কুয়াকাটার পর পর্যটনের নতুন ঠিকানা প্রকৃতির মায়ায় গঙ্গামতি

ছগির হোসেন, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)

সারাদেশ

বিস্তীর্ণ বেলাভূমি, ম্যানগ্রোভ বন, লাল কাঁকড়ার বিচরণ আর রামনাবাদ চ্যানেলের মোহনা—প্রকৃতির এমন নানা সৌন্দর্যে ঘেরা গঙ্গামতি সমুদ্র সৈকত ধীরে ধীরে

2026-09-27T11:32:43+00:00
2026-09-27T11:37:13+00:00
 
  রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১২ আশ্বিন ১৪৩৩
রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
সাগরকন্যার সাত রূপ, কুয়াকাটার সম্ভাবনা ও সংকট
কুয়াকাটার পর পর্যটনের নতুন ঠিকানা প্রকৃতির মায়ায় গঙ্গামতি
ছগির হোসেন, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)
প্রকাশ: রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৩২ এএম  আপডেট: ২৭.০৯.২০২৬ ১১:৩৭ এএম
প্রকৃতির মায়ায় গঙ্গামতির চর। ছবি : সময়ের আলো
বিস্তীর্ণ বেলাভূমি, ম্যানগ্রোভ বন, লাল কাঁকড়ার বিচরণ আর রামনাবাদ চ্যানেলের মোহনা—প্রকৃতির এমন নানা সৌন্দর্যে ঘেরা গঙ্গামতি সমুদ্র সৈকত ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠছে পর্যটকদের কাছে। একই স্থান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার সুযোগের পাশাপাশি পায়রা বন্দরের লাইটার জাহাজ দেখার সুবিধা থাকায় প্রতিদিনই বাড়ছে দর্শনার্থীর আনাগোনা। তবে সম্ভাবনাময় এই সৈকতে পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও আবাসনের ব্যবস্থা না থাকায় দীর্ঘমেয়াদে পর্যটন বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ধুলাসার ইউনিয়নের কুয়াকাটা পর্যটন নগরী থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার পূর্বে গঙ্গামতি সমুদ্র সৈকতের অবস্থান। চর গঙ্গামতি, গঙ্গামতি ও কাউয়ার চর এলাকা মিলিয়ে প্রায় তিন কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত এই সৈকত এখনো অনেকটাই প্রকৃতিনির্ভর। শান্ত পরিবেশ, দূষণমুক্ত বালুচর, ম্যানগ্রোভ বন ও বিস্তীর্ণ সৈকত মিলে এখানে তৈরি হয়েছে নৈসর্গিক পরিবেশ।

রামনাবাদ চ্যানেলের মোহনা সংলগ্ন হওয়ায় গঙ্গামতির রয়েছে বাড়তি আকর্ষণ। একই জায়গা থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার পাশাপাশি দূরে পায়রা বন্দরের লাইটার জাহাজ চলাচলের দৃশ্যও দেখা যায়। সৈকতের বিভিন্ন অংশে দেখা মেলে লাল কাঁকড়ার। এসব বৈশিষ্ট্যের কারণে কুয়াকাটায় আসা পর্যটকদের অনেকেই এখন গঙ্গামতিতে ছুটে আসছেন।


তবে পর্যটকদের জন্য এখনো এখানে নেই পর্যাপ্ত যোগাযোগব্যবস্থা, স্থায়ী নিরাপত্তা, শৌচাগার কিংবা রাতযাপনের সুবিধা। রাস্তাঘাটের অবস্থাও অনেকাংশে অবহেলিত। ফলে পর্যটকের আনাগোনা বাড়লেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে জায়গাটির পর্যটন সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

স্থানীয়দের দাবি, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে গঙ্গামতিকে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বড় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। পর্যটকদের নিরাপত্তা ও রাতযাপনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এখানে আরও বেশি দর্শনার্থী আসবেন। একই সঙ্গে বাড়বে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ।

ইতোমধ্যে গঙ্গামতিকে পর্যটনবান্ধব করতে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন। দীর্ঘদিন সৈকতের প্রবেশমুখে ছোট একটি খাল থাকায় যানবাহন নিয়ে সেখানে পৌঁছানো কঠিন ছিল। সম্প্রতি সেখানে সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। এতে পর্যটকদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দা ও জেলেদেরও চলাচল সহজ হয়েছে।

ঢাকা থেকে গঙ্গামতিতে ঘুরতে আসা পর্যটক মো. হেমায়েত উদ্দিন খান ও মোসা. ইসরাত জাহান খান দম্পতি বলেন, এর আগে তারা এখানে আসেননি। কুয়াকাটায় এসে গঙ্গামতির কথা জানতে পেরে দেখতে এসেছেন। তাদের ভাষ্য, গঙ্গামতি ও কাউয়ার চর অনেক বড় এলাকা। গাছপালা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ মিলিয়ে জায়গাটি অসাধারণ।

সিরাজগঞ্জ থেকে আসা পর্যটক মো. আসাদ উজ্জামান বলেন, এই এলাকায় এত বড় সৈকত আছে, তা অনেকেই জানেন না। এখানকার দৃশ্য খুবই সুন্দর। সৈকত থেকে পায়রা বন্দরের জাহাজ ও লাল কাঁকড়া দেখা যায়। সব মিলিয়ে পরিবেশটি উপভোগ করার মতো।


স্থানীয় মোটরসাইকেলচালক মজিবর রহমান বলেন, গঙ্গামতিতে পর্যটকদের রাতযাপনের ব্যবস্থা নেই। তাই সূর্যোদয় দেখতে কুয়াকাটা থেকে ভোররাতে পর্যটকদের নিয়ে আসতে হয়। কুয়াকাটায় আসা অনেক পর্যটক সকাল-বিকেলে গঙ্গামতিতে ঘুরতে আসেন এবং জায়গাটি তাদের ভালো লাগে।

ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী মো. জাকির হোসেন বলেন, পর্যটকেরা এখানে এসে নিশ্চিন্তে ঘোরাফেরা করেন, পরে আবার কুয়াকাটায় ফিরে যান। এখানে থাকার ব্যবস্থা থাকলে তাদের মতো স্থানীয় ব্যবসায়ীদেরও বেচাকেনা বাড়ত।

কুয়াকাটা ট্যুরিস্ট পুলিশের পরিদর্শক মো. নাজমুল হাসান বলেন, কুয়াকাটায় বেড়াতে আসা পর্যটকেরা বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ঘুরতে যান। সূর্যোদয় দেখতে ভোরে গঙ্গামতিতে পর্যটকদের ভিড় হয়। পাশাপাশি গঙ্গামতি ও কাউয়ার চর এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও উপভোগ করেন তারা। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্যুরিস্ট পুলিশ গঙ্গামতিসহ সব দর্শনীয় স্থানে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছে।


গঙ্গামতির পর্যটন সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াছিন সাদেক বলেন, গঙ্গামতির চর অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন এবং পর্যটকদের জন্য এটি নতুন আকর্ষণ হিসেবে গড়ে উঠেছে। যোগাযোগব্যবস্থা ও নিরাপত্তার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, কুয়াকাটা থেকে গঙ্গামতি পর্যন্ত বেড়িবাঁধের ওপর এলজিইডির মাধ্যমে রাস্তা পাকা করার কাজ চলমান। সড়কটি নির্মাণ শেষ হলে পর্যটনের জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকাকালে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৩৮ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি কালভার্ট নির্মাণ এবং অ্যাপ্রোচ সড়কের কাজ শেষ করেছেন। ফলে এখন পর্যটকেরা সরাসরি সৈকতে যেতে পারছেন। গঙ্গামতিকে পর্যটকবান্ধব করতে সামনে আরও কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান বলেন, গঙ্গামতিতে প্রচুর পর্যটক যাচ্ছেন। পর্যটকেরা কোনো স্পটে গেলে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উপজেলা প্রশাসন ও সরকারের দায়িত্ব। এ জন্য নিরাপত্তার স্বার্থে সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট চৌকি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ট্যুরিস্ট পুলিশ ও স্থানীয় থানার বিষয়টিকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।


তিনি আরও বলেন, সৈকতসংলগ্ন এলাকায় কোনো স্থাপনা নির্মাণে আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে বিনিয়োগকারীরা বেড়িবাঁধের বাইরে আশপাশের ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে বিনিয়োগ করতে পারবেন। তার মতে, গঙ্গামতি একটি বড় বিনিয়োগ খাত এবং অপার সম্ভাবনাময় পর্যটন স্পট।

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা গঙ্গামতিকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা গেলে পর্যটন শিল্পের পাশাপাশি উপকূলীয় মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাড়বে। যোগাযোগ, নিরাপত্তা, আবাসন ও অন্যান্য পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে কুয়াকাটা থেকে গঙ্গামতি পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকাটি ভবিষ্যতে একটি বড় বাণিজ্যিক ও পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে—এমন প্রত্যাশাই স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের।

সময়েরে আলো/জোই
  বিষয়:   গঙ্গামতি সমুদ্র সৈকত  গঙ্গামতি  কুয়াকাটা  পটুয়াখালী  কলাপাড়া  ধুলাসার  কাউয়ার চর  পর্যটন  পর্যটনকেন্দ্র  পায়রা বন্দর  রামনাবাদ চ্যানেল  লাল কাঁকড়া  সমুদ্র সৈকত  ট্যুরিজম  পর্যটন সম্ভাবনা  সময়ে 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: