সৌদি আরবে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিদের হামলার ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে। গত কয়েক দিনে সৌদি আরবের বিমানবন্দরে দফায় দফায় হামলায় অনেকে হতাহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকও রয়েছেন। বিমানবন্দরের মতো বেসামরিক স্থাপনায় হামলায় মানুষের জীবন বিপন্ন হচ্ছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থাও হুমকির মুখে পড়েছে। এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন, কয়েকজন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে কয়েকজন নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন। বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রাণহানি আমাদের জন্য উদ্বেগের বিষয়। প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাদের পাঠানো টাকায় অসংখ্য পরিবারের জীবন চলে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কর্মস্থলের বাইরে যুদ্ধের ঝুঁকিতেও তাদের পড়তে হচ্ছে।
এ অবস্থায় সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় থাকা নাগরিকদের নিয়মিত সতর্কবার্তা দিতে হবে। আহতদের চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে সরকারকে সক্রিয় থাকতে হবে। মরদেহ দেশে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।
বেসামরিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী, বেসামরিক মানুষ ও বেসামরিক স্থাপনার সুরক্ষা নিশ্চিত করা সব পক্ষের দায়িত্ব। যুদ্ধের নামে সাধারণ মানুষকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। বিমানবন্দরে যাত্রী, কর্মী ও বিভিন্ন দেশের নাগরিকের উপস্থিতি স্বাভাবিক। সেখানে হামলা চালানো হলে নির্বিচার প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি হয়।
সৌদি আরব ও হুথিদের বিরোধ নতুন নয়। ইয়েমেনের ক্ষমতা ও ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাত চলছে। এর মধ্যে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের প্রভাবও এই লড়াইয়ে পড়ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
হুথিদের ওপর ইরানের প্রভাব নিয়ে সৌদি আরবের অভিযোগ রয়েছে। তবে ইরান বলছে, সামরিক পথে এই সমস্যার সমাধান মিলবে না। দেশটি মনে করে, এই সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন। ইরানের এই প্রস্তাব বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
যেকোনো আলোচনার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো উচিত। কারণ সামরিক শক্তি দিয়ে সাময়িক সাফল্য অর্জন করা গেলেও দীর্ঘদিনের বিরোধের স্থায়ী সমাধান করা কঠিন। পাল্টা সামরিক অভিযানের নামে বেসামরিক মানুষের ওপর নতুন বিপর্যয় যেন নেমে না আসে, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকতে হবে।
সৌদি আরবের নিরাপত্তা রক্ষা করা যেমন জরুরি, তেমনি ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের জীবন ও ভবিষ্যতের সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এক পক্ষের হামলার জবাবে অন্য পক্ষ আরও বড় হামলা চালালে সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে। এতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা, নৌপথ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর প্রভাব পড়বে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ ও বিশ্ব অর্থনীতিতে।
যেকোনো যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ। ইয়েমেনে দীর্ঘ সংঘাতের কারণে ইতিমধ্যে লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। নতুন করে যুদ্ধ তীব্র হলে আরও অনেক মানুষ নতুন করে দুর্ভোগে পড়বেন। সম্ভাব্য মানবিক বিপর্যয় এড়াতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পাশাপাশি জাতিসংঘ ও আঞ্চলিক দেশগুলোকে যুদ্ধবিরতির জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু সামরিক অভিযান বন্ধ করলেই চলবে না। সংঘাতের মূল কারণগুলো নিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। সৌদি আরব, ইরান, হুথিসহ ইয়েমেনের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে আলোচনায় বসতে হবে। প্রতিশোধ নয়, সংলাপ ও রাজনৈতিক সমাধানের পথে হাঁটলে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের টেকসই সমাধান মিলতে পারে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা