্ভব।


একই যাত্রায় পর্যটকেরা সমুদ্র, ঝাউবন, ম্যানগ্রোভ বন ও জলাশয়ের বৈচিত্র উপভোগ করতে পারবেন। এতে কুয়াকাটার পর্যটন অভিজ্ঞতাও আরও বৈচিত্র্যময় হতে পারে।

স্থানীয়দের যুক্ত করার তাগিদ
ঝাউবন সংরক্ষণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে পরিবেশ স্বেচ্ছাসেবক বা পর্যটন গাইড হিসেবে কাজে লাগানো যেতে পারে। এতে পর্যটকদের সহায়তার পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষার দায়িত্বও স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হবে।

স্থানীয় মানুষের আয় যদি ঝাউবনের টেকসই পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে তারাই হয়ে উঠতে পারেন এই বন রক্ষার সবচেয়ে বড় শক্তি।


পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য ঝাউবন হতে পারে উপকূলীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্র। একটি ছোট ‘কোস্টাল ইকোলজি ইনফরমেশন সেন্টার’ গড়ে তোলা গেলে পর্যটন ও গবেষণার সমন্বিত কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে এলাকাটি।

দরকার আলাদা ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা
পর্যটনের প্রসারের সঙ্গে ঝাউবনের আশপাশে হোটেল-মোটেল, দোকানপাট, স্থানীয় পরিবহন ও বিভিন্ন অবকাঠামো বাড়ছে। এই সম্প্রসারণ যদি পরিকল্পনাহীনভাবে ঝাউবনের দিকে এগোয়, তাহলে যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের আকর্ষণ করছে, সেটিই একসময় হারিয়ে যেতে পারে।

তাই উন্নয়ন প্রয়োজন, তবে সেই উন্নয়ন হতে হবে প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়ে। ঝাউবনের সীমানা নির্ধারণ, নিয়মিত গাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নতুন চারা রোপণ ও পরিচর্যা, নির্দিষ্ট পর্যটন পথ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশবান্ধব বসার স্থান এবং পর্যটন পুলিশের নজরদারি—সবকিছুকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা প্রয়োজন।


এ জন্য কুয়াকাটার সামগ্রিক পর্যটন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আলাদা ‘ঝাউবন ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা’ করা যেতে পারে। এতে অবৈধ স্থাপনা ও দখল ঠেকানোর পাশাপাশি পর্যটন অবকাঠামোও পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুল মোতালেব শরীফ বলেন, ‘আমরা যারা পর্যটনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, আমাদের সবাইকে পর্যটকবান্ধব হতে হবে। পর্যটকদের সুযোগ-সুবিধা দিয়েই আমাদের ব্যবসা করতে হবে। পর্যটন এলাকা উন্নত হলে পর্যটক বাড়বে এবং তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন।’

তিনি বলেন, ঝাউবন আগের মতো নেই। জাতীয় উদ্যান ও পার্কের সম্পূর্ণ অংশ সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। সরকারের উচিত ঝাউবনে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় কিছু করা।


ট্যুরিস্ট পুলিশের কুয়াকাটা রিজিওনের পুলিশ পরিদর্শক জয়ন্ত কুমার বলেন, ঝাউবন কুয়াকাটায় বেড়াতে আসা পর্যটকদের জন্য কাছাকাছি একটি পর্যটন স্পট। আমরা সহজেই সেখানে গিয়ে তাদের নিরাপত্তা দিতে পারি। সরকারি ছুটির দিন ছাড়াও নিয়মিত টহল দেওয়া হয়।

কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক ও কলাপাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াছিন ছাদেক বলেন, ইতোমধ্যে সাগরপাড় ব্যাপক ভেঙে গেছে। অনেক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট হয়েছে। পর্যটকদের জন্য ঝাউবন ছিল একটি ব্যতিক্রমী দর্শনীয় স্থান। আমরা চেষ্টা করব ঝাউবনকে পর্যটকবান্ধব করে তুলতে। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। আশা করি ভালো কিছু হবে।

প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়েই উন্নয়ন
কুয়াকাটার পর্যটনের ভবিষ্যৎ শুধু নতুন হোটেল, সড়ক বা অবকাঠামো নির্মাণের ওপর নির্ভর করছে না। এর বড় অংশ নির্ভর করছে বিদ্যমান প্রাকৃতিক সম্পদ কতটা সংরক্ষণ করা যায় তার ওপর।

সমুদ্রের সঙ্গে ঝাউবনের সবুজের যে মেলবন্ধন, সেটিই কুয়াকাটার সৌন্দর্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। পর্যটক যখন সমুদ্রের দিকে তাকান, দেখেন বিশাল জলরাশি; আর পেছনে তাকালে চোখে পড়ে ঝাউগাছের সারি। একদিকে সাগর, অন্যদিকে সবুজ—এই দুইয়ের মিলনেই তৈরি হয়েছে কুয়াকাটার নিজস্ব সৌন্দর্য।

তাই ঝাউবনকে শুধু ‘ঘুরতে যাওয়ার জায়গা’ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি কুয়াকাটার পর্যটন, পরিবেশ ও উপকূলীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ করা গেলে এই ঝাউবন একদিকে যেমন পর্যটকদের আকর্ষণ করবে, অন্যদিকে উপকূলের সবুজ বেষ্টনী হিসেবেও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টিকে থাকবে।

সময়ের আলো/জোই
  বিষয়:   পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা  কুয়াকাটা  ঝাউবন  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: