আজ ১০ অক্টোবর, আন্তর্জাতিক মৃত্যুদণ্ডবিরোধী দিবস। মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার, মানবাধিকার সুরক্ষা, ন্যায়সংগত বিচারপ্রক্রিয়া এবং সর্বোচ্চ এই শাস্তি বিলোপের বিষয়ে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বাড়াতে দিবসটি পালিত হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০০৭ সালে ‘ইউরোপীয় মৃত্যুদণ্ডবিরোধী দিবস’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে সম্মত হয়। পরের বছর, ২০০৮ সালের ১০ অক্টোবর থেকে দিবসটি পালিত হতে থাকে। একই বছর ওয়ার্ল্ড কোয়ালিশন অ্যাগেইনস্ট দ্য ডেথ পেনাল্টি দিনটিকে আন্তর্জাতিক মৃত্যুদণ্ডবিরোধী দিবস হিসেবে পালনের উদ্যোগ নেয়।
অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বজুড়ে বিতর্কের বিষয়। সমর্থকদের মতে, গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে এ শাস্তি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে বিরোধীদের যুক্তি, মৃত্যুদণ্ড অপরিবর্তনীয় শাস্তি। বিচারপ্রক্রিয়ায় ভুল হলে কোনো নির্দোষ ব্যক্তির জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ থাকে না।
মানবাধিকারকর্মীরা মনে করেন, মানুষের জীবন ও মর্যাদা রক্ষায় ন্যায়সংগত বিচারপ্রক্রিয়া, নির্যাতনমুক্ত আচরণ এবং অপরাধের উপযুক্ত বিকল্প শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। ভুল রায়, বৈষম্য এবং বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে অসম সুযোগ মৃত্যুদণ্ড নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তোলে।
১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র গ্রহণ করে। এতে প্রত্যেক মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ মৃত্যুদণ্ডের বিধান বিলোপ কিংবা এর প্রয়োগ স্থগিত করার উদ্যোগ নেয়।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে মোট ১৪৫টি দেশ আইনিভাবে বা বাস্তবে মৃত্যুদণ্ড বাতিল করেছে, যার মধ্যে ১১৩টি দেশ সমস্ত অপরাধের জন্য পুরোপুরি মৃত্যুদণ্ড বাতিল করেছে।
মৃত্যুদণ্ড বিলোপের আন্তর্জাতিক আন্দোলনে জাতিসংঘও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০০৭ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত প্রস্তাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশের আহ্বান জানানো হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার সীমিত করা এবং পর্যায়ক্রমে এর বিলোপের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের মৌলিক অধিকার সনদের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে জীবনের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে এবং মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলোতে মৃত্যুদণ্ডবিরোধী নীতির অন্যতম ভিত্তি এই অবস্থান।
তবে, বিশ্বের সব দেশ মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে একই নীতি অনুসরণ করে না। কোনো কোনো দেশে এ শাস্তি এখনো আইনে বহাল রয়েছে। আবার কিছু দেশে আইনিভাবে মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করা হয়েছে, কিংবা দীর্ঘদিন ধরে তা কার্যকর করা হয় না। ফলে, মৃত্যুদণ্ডের নৈতিকতা, আইনি ভিত্তি ও মানবাধিকারগত প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
এ দিবসের আলোচনায় অপরাধের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ। গুরুতর অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা, ভুক্তভোগীদের সহায়তা দেওয়া, অপরাধ প্রতিরোধ এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি শাস্তির ধরন নিয়েও বিশ্বজুড়ে আলোচনা চলছে।
মৃত্যুদণ্ডের বিকল্প হিসেবে দীর্ঘমেয়াদি বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, পুনর্বাসন এবং অপরাধ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। এসব বিকল্পের প্রয়োগ নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকার কাঠামোর ওপর।
সময়ের আলো/মহু