কৃষকের জন্য সার পাওয়া তার ন্যায্য অধিকার। কারণ সারের অভাবে ফসল ফলাতে না পারলে দেশের মানুষের কাছে তার জবাবদিহিতা থেকে যায়। ন্যায্যমূল্যে সময়মতো চাহিদা অনুসারে সার পাওয়ার ওপর কৃষকের ভাগ্য অনেকাংশে নির্ভরশীল। সেই সার বিতরণের দায়িত্ব যারা পাবেন তাদের নীতিমালা মেনে নিয়োগ দেওয়া হবে, সেটাই কাম্য। বাস্তবে নতুন সার ডিলার নিয়োগের তালিকা প্রকাশের পর অভিযোগ উঠেছে যে, অনেক ক্ষেত্রেই নীতিমালা মানা হয়নি। এ কারণে ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সময়ের আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ৫৫ জেলার আংশিক তালিকায় নিয়োগপ্রাপ্ত ডিলারদের প্রায় ৮০ শতাংশই অনভিজ্ঞ ও নতুন ট্রেড লাইসেন্সধারী। দীর্ঘদিন ধরে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এমন অভিজ্ঞ ব্যক্তি বাদ পড়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, এমন অনেককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাদের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা নেই বা কম। নিয়োগপ্রাপ্ত কোনো কোনো ডিলারের গুদাম ও সার বিক্রির দোকানের অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ডিলারশিপ পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা জরুরি।
নতুন ডিলার নিয়োগে নীতিমালা কতটুকু মানা হয়েছে, সেটা পর্যালোচনা করা দরকার। আগে ডিলার নিয়োগ হতো বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের অধীনে। পরে নতুন নীতিমালার মাধ্যমে এই দায়িত্ব কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় আনা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের কমিটির যাচাই-বাছাই শেষে যোগ্য প্রার্থীদের মধ্য থেকে তিনজনের নামের প্যানেল কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটিতে পাঠানোর কথা। অর্থাৎ প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে একাধিক স্তরে যাচাইয়ের ব্যবস্থা ছিল। তারপরও বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এতে ধারণা করা যায়, কাগজে-কলমে নিয়ম থাকলেও তা মানা হয়নি।
রাজশাহী, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, নীলফামারী, রংপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় ডিলার নিয়োগ নিয়ে আপত্তি উঠেছে। কোনো কোনো জায়গায় নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতিবাদে বিক্ষোভের ঘটনাও ঘটেছে। কোনো কোনো এলাকায় রাজনৈতিক নেতাদের স্ত্রী, সন্তান বা আত্মীয়দের ডিলারশিপ পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখা দরকার। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র জনসম্মুখে তুলে ধরতে হবে।
সারের ডিলার নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতি কাম্য নয়। এ ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি হলে শেষ পর্যন্ত তার খেসারত দিতে হয় কৃষককে। একজন ডিলারের শুধু পর্যাপ্ত মূলধন থাকলেই হয় না। সার সংরক্ষণের যথাযথ ব্যবস্থা থাকা চাই। ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা ও কৃষকের কাছে সময়মতো সার পৌঁছে দেওয়ার সামর্থ্য থাকা জরুরি। এসব যোগ্যতা উপেক্ষা করে কাউকে নিয়োগ দেওয়া চলে না। অযোগ্যদের নিয়োগ দিলে সময়মতো সার বিতরণে বিঘ্ন ঘটতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, অসাধু ডিলারদের কারসাজিতে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে; যা কৃষকের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। যদি রাজনৈতিক আনুগত্য কিংবা আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সারের ডিলারশিপ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয় তা হলে কৃষিসেবার বদলে ব্যক্তিস্বার্থ প্রাধান্য পাবে।
সারের ডিলার নিয়োগের তালিকা পুনর্বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। আমরা বলতে চাই, শুধু তালিকা সংশোধনের আশ্বাস দেওয়াই যথেষ্ট নয়। কৃষি মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। কোনো ডিলার নিয়োগে নীতিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণ মিললে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। ভবিষ্যতে ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সুপারিশ ও স্বার্থের সংঘাত ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্য সারের ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয় না। কৃষকের ফসল উৎপাদন ও দেশের খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে ডিলার নিয়োগ দিতে হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি