কুয়াকাটার জিরো পয়েন্টে দাঁড়িয়ে চোখে পড়ে শুধু সমুদ্র। নীল জলরাশি, ঢেউয়ের ছন্দ আর দিগন্তজোড়া আকাশ—এই পরিচিত দৃশ্যেই মুগ্ধ হন অধিকাংশ পর্যটক। কিন্তু সেই পরিচিত সৈকত থেকে একটু পশ্চিমে এগোলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে সামনে আসে বালুর পথ, এক পাশে সমুদ্র, অন্য পাশে সবুজ বন। কোথাও উন্মুক্ত চর, কোথাও কেওড়া-গেওয়ার ঘন সবুজ। আর বালুচরে ছোট ছোট গর্ত থেকে উঁকি দেয় লাল কাঁকড়া। এই অন্য রূপের নাম লেম্বুরবন।
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপলী, ধুলাসার ও কুয়াকাটা পৌর এলাকা ঘিরে গড়ে ওঠা ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের অন্যতম আকর্ষণ লেম্বুরবন বা লেম্বুর চর। কুয়াকাটা থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে আন্ধারমানিক নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনার কাছে এর অবস্থান। প্রায় এক হাজার একর এলাকাজুড়ে থাকা এই অঞ্চলে কেওড়া, গেওয়া, করই, হেঁতাল ও গোলপাতাসহ বিভিন্ন উপকূলীয় উদ্ভিদের দেখা মেলে। পাশাপাশি রয়েছে লাল কাঁকড়ার বিচরণক্ষেত্র।
জোয়ারে ডুবে যায় বিস্তীর্ণ চর। ভাটায় আবার জেগে ওঠে বালুর প্রান্তর। দূরে আন্ধারমানিক নদীর মোহনা। ওপারে ফাতরার বন। সব মিলিয়ে লেম্বুরবন যেন সমুদ্রের বুকের মধ্যে প্রকৃতির হাতে আঁকা এক সবুজ ভূদৃশ্য।
কুয়াকাটায় আসা পর্যটকদের বড় একটি অংশের গন্তব্য এখন এই লেম্বুরবন। মূল সৈকতে সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত দেখা কিংবা ঢেউয়ের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর পর যারা প্রকৃতির আরও কাছাকাছি যেতে চান, তাদের জন্য লেম্বুরবন হয়ে উঠছে আলাদা আকর্ষণ।
সমুদ্রের পাশে সবুজের রাজ্য
লেম্বুরবনের সৌন্দর্য শুধু সমুদ্রে নয়; সমুদ্র, নদী, বন ও চর—চারটি ভিন্ন প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য এখানে পাশাপাশি অবস্থান করছে। বালুর পথ ধরে এগোতে এগোতে একসময় মনে হয়, কুয়াকাটার পরিচিত পর্যটনকেন্দ্র থেকে যেন অন্য এক পৃথিবীতে প্রবেশ করা গেছে।
এখানকার উপকূলীয় বনভূমি শুধু সৌন্দর্য বাড়ায় না, পরিবেশগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। কেওড়া, গেওয়া, গরান ও গোলপাতাসহ নানা উদ্ভিদের উপস্থিতি এলাকাটিকে ম্যানগ্রোভ-সদৃশ বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। উপকূলীয় বন ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় প্রাকৃতিক প্রতিরোধক হিসেবে ভূমিকা রাখে। পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর আশ্রয়স্থল হিসেবেও এসব বন গুরুত্বপূর্ণ।
তাই লেম্বুরবনের পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রকৃতি সংরক্ষণের বিষয়টিও সামনে আসে। পর্যটক বাড়বে, কিন্তু সেই সঙ্গে প্রকৃতির ওপর চাপও বাড়বে—এটাই এখন বড় প্রশ্ন।
লাল কাঁকড়ার ছুটে চলা
লেম্বুরবনের অন্যতম আকর্ষণ লাল কাঁকড়া। বালুচরে অসংখ্য ছোট ছোট গর্ত। কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকলেই গর্ত থেকে বেরিয়ে আসে কাঁকড়া। মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই আবার দ্রুত গর্তে ঢুকে পড়ে।
পর্যটকদের কাছে এটি আনন্দের দৃশ্য হলেও উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যের জন্য এর গুরুত্ব আরও গভীর। কাঁকড়া উপকূলীয় খাদ্যশৃঙ্খলের একটি অংশ। ফলে তাদের আবাসস্থলে অনিয়ন্ত্রিত মানুষের চলাচল, যানবাহন চালানো কিংবা বালুচর ক্ষতিগ্রস্ত হলে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়তে পারে।
এ কারণে লেম্বুরবনে পর্যটন সম্প্রসারণের পাশাপাশি লাল কাঁকড়ার আবাসস্থল রক্ষার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়ার দাবি রয়েছে।
সূর্যাস্তের নতুন ঠিকানা
কুয়াকাটায় সূর্যাস্ত দেখার জন্য পর্যটকদের প্রথম পছন্দ মূল সৈকত। তবে লেম্বুরবনে সূর্যাস্তের আবহ একেবারেই আলাদা। সমুদ্রের জলরাশি, বালুচর ও বনভূমির ফাঁক দিয়ে অস্তগামী সূর্যের আলো তৈরি করে অন্যরকম দৃশ্য।
বিকেলে অনেক পর্যটক লেম্বুরবনে যান। কেউ ঘুরে দেখেন বন ও চর, কেউ স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেন, আবার কেউ সূর্যাস্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। পর্যটকের আনাগোনায় সেখানে ছোট ছোট খাবার ও চা-নাশতার দোকানও গড়ে উঠছে।
প্রকৃতির সৌন্দর্য তাই ধীরে ধীরে স্থানীয় অর্থনীতির অংশ হয়ে উঠছে।
পর্যটক বাড়ছে, বাড়ছে জীবিকার সুযোগ
একটি পর্যটনকেন্দ্র গড়ে উঠলে শুধু পর্যটকেরাই সেখানে আসেন না; তৈরি হয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও। লেম্বুরবনে পর্যটক বাড়ার সঙ্গে মোটরসাইকেল, অটোরিকশা ও ইজিবাইক চালকদের আয় বাড়ছে। পাশাপাশি খাবারের দোকান, চা-নাশতার দোকানসহ ছোট ব্যবসার সুযোগও তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. জালাল প্যাদা বলেন, ‘পর্যটক যত বাড়ে, আমাদের ব্যবসাও তত বাড়ে। তবে পর্যটকদের নিয়মিত আসা এবং যোগাযোগব্যবস্থা আরও ভালো হওয়া দরকার।
রংপুর থেকে আসা পর্যটক শফিকুল সুহাদ বলেন, কুয়াকাটায় এসে খুব ভালোই লেগেছে। তবে লেম্বুরবনে এসে মনে হয়েছে এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশের অন্যরকম সৌন্দর্য পাওয়া যায়। ভালো লাগার মতো জায়গা।
নারায়ণগঞ্জ থেকে বন্ধুদের সঙ্গে লেম্বুরবনে বেড়াতে আসা সরকারি চাকরিজীবী মো. আফজাল হোসেন মাতুব্বর বলেন, কুয়াকাটার সৈকতের লেম্বুরবন যে এত সুন্দর একটি জায়গা, এখানে না আসলে বুঝতেই পারতাম না। প্রথমে স্থানীয়দের কাছে শুনেছি। এরপর চলে এলাম। মনোরম পরিবেশ। তিন নদীর মোহনা, ফাতরার বনও দেখা যায় এখান থেকে। তাই খুবই ভালো লেগেছে।
স্থানীয় অটোভ্যানচালক সাহাবুদ্দিন সিকদার বলেন, কুয়াকাটার পর্যটকেরা আগে লেম্বুরবনে আসেন। আমরা যারা চালক আছি, পর্যটকদের আনা-নেওয়া করে যে টাকা পাই, তাতে ভালোই আছি। জনপ্রতি ভাড়ার চেয়ে রিজার্ভে নিয়ে এলে আয় বেশি হয়।
সম্ভাবনার সঙ্গে সংকটও
লেম্বুরবনে পর্যটক বাড়ছে। কিন্তু পর্যটন অবকাঠামো সেই অনুপাতে কতটা প্রস্তুত—এ প্রশ্নও সামনে আসছে।
পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত স্যানিটেশন, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট স্থান এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট হাঁটার পথ, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, তথ্যকেন্দ্র, প্রশিক্ষিত স্থানীয় গাইড, নির্দিষ্ট দর্শনীয় পয়েন্ট এবং বর্জ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পর্যটনের কারণে যেন লাল কাঁকড়ার আবাসস্থল কিংবা বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। বালুচরে প্লাস্টিক পড়ে থাকা, বনের ভেতর ময়লা জমা কিংবা অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন চলাচল বাড়তে থাকলে যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পর্যটকেরা এখানে আসছেন, সেটিই একসময় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তাই লেম্বুরবনের উন্নয়নে স্থানীয় প্রশাসন, বন বিভাগ, পর্যটন ব্যবসায়ী, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও পর্যটকদের সমন্বিত ভূমিকা জরুরি।
স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করাই বড় সুযোগ
লেম্বুরবনকে ঘিরে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার জায়গাগুলোর একটি হতে পারে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান। বাইরের বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষকে পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসা ও সেবায় যুক্ত করা গেলে এর সুফল সরাসরি পৌঁছাতে পারে গ্রামের মানুষের কাছে।
স্থানীয় গাইড, পরিবহন, খাবারের দোকান, হস্তশিল্প ও অন্যান্য পর্যটনসেবা—বিভিন্ন খাতে স্থানীয়দের সম্পৃক্ততার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে পর্যটন শুধু একটি দর্শনীয় স্থানকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড না হয়ে স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।
লেম্বুরবনের আরেকটি বড় সম্ভাবনা হলো কুয়াকাটার মূল সৈকতের ওপর পর্যটনের চাপ কমানো। আশপাশের দর্শনীয় স্থানগুলোকে পরিকল্পিতভাবে উন্নত করা গেলে পুরো এলাকার পর্যটন সক্ষমতা বাড়তে পারে।
পর্যটকের পছন্দের তালিকায় লেম্বুরবন
কুয়াকাটার হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোতালেব শরীফের ভাষ্য, বর্তমানে কুয়াকাটায় আসা পর্যটকদের কাছে লেম্বুরবন বেশ জনপ্রিয়। তার মতে, জায়গাটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এবং কুয়াকাটার জিরো পয়েন্ট থেকে তুলনামূলক কাছেই।
তিনি বলেন, তিন নদীর মোহনা, ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, ওপারে ফাতরার বন এবং বিস্তীর্ণ সৈকত—সব মিলিয়ে পর্যটকেরা এখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ পান। লেম্বুরবনে পর্যটকের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে বলেও জানান তিনি। পর্যটক বাড়ার সঙ্গে স্থানীয় পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরাও লাভবান হচ্ছেন।
পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কুয়াকাটাকে কেন্দ্র করে ট্যুরিস্ট পুলিশের কার্যক্রম পরিচালিত হয় এবং বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় তাদের টহল থাকে।
ট্যুরিস্ট পুলিশের কুয়াকাটা অঞ্চলের পুলিশ পরিদর্শক মো. নাজমুল হাসান বলেন, বর্তমানে কুয়াকাটার অন্যতম আকর্ষণ লেম্বুরবন। পর্যটকেরা সেখানে বেশি যান। তাদের নিরাপত্তার জন্য সার্বক্ষণিক নজরদারি রয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কুয়াকাটা ট্যুরিস্ট পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে।
প্রকৃতি বাঁচিয়েই পর্যটন
জিরো পয়েন্টে দাঁড়িয়ে সমুদ্র দেখলে কুয়াকাটার সৌন্দর্যের একটি অংশ দেখা যায়। আর লেম্বুরবনে গেলে বোঝা যায়, কুয়াকাটা শুধু সমুদ্র নয়। এখানে সমুদ্র আছে, নদী আছে, বন আছে, চর আছে, লাল কাঁকড়া আছে। এর সঙ্গে আছে মানুষের জীবিকা ও পর্যটনের সম্ভাবনা।
এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে প্রথম শর্তই হতে পারে প্রকৃতিকে অক্ষত রাখা। যোগাযোগব্যবস্থা ও পর্যটন অবকাঠামোর উন্নয়ন যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা।
কারণ লেম্বুরবনে মানুষ আসে প্রকৃতির টানে। সেই প্রকৃতিই যদি পর্যটনের চাপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে হারিয়ে যাবে এই জায়গার মূল আকর্ষণ।
সাগর, নদী, বন আর লাল কাঁকড়ার এই মিতালি যদি পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ করা যায়, তাহলে কুয়াকাটার পর্যটন মানচিত্রে লেম্বুরবন শুধু একটি দর্শনীয় স্থান নয়—একটি সম্ভাবনাময় পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত হয়ে উঠতে পারে।
সময়ের আলো/জোই