বগুড়ার আদমদীঘির সান্তাহারে তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার বা ইটিপি ছাড়াই অটোমেটিক চালকল পরিচালনা এবং অপরিশোধিত বর্জ্যপানিতে খাল-বিল ও ফসলি জমি দূষণের অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর মাঠে নেমেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এর আগে ৩০ সেপ্টেম্বর ও ১ অক্টোবর ‘আদমদীঘিতে বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) ছাড়াই চলছে চালকল, দূষিত হচ্ছে খাল-ফসলি জমি’ শিরোনামে বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসে; শুরু হয় তদন্ত।
সংবাদ প্রকাশের পর ৪ অক্টোবর দুপুরে বগুড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মাহমুদুল হাসান কয়েকটি অটোমেটিক চালকল পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি চালকলগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খতিয়ে দেখেন এবং অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানান। অন্যদিকে, পরিবেশদূষণ রোধ ও জনস্বার্থ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়ে গত ৭ অক্টোবর বুধবার দুপুরে বগুড়ার জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন সচেতন এলাকাবাসী।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আদমদীঘি উপজেলার মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি ও মাছ চাষ। অথচ বিভিন্ন কলকারখানার বিষাক্ত ধোঁয়া ও অপরিশোধিত তরল বর্জ্যের কারণে দিন দিন কৃষি ও জলজ পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ছে। বিশেষ করে সান্তাহার এলাকায় কয়েকটি অটোরাইস মিলের বর্জ্য সরাসরি খাল ও আবাদি জমিতে গিয়ে পড়ার দৃশ্য চোখে পড়ার মতো।
অভিযোগ রয়েছে, বুশরা অটো রাইস মিল, সুন্দরী অটো রাইস মিল, ইছামতী, ফুলজান, সালমান ও বৈশাখীসহ প্রায় ১৪টি অটোরাইস মিলের সিদ্ধ ও ধোয়া সেকশন থেকে বের হওয়া ক্ষতিকর ও দুর্গন্ধযুক্ত বর্জ্যপানি সরাসরি খাল, জলাশয় ও ফসলি জমিতে ফেলা হচ্ছে। নীতিমালায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।
নিয়ম অনুযায়ী, অটোরাইস মিলে বর্জ্যপানি শোধনের জন্য ইটিপি বা ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট থাকা বাধ্যতামূলক হলেও বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্ব নেই। দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব খাটিয়ে মিল মালিকরা এই অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী এ ধরনের বিষাক্ত অপরিশোধিত পানি প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া একটি দণ্ডনীয় অপরাধ, যার জন্য জেল-জরিমানার বিধান রয়েছে। কাগজে-কলমে নিয়ম লঙ্ঘনের কথা বলা হলেও বাস্তবে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
সরেজমিনে দেখা যায়, বুশরা অটো রাইস মিলের বর্জ্যপানি রেলওয়ের জায়গা ও ফসলি জমির পাশ দিয়ে ইরামতী খালে গিয়ে পড়ছে। অন্যদিকে সালমানসহ কয়েকটি মিলের বর্জ্যপানি ড্রেনের মাধ্যমে ফসলি জমি পার হয়ে সরাসরি খাড়িতে মিশছে। অন্য চালকলগুলোতেও একই চিত্র দেখা গেছে। মিলগুলোর অপরিশোধিত বর্জ্যপানি খাল ও জলাশয়ে পড়ায় পানির মান নষ্ট হচ্ছে এবং আবাদি জমি ও জলজ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এদিকে, মিলের বর্জ্য ও খালের পানির নমুনা সংগ্রহ করে সান্তাহার মৎস্য গবেষণাগারে পরীক্ষা করা হলে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে আসে। পরীক্ষায় দেখা যায়, পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের বা ডিও-এর স্বাভাবিক মাত্রা প্রতি লিটারে ৩ থেকে ৬ মিলিগ্রাম হওয়ার কথা থাকলেও মিলের পানিতে পাওয়া গেছে মাত্র ১.৪ মিলিগ্রাম এবং খালের পানিতে ১.২ মিলিগ্রাম।
এছাড়া পানির পিএইচ-এর স্বাভাবিক মাত্রা ৭.৫ থেকে ৮.৫ থাকার কথা থাকলেও মিলের পানিতে পাওয়া গেছে ৭.৩ এবং খালের পানিতে ৬.৮।
অ্যামোনিয়ার স্বাভাবিক মাত্রা যেখানে ০.০৫ থেকে ০.৫ মিলিগ্রাম হওয়া উচিত, সেখানে মিলের পানিতে এর পরিমাণ ১০ মিলিগ্রামের বেশি এবং খালের পানিতে ১২ মিলিগ্রামের বেশি পাওয়া গেছে।
পাশাপাশি, অ্যালকালিনটির স্বাভাবিক মাত্রা ২০ থেকে ৫০ মিলিগ্রামের মধ্যে থাকার কথা থাকলেও মিলের পানিতে পাওয়া গেছে মাত্র ০.৩ মিলিগ্রাম এবং খালের পানিতে তা শূন্য।
এ বিষয়ে বগুড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মাহমুদুল হাসান বলেন, সংবাদ প্রকাশের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। তদন্তে প্রাপ্ত সব তথ্য ও অভিযোগ লিপিবদ্ধ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে; তারাই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।
বগুড়ার জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান জানান, এ সংক্রান্ত একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সময়ের আলো/আতা