ছবি : সংগৃহীত ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনকে সামনে রেখে আগামী ডিসেম্বরে দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংলাপে ইউপি নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে সহযোগিতা চাইবে সংস্থাটি। ইসির এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক দলের নেতারা। তারা বলেন, ভালো নির্বাচনের জন্য ইসির প্রতি আমাদের নৈতিক সমর্থন থাকবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এবার ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নির্বাচনি যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে ইসি। তাই এ নির্বাচনে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে রাখা সংস্থাটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছে কমিশন। এ কারণে এবার নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ, সাবেক কমিশন, কর্মকর্তা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপে বসার পরিকল্পনা করছে ইসি। এর ধারাবাহিকতায় ডিসেম্বরে দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করতে যাচ্ছে।
আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে শুরু হচ্ছে ইউপি নির্বাচন। ইসির ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী ২১ জানুয়ারি থেকে পাঁচ ধাপে অনুষ্ঠিত হবে এ নির্বাচন। গত ১৩ অক্টোবর ইসির ১৩তম কমিশন সভা শেষে পাঁচ ধাপে ইউপি নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা করেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। ইসির ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ২১ জানুয়ারি প্রথম ধাপ, ৪ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় ধাপ, ২৯ এপ্রিল তৃতীয় ধাপ, ১৩ মে চতুর্থ ধাপ এবং ২৭ মে পঞ্চম
ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, আনুমানিক ৪ হাজার ৩০০ ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে। আইন অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ২৭ মের মধ্যে এসব ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে। সাধারণত ভোটগ্রহণের প্রায় ৪২ থেকে ৪৫ দিন আগে এসব ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবেন সংশ্লিষ্ট জেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা।
তবে দীর্ঘ ১০ বছর পর দলীয় প্রতীক ছাড়া অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচন। তাই ইউপি নির্বাচনে একটি রাজনৈতিক দলের একাধিক প্রার্থী অংশ নিতে পারবেন। যদিও দল থেকে শুধু একজন প্রার্থীকেই সমর্থন দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে দলগুলো। এরপর নির্বাচনে জিততে হলে দলীয় সমর্থিত প্রার্থীকে নিজ দল এবং বিরোধী দলের একাধিক প্রার্থীকে মোকাবিলা করতে হবে। ফলে ইউপি নির্বাচনে পেশি শক্তির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এমন পরিস্থিতিতে সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ ও ভোটে সহিংসতা রোধে নির্বাচন শুরুর আগেই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসবে ইসি।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সময়ের আলোকে বলেন, ‘স্থানীয় নির্বাচনে অনেক মানুষ মারা যায়। অনেক সহিংসতা হয়। এবার যাতে কম মারা যায় বা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মী এবং তাদের লোকজন যেন কোনো হাঙ্গামা না করে এ বিষয়ে আগামী ডিসেম্বরে আমরা সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বসব এবং সবার সহযোগিতা কামনা করব। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের সঙ্গে মিটিং হচ্ছে, ভবিষতে আরও হবে। তবে সেনাবাহিনী নামানোর কোনো পরিকল্পনা নেই।’ দলগুলোর কাছে কী ধরনের সহযোগিতা চাইবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, সহযোগিতা বলতে যাতে সুন্দর নির্বাচন হয়। ঝামেলামুক্ত নির্বাচন হয়। কেউ যাতে ভায়োলেন্স না করে ইত্যাদি।
নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল রয়েছে ৬৩টি। এর মধ্যে তালিকার ৬ নম্বরে থাকা আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত রয়েছে। এ ছাড়া এবার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকছে না। তাই নির্বাচন নিয়ে মানুষের আগ্রহও অনেক বেশি। এর আগে ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, ওই নির্বাচনে ২৯টি রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছিল। এরপর ২০২১-২২ সালের স্থানীয় নির্বাচনে বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো দলীয়ভাবে নির্বাচন বর্জন করায় দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ৪০টি দলের মধ্যে মোট ১১টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। সেসব নির্বাচনে দলীয় অংশগ্রহণ কম হলেও সহিংসতা-প্রাণহানি ছিল উল্লেখযোগ্য।
নির্বাচন কমিশন ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি সহিংসতা ও প্রাণহানি ঘটেছিল। ওই নির্বাচনে ২৩৬ জন নিহত এবং ৮ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছিল। এরপর ২০২১-২২ সালের নির্বাচনে মোট ছয়টি ধাপে ভোট হয়, যার মধ্যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছিল।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু ২০২১ সালেই ইউপি সহিংসতায় ১১৩ জন নিহত হন। পরবর্তী ধাপের সংঘাতসহ এ সংখ্যা ১১৬ জন ছাড়িয়ে যায়। ২০১৬ ও ২০২১ সালের নির্বাচনে সহিংসতার অন্যতম কারণ ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর দলীয় প্রতীক ব্যবহার। এ কারণে একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থী ও মূল প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে তৃণমূল পর্যায়ে আধিপত্য বিস্তারের জেরে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে। তাই এ নির্বাচনে আগের সহিংসতার পুনরাবৃত্তি চায় না ইসি।
ইসির এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে রাজনৈতিক দলগুলো। এ বিষয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু সময়ের আলোকে বলেন, নির্বাচন কমিশনের একার পক্ষে স্থানীয় নির্বাচনের মতো এত বড় নির্বাচন শেষ ওঠানো কঠিন। কারণ স্থানীয় নির্বাচনে ওয়ার্ড পর্যায়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তাই একটি ভালো নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রতি আমাদের নৈতিক সমর্থন থাকবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব জহিরুল ইসলাম মুসা সময়ের আলোকে বলেন, ইসির এই উদ্যোগকে আমরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যত ধরনের সহযোগিতা আছে আমরা তা করব। কোনোভাবেই যেন এটি একটি সাজানো বা রক্তক্ষয়ী নির্বাচনের দিকে না যায় সেদিকে নজর রাখতে হবে। নির্বাচনে যারা প্রার্থী হতে চায় তারা যেন নির্বিঘ্নে প্রার্থী হতে পারে এবং এই নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু হয় ইসি যেন সেই উদ্যোগ নেয়।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আলীম সময়ের আলোকে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো যদি চায় তাহলে সহিংসতা অনেক কমে আসবে। যেটা আমরা জাতীয় নির্বাচনে দেখেছি। কোনো দলই চাইবে না মাঠে একাধিক প্রার্থী থাকুক। তারা সেভাবেই মাঠ গোছাচ্ছে বলে জানতে পেরেছি। তাই প্রার্থী কম হলে সহিংসতাও কম হবে। বিগত নির্বাচনগুলোতে দলীয় প্রতীকের কারণে সহিংসতা ও প্রাণহানি বেশি ঘটেছিল।
উল্লেখ্য, এবারই প্রথম কোনো স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় বা সংলাপের আয়োজন করতে যাচ্ছে ইসি। নির্বাচনে দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে ধারাবাহিক সংলাপ বা মতবিনিময় প্রথা চালু হয়েছিল ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে। এরপর ২০১২ সালে কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ। ২০১৭ সালে কে এম নূরুল হুদা এবং ২০২২ সালে কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন প্রতিটি নির্বাচন কমিশনই সংসদ নির্বাচন ও রোডম্যাপ ঘোষণার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের এই ধারা অব্যাহত রেখেছে। সবশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করেছে এ এম এম নাসির উদ্দিন কমিশন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি