ভূমি অধিগ্রহণ, ইজারা ও মামলা অনলাইনে

রফিকুল ইসলাম সবুজ

জাতীয়

নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর, ভূমি রেকর্ড, ভূমি প্রশাসন ও ভূমি আপিলসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেবা ইতিমধ্যে অনলাইনে এসেছে। জমি নিয়ে দৌড়ঝাঁপ,

2026-10-10T02:12:16+00:00
2026-10-10T02:12:16+00:00
 
  শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬,
২৫ আশ্বিন ১৪৩৩
শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
জাতীয়
ভূমি অধিগ্রহণ, ইজারা ও মামলা অনলাইনে
রফিকুল ইসলাম সবুজ
প্রকাশ: শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬, ২:১২ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর, ভূমি রেকর্ড, ভূমি প্রশাসন ও ভূমি আপিলসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেবা ইতিমধ্যে অনলাইনে এসেছে। জমি নিয়ে দৌড়ঝাঁপ, কাগজপত্রের স্তূপ আর অফিসে অফিসে ঘোরার দিন শেষ করতে এবার ভূমিসেবার বাকি বড় অংশও ডিজিটাল করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। 

২০২৭ সালের মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল, সরকারি সম্পত্তির ইজারা ও বন্দোবস্ত এবং ভূমি সংক্রান্ত আপিল ও মামলা ব্যবস্থাপনাসহ গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো অনলাইনে আনার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল ব্যবস্থাপনা ডিসেম্বরের মধ্যে এবং সরকারি সম্পত্তির লিজ ব্যবস্থাপনা আগামী বছরের জুনে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। 

একই সঙ্গে বাজারভিত্তিক ভূমিমূল্য নির্ধারণ, ভূমি মালিকানা সনদ চালু এবং মৌজা ম্যাপ ডিজিটালাইজেশনের কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ফলে জমির মালিকানা, কর, অধিগ্রহণ ও ইজারা থেকে শুরু করে মামলা নিষ্পত্তি— ভূমিসেবার প্রায় পুরো ব্যবস্থাই একটি সমন্বিত ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আসতে যাচ্ছে।

অন্যদিকে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির সঙ্গে খাসজমি বা সরকারি স্বার্থসংশ্লিষ্ট জমি একই দাগে থাকলে নামজারির সময় সরকারি অংশ আলাদা করে চিহ্নিত করার নির্দেশ দিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। 

ফলে একই দাগের জমিতে ব্যক্তিমালিকানাধীন ও সরকারি জমি মিশে গিয়ে নামজারি বা ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের ক্ষেত্রে যে জটিলতা তৈরি হয়, তা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে গত ২৪ সেপ্টেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো এক প্রতিবেদনে ভূমিসেবার ডিজিটালাইজেশনের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ সময়সীমা তুলে ধরা হয়েছে। 

ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটালাইজেশন অনুবিভাগের উপ-সচিব সাদেকুর রহমান স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে বলা হয়, এরই মধ্যে ‘ভূমি’ অ্যাপ, ‘ভূমি পর্চা’ অ্যাপ এবং ‘ভূমি দৃষ্টি’ অ্যাপ চালু হয়েছে। নাগরিকরা অনলাইনে বিভিন্ন ভূমিসেবা গ্রহণের পাশাপাশি জমির তথ্য ও কর্মকর্তাদের উপস্থিতি সম্পর্কেও জানতে পারছেন।

বর্তমানে পুরোপুরি ডিজিটাল না হওয়া ভূমিসেবার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো ল্যান্ড ভ্যালুয়েশন সিস্টেম। এটি বাজারভিত্তিক চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নীতিগত সিদ্ধান্তের পর কারিগরি সহায়তার জন্য প্রকল্প শুরুর উদ্যোগ রয়েছে। এই ব্যবস্থার লক্ষ্য জমির অবস্থান, শ্রেণি, ব্যবহার ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে ভূমির মূল্য নির্ধারণ করা।

জিআইএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাজারমূল্য নির্ধারণের পাশাপাশি ভূমির রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুষম মূল্য নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হবে।

এ ছাড়া সার্টিফিকেট অব ল্যান্ড ওনারশিপ (সিএলও) বা ভূমি মালিকানা সনদ চালুর নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ জন্য প্রতিষ্ঠান গঠনের কার্যক্রম শুরু করার কথা জানিয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। এর লক্ষ্য হলো খতিয়ান, নামজারি, রেকর্ডসহ বিভিন্ন তথ্য সমন্বয় করে একটি আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য ভূমি মালিকানা ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা। ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন প্রকল্পের আওতায় পার্বত্য তিন জেলার ভূমি ব্যবস্থাপনাকেও ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ রয়েছে। বর্তমানে বিক্রয়যোগ্য জমির ক্ষেত্রে দলিলের ভিত্তিতে মালিকানা নির্ধারণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হলেও পার্বত্য এলাকায় ভূমি রেজিস্ট্রেশন, নামজারি, তৌজি বহি ও তথ্য-উপাত্ত প্রদানের প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল করার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এ ছাড়া ভূমি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল ব্যবস্থাপনা সিস্টেম (এলএআরএমএস) আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে অনলাইনে ভূমি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখলের আবেদন গ্রহণ, নোটিস জারি, ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং আইবাসের সঙ্গে আন্তঃসংযোগের মাধ্যমে সরাসরি সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থা হবে। জেলা পর্যায়ে সীমিত পরিসরে পাইলটিং কার্যক্রমের জন্য ডেটা প্রস্তুতের কাজও চলছে।

এরপর আগামী বছরের জুনে ‘ইজারা বন্দোবস্ত ও ব্যবস্থাপনা সিস্টেম’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর আওতায় সরকারি সম্পত্তি— যেমন সরকারি জলমহাল, হাট-বাজার, জলাশয়সহ বিভিন্ন সম্পত্তি অনলাইনে ইজারা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। 

হাট-বাজার ও চান্দিনা ভিটির জমির অনলাইন লিজ এবং খাসজমি ও অর্পিত সম্পত্তির লিজ বা বন্দোবস্তের জন্য অনলাইনে আবেদন গ্রহণ ও প্রদানের ব্যবস্থাও থাকবে। পেমেন্ট অনলাইনে দেওয়ার সুবিধা চালুর পাশাপাশি মহলের খাজনা আদায়ের প্রক্রিয়াও ডিজিটাল করার উদ্যোগ রয়েছে। 

এ ছাড়া মামলা ব্যবস্থাপনা ও তথ্য পদ্ধতি আগামী বছরের জুনে চালুর পরিকল্পনায় রয়েছে। এর মাধ্যমে ভূমি সংক্রান্ত আপিল মামলা, রিভিশন ও সরকারি মামলার নিষ্পত্তি অনলাইনে করা হবে। ভূমি থেকে শুরু করে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) এবং ভূমি আপিল বোর্ড পর্যন্ত মামলা ব্যবস্থাপনার একটি সমন্বিত ডিজিটাল কাঠামো তৈরি হবে।


অন্যদিকে মৌজা ম্যাপ ডিজিটালাইজেশন, অনলাইন প্রসেসিং এবং মৌজা ম্যাপ প্রদর্শনের কাজ চলমান রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ডিজিটাল ম্যাপগুলো নাগরিকদের ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার পাশাপাশি নাগরিকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রিত ডিএলআরএমএস ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ম্যাপ সরবরাহের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমান ডিজিটাল সেবার তালিকায় রয়েছে ই-মিউটেশন বা নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থাপনা (ডিএলআরএমএস), ভূমি প্রশাসন ব্যবস্থাপনা (এলএএমএস) এবং ল্যান্ড সার্ভিস গেটওয়ে (এলএসজি)। ই-মিউটেশনের মাধ্যমে অনলাইনে নামজারির আবেদন, ফি পরিশোধ, জমির মালিকানা পরিবর্তন, খতিয়ান সংশোধন ও আগের খতিয়ান সংশোধনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। 

ভূমি উন্নয়ন কর ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থায় হোল্ডিংয়ের তথ্য, নামজারির পর স্বয়ংক্রিয় হোল্ডিং সৃষ্টি, ভূমি উন্নয়ন কর নির্ধারণ এবং অনলাইনে কর দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থাপনায় খতিয়ান ও ম্যাপের আন্তঃসমন্বয়, স্যাটেলাইট খতিয়ান ও ম্যাপ এবং অনলাইনে খতিয়ান ও ম্যাপের জন্য আবেদন ও পেমেন্টের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ভূমি প্রশাসন ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থায় ভূমি প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তথ্য, অফিস ব্যবস্থাপনা, আন্তঃযোগাযোগ ও কনফারেন্স ব্যবস্থাপনাও যুক্ত হয়েছে।

অন্যদিকে ডিজিটাল ভূমিসেবার পাশাপাশি একই দাগে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি এবং খাস বা সরকারি স্বার্থসংশ্লিষ্ট জমি থাকলে কীভাবে নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন কর আদায় হবে, সে বিষয়ে গত ২৮ সেপ্টেম্বর পৃথক পরিপত্র জারি করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়েছে, এক বা একাধিক দাগের আংশিক জমি ব্যক্তিমালিকানাধীন এবং আংশিক জমি খাস বা সরকারি স্বার্থসংশ্লিষ্ট হলে সরকারি অংশের সীমানা নির্ধারণ করে ব্যক্তিমালিকানাধীন অংশের নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন কর আদায় করতে হবে। এ ক্ষেত্রে একই দাগের সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন অংশকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করতে হবে। 

সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে মৌজা ম্যাপ, খতিয়ান, দাগ, মৌজা ম্যাপের ধারাবাহিকতা এবং মালিকানা সংক্রান্ত দলিলপত্র পর্যালোচনা করে সরকারি অংশের সীমানা নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নামজারির আবেদন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিষয়টি যাচাই করবেন। প্রয়োজনে সরেজমিন তদন্ত করে সরকারি স্বার্থসংশ্লিষ্ট অংশ ও ব্যক্তিমালিকানাধীন অংশ আলাদা করে চিহ্নিত করতে হবে। এরপর ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির নামজারি করা হলেও সরকারি অংশকে পৃথকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।

পরিপত্রে আরও বলা হয়েছে, আদালতে সরকারি স্বার্থসংশ্লিষ্ট জমি নিয়ে মামলা চলমান থাকলে বা আদালতের কোনো রায় বা আদেশ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তা বিবেচনায় নিয়ে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন প্রকল্পে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন বা সংস্কারের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যও প্রকল্প পরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, একদিকে ভূমিসেবার বড় একটি অংশকে অনলাইনে এনে নাগরিকের হয়রানি ও সময় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে একই দাগে সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি থাকলে সরকারি জমি যেন ভুলক্রমে ব্যক্তির নামে চলে না যায়, সে বিষয়েও পৃথক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি করা হচ্ছে।

ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন জানিয়েছেন সরকার চেষ্টা করছে ভূমি ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি কমিয়ে মানুষকে ভালো সেবা দিতে। এ কারণে পুরোপুরি ডিজিটাল ভূমিসেবা চালুর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ডিজিটাল সার্ভে ও ভূমি জোনিং সম্পন্ন হলে ভূমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া আরও সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ হবে। ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হলে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অনলাইনে নির্বাচন করে অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করা যাবে।

তিনি বলেন, ভূমি জোনিং ও ভূমি ম্যাপিংয়ের কাজও এগিয়ে চলছে। ডিজিটাল সার্ভে শেষ করা গেলে ভূমি ব্যবস্থাপনার অনেক কাজ সহজ হয়ে যাবে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে
  বিষয়:   ভূমি অধিগ্রহণ  ইজারা  মামলা  অনলাইন  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: