ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন নিয়ে নাগরিক সমাজের ১৯টি সংগঠন ও সম্প্রতি গঠিত গণমাধ্যম কমিটির মতবিনিময় সভা। ছবি : সংগৃহীত অংশীজনদের মতামত উপেক্ষা করে বিতর্কিত কাঠামোয় সাইবার সুরক্ষা আইন পাস করা হলে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য যেমন ক্ষতিকর হবে তেমনি এটি সরকারের জন্যও বুমেরাং ও আত্মঘাতী হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
রোববার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন নিয়ে নাগরিক সমাজের ১৯টি সংগঠন ও সম্প্রতি গঠিত গণমাধ্যম কমিটির মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মেটার মুনাফাকেন্দ্রিক অ্যালগরিদম ও প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি নিশ্চিত ব্যতীত কঠোর আইনের মাধ্যমে অপতথ্য ও সাইবার অপরাধ ঠেকানো সম্ভব নয়। বিশ্বের যেসব দেশ অপতথ্য নিয়ন্ত্রণে সফল তারা মেটার অ্যালগরিদমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে অগ্রগতি অর্জন করেছে। সামাজিকমাধ্যমে অপতথ্য ও ভুয়া খবর ছড়ানোর পেছনে প্ল্যাটফর্মগুলোর বিপুল আর্থিক মুনাফার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তিনি আরও বলেন, ব্যবসা সম্প্রসারণের স্বার্থে মেটা সংঘাত ও সহিংসতামূলক বক্তব্য বেশি প্রচার করে, অথচ ধর্মনিরপেক্ষ বা যৌক্তিক আলোচনা সেন্সর করে। রাজনৈতিক ক্ষমতা ও প্রযুক্তি ব্যবসার অশুভ আঁতাতের ফলে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে। প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি নিশ্চিত না করে সাধারণ নাগরিকদের ওপর আইন চাপিয়ে দেওয়া কোনো টেকসই সমাধান নয়।
আলোচনায় এ প্রসঙ্গে ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম বলেন, বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। ২০১২ সালে রামু বৌদ্ধপল্লীতে হামলা ও ২৫টি প্যাগোডা ভাঙচুর, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের গণহত্যা উসকে দেওয়া এবং সম্প্রতি ফেসবুকে সংঘবদ্ধভাবে মব তৈরি করে পিটিয়ে হত্যার মতো সহিংসতার ঘটনায় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ফেসবুকের অপব্যবহার ছিল।
তিনি আরও বলেন, সাইবার সুরক্ষা আইনের ২৬(ক) ধারা বাদ দেওয়া, ২৫ ধারায় মানহানি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য না করা, ৮(৩) ধারার অপব্যবহার রোধ এবং সাংবাদিকদের বিচারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ব্যবস্থা বাতিল করার বিষয়ে বৃহত্তর ঐকমত্য রয়েছে। তবে সামাজিকমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সার ও ইউটিউবারদের মাধ্যমে চরিত্রহনন এবং লাগামহীন অপপ্রচার থেকে সুরক্ষার উপায়ও বের করতে হবে।
যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্রের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মানহানি ফৌজদারি অপরাধের আওতায় না রেখে দেওয়ানি আইনের অধীনে এনে বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানার বিধান করা উচিত। বিদেশে বড় পত্রিকাগুলো সম্ভাব্য মানহানি মামলার জরিমানা পরিশোধের জন্য কোটি কোটি টাকার বাজেট রাখে। বাংলাদেশেও এমন ব্যবস্থা থাকা উচিত, যাতে কেউ ইচ্ছাকৃত মিথ্যা তথ্য দিয়ে কারও সম্মানহানি করলে তাকে বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ ও জরিমানা দিতে হয়।
আলোচনায় ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলাম বলেন, প্রস্তাবিত আইনটি দেখে মনে হচ্ছে, এটি শুধু ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের সুরক্ষার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এতে গণমাধ্যমকর্মীদের হাত-পা বেঁধে দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একজন ব্যক্তির অপরাধ বা ভুলের কারণে পুরো গণমাধ্যম বা মিডিয়া হাউস বন্ধ করে দেওয়ার মতো বিধানও রয়েছে।
শহীদুল ইসলাম আরও বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে গণমাধ্যমের ডেটা সেন্টারসহ সব প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতি জব্দ করার অবাধ ক্ষমতা পেয়েছেন। এতে একটি পুরো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া মানহানির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞাও আইনে নেই। তৃণমূল পর্যায়ের সংবাদকর্মীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও মতামত বিবেচনায় নিয়ে গ্রহণযোগ্য আইন প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।
সমাপনী বক্তব্যে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের সুরক্ষার প্রশ্নে নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যম একই পথের যাত্রী। তাই তাদের মধ্যে সমন্বয় ও ঐক্য জরুরি। তিনি প্রস্তাবিত আইনের নিবর্তনমূলক ধারাগুলো বাতিল করে নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে আইনটি সংশোধনের আহ্বান জানান।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি