জলবায়ু পরিবর্তন, ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সংকটে খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৬ কোটি মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। চরম তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি প্রায় ০.৫ শতাংশ পয়েন্ট কমছে। খাদ্য, জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি যুদ্ধের প্রভাবে বাড়ছে মূল্যস্ফীতি ও সরকারি ব্যয়ের চাপ।
এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সরকার চলতি অর্থবছরে ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের প্রত্যাশা করছে। একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে কর-জিডিপির অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করা, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংকসহ বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সংস্কার ও ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে চলছে বলে জানিয়েছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা।
বৃহস্পতিবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভার বিভিন্ন আলোচনা ও বৈঠকে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সংস্কার, প্রবৃদ্ধি, রাজস্ব আহরণ এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে এসব বক্তব্য উঠে আসে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সংস্কার কার্যক্রম ও সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সঙ্গে সহযোগিতার আলোচনা ভালোভাবে এগোচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার ফাঁকে আইএমএফের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং চলমান বৈশ্বিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে আইএমএফ সন্তুষ্ট।
চলতি অর্থবছরে বাজেটে নির্ধারিত ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের বিষয়ে সরকার আশাবাদী বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিকবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের নিজস্ব অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক সংস্কারে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, জাইকা, চীনের এক্সিম ব্যাংক ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা সহযোগিতা দিচ্ছে।
কর-জিডিপির অনুপাত ও ব্যাংক খাতের সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের এখানে খুব পরিষ্কার মনে রাখতে হবে, এই বিষয়গুলো ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন, আমরা কর-জিডিপির অনুপাত ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ শতাংশে উন্নীত করতে চাই। দ্বিতীয়ত, ব্যাংক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চাই।
জলবায়ু ও যুদ্ধের ধাক্কায় খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে : বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত ‘বিপর্যয়ের মুখে খাদ্য নিরাপত্তা’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় আইএমএফ, জাতিসংঘ এবং আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারকরা সংকটের বহুমাত্রিক প্রভাব তুলে ধরেন।
আইএমএফের ফিসক্যাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের পরিচালক রদ্রিগো ভালদেস বলেন, যুদ্ধ, বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থার সংকট, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং জ্বালানি ও সারের দামের অস্থিরতা খাদ্যবাজারকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
রদ্রিগো ভালদেসের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চরম তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে জিডিপি প্রায় ০.৫ শতাংশ পয়েন্ট কমছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও সাহেল অঞ্চলে তাপদাহের কারণে সরকারি রাজস্ব আয় ০.১৫ থেকে ০.৪ শতাংশ পয়েন্ট কমতে পারে। একই সঙ্গে তীব্র খরার কারণে সাহেল ও পূর্ব আফ্রিকায় সরকারি ব্যয় ৩ থেকে ৪ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত বাড়তে পারে।
আইএমএফের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর নাইজেল ক্লার্ক বলেন, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতাকে কেবল সাময়িক মানবিক বিপর্যয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন পুনরাবৃত্তিমূলক সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও রাজস্বগত ঝুঁকি। ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং এলনিনোর মতো আবহাওয়াগত বিপর্যয় খাদ্য, জ্বালানি, নৌপরিবহন ও সারের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে।
আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে বাড়ছে ব্যয় : সোমালিয়ার অর্থমন্ত্রী বিহি এগেহ পরিস্থিতিকে ‘ককটেল অব শকস’ বা একাধিক সংকটের মিশ্রণ হিসেবে বর্ণনা করেন।
বুরকিনা ফাসোর অর্থমন্ত্রী আবুবাকার নাকানাবো বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা কেবল কৃষিবিষয়ক সমস্যা নয়। এর সঙ্গে অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা, সরকারি রাজস্ব এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত।
জিবুতির অর্থমন্ত্রী ইলিয়াস মুসা দাওয়ালেহ জানান, প্রায় ১৫ লাখ জনসংখ্যার দেশটি শতভাগ খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। আঞ্চলিক অস্থিরতা, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে শরণার্থীদের আগমন খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে আরও কঠিন করে তুলছে।
জাতিসংঘের পশ্চিম এশিয়ার অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের (ইএসসিডব্লিউএ) নির্বাহী সচিব রোলা দাশতি বলেন, সংস্থাটির ২২টি সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে ৯টি সরাসরি সংঘাত বা সংঘাত-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে।
আগাম প্রস্তুতি ও সংস্কারই বড় চ্যালেঞ্জ : প্যানেল আলোচনায় বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের প্রভাব খাদ্যবাজারের পাশাপাশি সরকারি বাজেট, রাজস্ব আহরণ, সামাজিক সুরক্ষা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও পড়ছে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর, ঋণগ্রস্ত ও নিম্ন আয়ের দেশগুলো একাধিক সংকটের সম্মিলিত চাপে রয়েছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে