প্রশাসন বলতে মানুষের অভিযোগ প্রদান ও সমস্যা সমাধানের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিবিশেষকে বোঝানো হয়। প্রশাসন সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের হতে পারে। এটি সবসময় মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করে থাকে। কারণ মানবসমাজে অন্যায়-অবিচার চলে বিধায় প্রশাসনের প্রয়োজন। অন্যথায় সভ্য সমাজ আশা করা যায় না। তবে এ ক্ষেত্রে প্রশাসনকে চলতে হবে তার নিজস্ব নীতিমালার ওপর। অপ্রশাসনিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকতে হবে। তা হলে জনগণ প্রশাসন থেকে আর প্রশাসন জনগণ থেকে সহযোগিতা পাওয়া সম্ভব হবে। ফলে আদর্শ রাষ্ট্র বা সমাজ গঠন করতে সক্ষম হবে। হজরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনাকে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহকে প্রশাসনিক শিক্ষা উপহার দিয়েছেন। এ ছাড়া হজরত ওমর (রা.)-এর প্রশাসনিক শিক্ষা নিয়ে এক বিশাল অধ্যায় রয়েছে, যা বিশ্বের প্রায় রাষ্ট্র অনুসরণ করে যাচ্ছে। তাই ইসলামি আইনের আলোকে প্রশাসনিক আইনকে সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হলে অবশ্যই দুর্নীতিমুক্ত, স্বজনপ্রীতিমুক্ত ও দালালমুক্ত প্রশাসন সৃষ্টি সম্ভব।
কুরআনে প্রশাসনের গুরুত্ব : অনেক সময় প্রশাসন দালালি শক্তির কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। যার দরুন প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে স্বজনপ্রীতির মহোৎসব শুরু হয়। প্রশাসনিকভাবে চলে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, ঘুষের লেনদেন, অযোগ্য জনশক্তি নিয়োগ দানসহ আরও অনেক অনিয়ম। যদি প্রশাসনকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) প্রদত্ত বিধান অনুযায়ী পরিচালনা করা হয়, তা হলে প্রশাসন অপশক্তির কাছে জিম্মি হতে পারে না। জনগণ তাদের ন্যায্য অধিকার ভোগ করতে সক্ষম হয়। যোগ্য ব্যক্তি দ্বারা প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়। মানবসমাজে বিবাদ সৃষ্টি হয় না। একে অন্যের প্রতি সহনশীল থাকে। যেমনটি হয়েছিল হজরত ওমর বিন আবদুল আজিজ (রহ.)-এর শাসনামলে। তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গিয়ে ইসলামি রাষ্ট্রনীতিকে এমনভাবে অনুসরণ করেছেন, যার ফলে বাঘ ও ছাগল একসঙ্গে মাঠে বিচরণ করা সম্ভব হয়েছিল। অথচ বাঘের সঙ্গে ছাগল চরা একটি অসম্ভব বিষয়। একইভাবে এখনও যদি প্রশাসনকে ইসলামী রাষ্ট্রনীতি অনুযায়ী পরিচালনা করা হয়, তা হলে রাষ্ট্রে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা সহজ হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদের যেন কখনো সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে, সুবিচার করবে, এটি তাকওয়ার নিকটতর (সুরা মায়িদা : ৮)। তিনি আরও বলেন, ‘আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সব আল্লাহরই এবং কর্ম বিধানে আল্লাহই যথেষ্ট। হে মানুষ! তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদের অপসারিত করতে ও অন্যকে আনতে পারেন, আল্লাহ এটা করতে সম্পূর্ণ সক্ষম।’ (সুরা নিসা : ১৩২-১৩৩)
জনগণের অধিকার রক্ষায় প্রশাসন : জনগণের সেবা করার জন্য প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য প্রশাসনের সৃষ্টি। তাই প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে জনগণের অধিকার আদায়ে কাজ করতে হবে। এতে কোনো ধরনের স্বজনপ্রীতি করা যাবে না। কারণ ইসলাম সবসময় অবিচার থেকে মুক্ত, ন্যায়পরায়ণতার পক্ষে কথা বলে। যারা ন্যায় ও সততার সঙ্গে শাসনভার পরিচালনা করবে তাদের ব্যাপারে পরকালে মহা পুরস্কারের কথা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ন্যায়-নীতিবান বিচারক কেয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে তাঁর ডান পাশে দীপ্তিমান মিম্বরের ওপর অবস্থান করবে। অবশ্য আল্লাহ তায়ালার উভয় পাশই ডান। তারাই সেসব বিচারক বা শাসক, যারা নিজেদের বিচার-বিধানে, নিজেদের পরিবার-পরিজনে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ইনসাফ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে (মুসলিম : ৪৮২৫)। তিনি আরও বলেন, ‘সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই একেকজন দায়িত্বশীল। আর কেয়ামতের দিন তোমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। সুতরাং জনগণের শাসকও একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি। কেয়ামতের দিন তার দায়িত্ব সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’ (বুখারি : ৭২২৫; মুসলিম : ৪৮২৮)
প্রশাসনিক শক্তির অপব্যবহারের পরিণাম : যেসব লোকেরা প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করার পর প্রশাসনিক শক্তিকে অপব্যবহার করে তাদের স্থান হবে জাহান্নামে। কারণ তারা প্রশাসনের কাজে অসৎ পন্থা অবলম্বন করা মানে জাতির সঙ্গে খেয়ানত করা। সুতরাং খেয়ানতকারী ও বিশ্বাস ঘাতকতাকারীরা কেয়ামতের দিন দোজখের আজাব থেকে বাঁচতে পারবে না। এ মর্মে হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেন, ‘যদি কোনো ব্যক্তি মুসলিম জনগণের শাসক নিযুক্ত হয়, অতঃপর সে প্রতারক বা আত্মসাৎকারীরূপে মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেবেন’ (বুখারি : ৭২৩৯; মুসলিম : ৩৮০)। আরও বলেন, ‘যদি কোনো ব্যক্তিকে আল্লাহ প্রজা পালনের দায়িত্ব অর্পণ করেন, কিন্তু সে তাদের কল্যাণকর নিরাপত্তা বিধান করল না, সে বেহেশতের গন্ধও পাবে না।’ (মিশকাত : ৩৫১৮)
জনগণের প্রতি সহনশীল হওয়া উচিত : প্রশাসন জনগণকে শাসন করতে গিয়ে সহনশীল হতে হবে। জনগণের দুঃখ-কষ্টে সহানুভূতি প্রকাশ করতে হবে। কারণ জনগণের প্রতি সহনশীল প্রকাশ মানবাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ প্রসঙ্গে হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেন, ‘লোকদের সঙ্গে সহজ ও সরল ব্যবহার করো, কষ্টদায়ক ব্যবহার করো না। তাদেরকে সান্ত্বনা প্রদান করো, বীতশ্রদ্ধ করো না’ (বুখারি : ৬১৯৩; মুসলিম : ৪৬২৬)। হাদিসে আরও আছে, হজরত মুহাম্মদ (সা.) যখনই তাঁর কোনো সাহাবিকে কোনো কাজে পাঠাতেন, তখন তাকে এভাবে উপদেশ দিতেন, তোমরা লোকদের আশার বাণী শোনাবে, নৈরাশ্যজনক কথা বলে তাদের বীতশ্রদ্ধ করে তুলবে না। তাদের সঙ্গে উদার ব্যবহার করবে, কঠোর ব্যবহার করবে না। (বুখারি : ৬৯; মুসলিম : ৪৬২২)
লেখক : শিক্ষক, নাজিরহাট বড় মাদরাসা, ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম
সময়ের আলো/মহু