আধুনিকতার এই যুগে এসেও যখন একজন নারী ঘরের বাইরে পা রাখেন, তখন প্রগতির চেয়েও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় তার নিজস্ব সুরক্ষার ব্যাপারটি। ঘর থেকে বের হলেই ইভটিজিং, কটূক্তি, নিরাপত্তার শঙ্কা কিংবা হয়রানির মুখোমুখি হওয়া যেন প্রতিটি নারীর নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা।
এসব ঘটনা শুধু নারীদের স্বাভাবিক চলাফেরা ও আত্মবিশ্বাসকে বাধাগ্রস্ত করছে না বরং প্রতিনিয়ত তাদের ভয়ের মধ্যে জীবনযাপন করতে বাধ্য করছে। তাই নারীদের নিরাপত্তার জন্য অন্যের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজেকে রক্ষা করার প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে হবে। আর একজন নারীর আত্মরক্ষার এই সক্ষমতা অর্জনে ইসলামের অবস্থানও সুস্পষ্ট।
ইসলামে মানুষের জীবন ও মর্যাদার সুরক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে এ মর্মে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন, ‘যে কারও প্রাণ রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষা করল’ (সুরা মায়িদাহ : ৩২)। এ আয়াত হতে প্রতীয়মান হয় যে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যক্তির জীবন ও শারীরিক নিরাপত্তা প্রদানও ইসলামে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও সওয়াবের কাজ। সুতরাং কোনো ব্যক্তি সে নারী বা পুরুষ যাই হোক না কেন তাকে তার নিজের এবং অন্যের নিরাপত্তা রক্ষা করতে হবে।
ইসলামের ইতিহাসেও নারীদের আত্মরক্ষার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে। খন্দকের যুদ্ধের সময় নারী সাহাবি সুফিয়া বিনতে আব্দুল মুত্তালিব (রা.) এক অনন্য সাহসিকতার পরিচয় দেন। যুদ্ধের সময় যখন সব পুরুষ সাহাবি যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যস্ত ছিলেন, তখন একজন ইহুদি শত্রু নারীদের তাঁবুর চারপাশে ঘোরাঘুরি করছিল, যা নারীদের জন্য বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সুফিয়া বিনতে আব্দুল মুত্তালিব তাঁবু থেকে বের হয়ে ওই ইহুদিকে একটি লাঠির সাহায্যে পরাস্ত করে নারীদের নিরাপত্তা দান করেন। এ ঘটনা প্রমাণ করে, প্রয়োজনের সময় একজন মুসলিম নারী নিজের ও অন্যদের নিরাপত্তার জন্য সাহসী ভূমিকা পালন করতে পারেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুর্বল মুমিনের চেয়ে শক্তিশালী মুমিন উত্তম এবং আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়’ (সহিহ মুসলিম)। এ হাদিসের মূল শিক্ষা হলো ঈমানের পাশাপাশি একজন মুমিনকে শারীরিকভাবেও সক্ষম ও আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। এখানে শক্তিশালী বলতে শুধু শারীরিক শক্তি বোঝায় না বরং মানসিক দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাস, জ্ঞান ও প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলার দক্ষতাও এর অন্তর্ভুক্ত।
সুতরাং একজন নারীকেও শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী হয়ে প্রয়োজনীয় মুহূর্তে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা বিধান করার যোগ্য হতে হবে। একজন নারী আত্মরক্ষার জন্য মার্শাল আর্ট বা কারাতেসহ বেশকিছু বাস্তব দক্ষতা অর্জন করতে পারেন। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সামগ্রী যেমন, পেপার স্প্রে বা টেকটিক্যাল পেন সর্বদা সঙ্গে রাখা উচিত। এগুলো বিপজ্জনক মুহূর্তে প্রতিপক্ষকে কাবু করতে বেশ কার্যকর।
মানবজীবনের প্রতিটি স্তরের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ইসলামে বিদ্যমান। ইসলাম জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীদের মর্যাদা ও সুরক্ষা প্রদান করেছে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে। তাই মুসলিম নারী মানেই ঘরের কোণে বন্দি হয়ে থাকা নয় বরং শালীনতা বজায় রেখে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারা।
তাই নারীদের কোনো অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করে নিজেদের আত্মরক্ষায় স্বাবলম্বী হওয়া আবশ্যক। ইসলাম কখনই নারীদের অসহায় হয়ে থাকার শিক্ষা দেয় না বরং নিজের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় সচেতন হওয়ার পথ দেখায়। একজন নারী যখন নিজের সুরক্ষায় সক্ষম হবেন, তখন সমাজে বিপর্যয় সৃষ্টকারী মানসিকতার প্রাদুর্ভাব কমবে এবং একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে উঠবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে