ডেঙ্গু একটি মশাবাহিত ভাইরাসজনিত রোগ, যা গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছালে প্রাণঘাতী হতে পারে। বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার সময়ও রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে পারে। তাই ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করানো জরুরি।
যেভাবে ছড়ায় ডেঙ্গু
ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত স্ত্রী এডিস মশার কামড়ে এই রোগ ছড়ায়। সাধারণত দিনের বেলায় এ মশা বেশি সক্রিয় থাকে। বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। ফুলের টব, বালতি, পরিত্যক্ত পাত্র, ডাবের খোসা ও ছাদের জমে থাকা পানি মশার প্রজননস্থল হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপগ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা যায়। ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি প্রধান ধরন রয়েছে। একবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর অন্য ধরনের ভাইরাসে পুনরায় সংক্রমিত হলে গুরুতর ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণ
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার সাধারণত ৪ থেকে ১০ দিনের মধ্যে লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তবে অনেকের ক্ষেত্রে লক্ষণ মৃদু থাকে, এমনকি কোনো লক্ষণও নাও দেখা দিতে পারে।
ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণ
হঠাৎ উচ্চমাত্রার জ্বর
তীব্র মাথাব্যথা
চোখের পেছনে ব্যথা
পেশি, হাড় ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা
বমি বমি ভাব বা বমি
ত্বকে ফুসকুড়ি
দুর্বলতা ও অতিরিক্ত ক্লান্তি
কখনো নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত
এসব লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো উচিত। শুধু লক্ষণ দেখে নিশ্চিতভাবে ডেঙ্গু শনাক্ত করা যায় না।
যেসব লক্ষণ বিপদের সংকেত
ডেঙ্গু গুরুতর পর্যায়ে গেলে শরীরের রক্তনালি থেকে তরল বেরিয়ে যাওয়া, রক্তপাত এবং শকের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার পরবর্তী সময়টিতে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
বিপদের লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
তীব্র পেটব্যথা
বারবার বমি হওয়া
নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত
বমি বা পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাওয়া
দ্রুত শ্বাস নেওয়া বা শ্বাসকষ্ট
অস্বাভাবিক দুর্বলতা, অস্থিরতা বা তন্দ্রাচ্ছন্নতা
হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া
প্রস্রাবের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া
এসব লক্ষণের কোনোটি দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।
ডেঙ্গু হলে কী করবেন
ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। রোগীর অবস্থা ও উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তরল গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় পর্যবেক্ষণ সুস্থ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
ডেঙ্গু হলে করণীয়
১. চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা করান।
২. পর্যাপ্ত পানি ও তরল পান করুন। বমি হলে বা তরল পান করতে সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
৩. জ্বর ও ব্যথার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল গ্রহণ করা যেতে পারে।
৪. অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন ও অন্যান্য এনএসএআইডি-জাতীয় ব্যথানাশক চিকিৎসকের নির্দেশ ছাড়া গ্রহণ করবেন না। এগুলো রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
৫. জ্বর কমে গেলেও বিপদের লক্ষণগুলোর দিকে নজর রাখুন।
৬. গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে বাড়িতে চিকিৎসা চালিয়ে না গিয়ে হাসপাতালে যান।
রোগীর অবস্থা গুরুতর হলে হাসপাতালে ভর্তি, শিরায় তরল দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা ও অন্যান্য পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হতে পারে। প্লেটলেট কমলেই যে সবার প্লেটলেট দিতে হবে, তা নয়; এ বিষয়ে চিকিৎসক রোগীর সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেন।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয়
ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ করা এবং মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত থাকা।
প্রতিরোধে কয়েকটি পদক্ষেপ অনুসরণ করা জরুরি—
বাড়ি ও আশপাশে কোথাও পানি জমতে দেবেন না।
ফুলের টব, পানির পাত্র ও অন্যান্য জলাধার নিয়মিত পরিষ্কার করুন।
পানির ট্যাংক ও পাত্র ঢেকে রাখুন।
দিনের বেলায়ও মশা নিরোধক ব্যবহার করুন।
শরীরের বেশির ভাগ অংশ ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরুন।
জানালা ও দরজায় মশার জালি ব্যবহার করুন।
আশপাশে জমে থাকা পানি ও মশার প্রজননস্থল অপসারণে নিয়মিত উদ্যোগ নিন।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
জ্বরের সঙ্গে মাথাব্যথা, শরীরব্যথা, বমি বমি ভাব বা ফুসকুড়ি দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক তন্দ্রা বা প্রস্রাব কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে হাসপাতালে যেতে হবে।
সচেতনতা ও সময়মতো চিকিৎসাই ডেঙ্গুর জটিলতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই জ্বরকে অবহেলা না করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিন এবং নিজের পাশাপাশি পরিবার ও প্রতিবেশীদের মশামুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে সচেষ্ট হোন।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ