দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা স্বপ্নের সীমাবদ্ধতা নয়

মো. তাহমিদ রহমান

মতামত

‘চক্ষু থাকিতে অন্ধ যারা আলোকের দুনিয়ায়, সিন্ধু সেচিয়া বিষ পায় তারা অমৃত নাহি পায়’— চোখ থাকা সত্ত্বেও এ পৃথিবীর অনেক

2026-10-15T06:10:05+00:00
2026-10-15T06:10:05+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬,
৩০ আশ্বিন ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
মতামত
বিশ্ব সাদাছড়ি দিবস
দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা স্বপ্নের সীমাবদ্ধতা নয়
মো. তাহমিদ রহমান
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:১০ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
‘চক্ষু থাকিতে অন্ধ যারা আলোকের দুনিয়ায়, সিন্ধু সেচিয়া বিষ পায় তারা অমৃত নাহি পায়’— চোখ থাকা সত্ত্বেও এ পৃথিবীর অনেক বিষয়ই আমরা বুঝতে পারি না। সুন্দর এই পৃথিবীর রূপ, রস, বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্য আমরা উপভোগ করি দৃষ্টিশক্তির মাধ্যমে। কিন্তু দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা চোখে দেখতে না পাওয়ায় পৃথিবীর এসব সৌন্দর্য প্রচলিত উপায়ে উপভোগ করতে পারেন না। তাই তাদের প্রতি আমাদের সহানুভূতি, ভালোবাসা ও দায়িত্ব অনেক বেশি। 

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও তাদের মেধা, দক্ষতা, শ্রম, প্রজ্ঞা ও আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। অথচ আমাদের সমাজে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা নিয়ে এখনও রয়েছে নানা নেতিবাচক ধারণা, বৈষম্য, অবহেলা ও অপ্রয়োজনীয় করুণা। দুঃখের বিষয়, পরিবার থেকেই অনেক সময় তাদের প্রতি অবজ্ঞা শুরু হয়। আধুনিক সমাজের অনেকে এখনও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ‘অন্ধ’ বা ‘কানা’ বলে সম্বোধন করেন, যা তাদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ।

সভ্যতার শুরু থেকেই মানবসমাজে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের অস্তিত্ব রয়েছে। অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত তাদের সম্পর্কে সমাজে নানা কুসংস্কার প্রচলিত ছিল। প্রাচীন গ্রিসে দৃষ্টিহীনদের বেঁচে থাকার অধিকার স্বীকৃত ছিল না। গ্রিক সভ্যতার স্পার্টায় দৃষ্টিহীনদের নির্মমভাবে হত্যা করা হতো। এথেন্সে দৃষ্টিহীন শিশুকে মাটির পাত্রে ভরে রাস্তার ধারে ফেলে রাখা হতো। ল্যাসিডেমোনিয়ায় দৃষ্টিহীন ও শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের গভীর খাদে ফেলে হত্যা করা হতো। অন্যদিকে ভারতীয় সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিশ্বাসের কিছু ধারায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতাকে দেবতার অভিশাপ বা পূর্বজন্মের কর্মফল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতার জন্য কি কোনো ব্যক্তিসত্তা দায়ী? এই বাস্তবতায় ১৫ অক্টোবর বিশ্ব সাদাছড়ি দিবস আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে— আমরা কি সত্যিই এমন একটি সমাজ গড়তে পেরেছি, যেখানে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সমমর্যাদা, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও সমান অধিকার নিয়ে বাঁচতে পারেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যেই এবারের প্রতিপাদ্যের তাৎপর্য নিহিত— ‘দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা মানেই স্বপ্নের সীমাবদ্ধতা নয়’। চোখের আলো না থাকলেও স্বপ্ন দেখার আলো নিভে যায় না। মানুষের স্বপ্ন দেখার জন্য দৃষ্টিশক্তি অপরিহার্য নয়; অপরিহার্য হলো স্বপ্ন দেখার সাহস, এগিয়ে যাওয়ার আত্মবিশ্বাস, সুযোগ পাওয়ার অধিকার এবং পাশে দাঁড়ানোর মতো একটি সহমর্মী সমাজ। পৃথিবীকে দেখার প্রচলিত মাধ্যম দৃষ্টিশক্তি হলেও পৃথিবীকে অনুভব করা, জ্ঞান অর্জন করা, সৃজনশীলতা প্রকাশ করা কিংবা সাফল্য অর্জনের জন্য শুধু চোখের ওপর নির্ভর করতে হয় না। পৃথিবীতে এমন অনেক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যারা দৃষ্টিহীনতা বা দৃষ্টিশক্তি হারানোর পরও নিজেদের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, মেধা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছেন এবং ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। প্রাচীন গ্রিসের মহাকবি হোমার জন্মান্ধ ছিলেন বলে প্রচলিত রয়েছে। পারস্যের কবি রুদাকিকে ফারসি সাহিত্যের অন্যতম পথিকৃৎ বলা হয়। ফরাসি লেখক জ্যাক লুসেইরান এবং আধুনিক আরবি কবিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি বাশশার ইবনে বুরদও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছিলেন। বিখ্যাত মার্কিন সংগীতশিল্পী রে চার্লস এবং ইংরেজ কবি জন মিল্টনও দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর সৃষ্টিশীল কাজ চালিয়ে গেছেন। ৪৪ বছর বয়সে সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন হয়ে যাওয়ার পর মিল্টন ‘প্যারাডাইস লস্ট’ ও ‘প্যারাডাইস রিগেইন্ড’-এর মতো কালজয়ী কাব্য রচনা করেন।


দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে ফরাসি উদ্ভাবক লুই ব্রেইলের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৮০৯ সালে জন্ম নেওয়া ব্রেইল তিন বছর বয়সে বাবার কর্মশালায় দুর্ঘটনার শিকার হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারান। কিন্তু তার মেধা ও অধ্যবসায় থেমে থাকেনি। দৃষ্টিহীন মানুষের পড়া ও লেখার সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি কাগজের ওপর ছয়টি উঁচু বিন্দুর সমন্বয়ে একটি বিশেষ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন, যা আজ ব্রেইল পদ্ধতি নামে পরিচিত। এই পদ্ধতি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা ও আত্মনির্ভরশীলতার পথ প্রসারিত করেছে। বিশ্ব সাদাছড়ি দিবসও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের নিরাপদ চলাচল, অধিকার ও সক্ষমতা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। ১৯৬৪ সালে আন্তর্জাতিক অন্ধ ফেডারেশন দিবসটি পালনের উদ্যোগ নেয়। বাংলাদেশও প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে দিবসটি পালন করে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষকে সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করা, তাদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো এবং অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এ দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য।

বাংলাদেশে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের জীবন এখনও নানা বাধায় পরিপূর্ণ। সরকারি উদ্যোগে দিবসটি উপলক্ষে শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা, মেধাবী শিক্ষার্থীদের সম্মাননা এবং উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের এককালীন অনুদান দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দেশের ৬৪ জেলায় স্মার্ট সাদাছড়ি বিতরণ করা হচ্ছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪৮ লাখ; তাদের মধ্যে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৭ লাখ। সাদাছড়ি তাদের নিরাপদে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাচলের একটি অপরিহার্য সহায়ক উপকরণ। এটি ব্যবহারকারীর সামনের বাধা শনাক্ত করতে সাহায্য করে এবং চালক ও পথচারীদেরও সতর্ক করে। তবে প্রচলিত সাদাছড়ি দিয়ে সব ধরনের বিপদ শনাক্ত করা সম্ভব নয়। গর্ত, মাথার ওপর ঝুলে থাকা বস্তু, চলন্ত যানবাহন কিংবা অপরিচিত পথের ঝুঁকি অনেক সময় অজানাই থেকে যায়। তাই সাদাছড়ির ব্যবহার সম্পর্কে প্রশিক্ষণ, চলাচলের উপযোগী অবকাঠামো, নিরাপদ ফুটপাথ এবং চালক ও পথচারীদের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

প্রযুক্তির অগ্রগতি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের জীবনেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটবিদ্যা, সংবেদক ও স্মার্ট প্রযুক্তির সমন্বয়ে সাদাছড়িকে আরও কার্যকর করা সম্ভব। আধুনিক স্মার্ট সাদাছড়িতে অতিধ্বনি সংবেদক, বৈশ্বিক অবস্থান নির্ণয়ব্যবস্থা এবং কণ্ঠনির্দেশনা যুক্ত করা যেতে পারে। এসব প্রযুক্তির সাহায্যে সামনের বাধা শনাক্ত করে কম্পন বা শব্দের মাধ্যমে ব্যবহারকারীকে সতর্ক করা সম্ভব। কণ্ঠনির্দেশনার মাধ্যমে অপরিচিত গন্তব্যে পৌঁছানোও সহজ হতে পারে। বিশেষ প্রযুক্তির সাহায্যে সড়কের সংকেত ও যানবাহনের অবস্থান সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়ার সুযোগও তৈরি হতে পারে। তবে স্মার্ট সাদাছড়ি যেন ব্যয়বহুল না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। দেশীয় প্রযুক্তিবিদ, গবেষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি-বেসরকারি সংস্থাকে এ ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তির সহজ ব্যবহার, স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, স্মার্ট সাদাছড়ি প্রচলিত সাদাছড়ির বিকল্প নয়; বরং এর সহায়ক। প্রযুক্তির প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন তা মানুষের জীবনমান উন্নত করে এবং কাউকে পিছিয়ে থাকতে দেয় না। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর সাদাছড়ি উদ্ভাবন ও সহজলভ্য করা তাই শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়, মানবিক দায়িত্বও। প্রযুক্তির সহায়তায় তাদের পথ হোক আরও নিরাপদ, স্বাধীন ও সম্ভাবনাময়।

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে
  বিষয়:   দৃষ্টি  সীমাবদ্ধতা  স্বপ্ন  সীমাবদ্ধতা 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: