থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে বাংলাদেশের অর্থনীতির সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে। বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণসহায়তা পাওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তবে এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আলোচনা ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ হতে আরও কয়েক মাস লাগতে পারে। অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে এ ধরনের সহায়তা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। আইএমএফের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। এর আগে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও বিশ্বব্যাংক প্রবৃদ্ধির যে পূর্বাভাস দিয়েছিল তাতেও বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকার মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে চাচ্ছে। বাস্তবে সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। প্রবৃদ্ধি অর্জন আর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে সরকারের লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এ অবস্থায় বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে সম্ভাব্য ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণসহায়তা নিয়ে অগ্রগতির কথা জানা যাচ্ছে। যদিও অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, এ বিষয়ে আলোচনা চলছে, পরবর্তী সময়ে প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেওয়া হবে। কাজেই সম্ভাব্য ঋণের টাকার পরিমাণ নিয়ে আগাম আশাবাদী হওয়ার চেয়ে ঋণের শর্ত, সুদের হার, পরিশোধের সময়সীমা ও ব্যবহারের ক্ষেত্র সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা তৈরি করা প্রয়োজন।
ঋণের টাকা যদি উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা হয় এবং তার ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় তা হলে সেটা দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো হতে পারে। জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনীতির প্রয়োজনীয় সংস্কারে ঋণের টাকা কাজে লাগানো হলে দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাওয়া সম্ভব। ঋণ নেওয়ার আগে এর সম্ভাব্য সুফল ও ঝুঁকি নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও টাকা খরচের ওপর কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
অর্থনীতির মৌলিক দুর্বলতাগুলো দূর করাও জরুরি। রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, সরকারি ব্যয়ে অপচয় কমানো এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এখন সময়ের দাবি। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ঋণ কর্মসূচির সঙ্গে এসব সংস্কারের সম্পর্ক রয়েছে। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, ঋণের শর্ত পূরণে সরকার ধাপে ধাপে এগোতে চায়। সরকারের নিজস্ব অর্থনৈতিক কর্মসূচি ও অঙ্গীকারের সঙ্গে সংস্কারের সমন্বয় করা দরকার। তবে সংস্কার হতে হবে দেশের অর্থনীতির স্বার্থে। শুধু ঋণদাতার শর্ত পূরণ করাই সংস্কার নয়।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের বড় একটি শর্ত হচ্ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। তাদের জন্য মানসম্মত কাজের সুযোগ তৈরি না হলে জনসংখ্যার এই সম্ভাবনাময় অংশ অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে না। এ জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, রফতানিমুখী উৎপাদন, কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবার বিকাশে গুরুত্ব দিতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে। তবে প্রযুক্তির সুফল পেতে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, মানসম্মত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের আহ্বান জানালেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও দক্ষ জনশক্তিও গড়ে তুলতে হবে।
সাধারণ মানুষের জীবনে কী প্রভাব পড়ছে তার ভিত্তিতে ঋণসহায়তার সাফল্য বিচার করতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগের প্রসার এবং মানুষের প্রকৃত আয় বাড়াতে ঋণ কতটা অবদান রাখছে সেই হিসাব করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে ঋণের টাকা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে না পারলে বড় অঙ্কের ঋণেও অর্থনৈতিক সংকটের টেকসই সমাধান হবে না। সম্ভাব্য ঋণের প্রতিটি টাকা যেন জনস্বার্থে ব্যবহৃত হয় সে বিষয়ে এখনই সজাগ হতে হবে। সে জন্য ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় সরকারি খরচ কমিয়ে রাজস্ব ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হবে। বিদেশি ঋণ অর্থনীতিকে সাময়িক সহায়তা দিতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে হলে উৎপাদন বাড়াতে হবে, দক্ষতা তৈরি করতে হবে, সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে, দেশীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। তাই ব্যাংককের আলোচনা ইতিবাচক পথে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি সরকারের প্রধান দায়িত্ব হবে অর্থনীতির ভিত শক্ত করা।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে