কুমিল্লায় দখল-দূষণে অস্তিত্ব সংকটে ৬০ কিলোমিটারের বেরুলা খাল

লাকসাম (কুমিল্লা) প্রতিনিধি

সারাদেশ

প্রভাবশালীদের দখল, দূষণ ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের চাপে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে কুমিল্লার লাকসাম থেকে নোয়াখালীর চৌমুহনী পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ৬০ কিলোমিটার

2026-10-19T13:38:11+00:00
2026-10-19T13:38:11+00:00
 
  সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬,
৩ কার্তিক ১৪৩৩
সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
কুমিল্লায় দখল-দূষণে অস্তিত্ব সংকটে ৬০ কিলোমিটারের বেরুলা খাল
লাকসাম (কুমিল্লা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৩৮ পিএম 
অস্তিত্ব হারাতে বসেছে কুমিল্লার লাকসাম থেকে নোয়াখালীর চৌমুহনী পর্যন্ত বিস্তৃত খাল। ছবি : সময়ের আলো
প্রভাবশালীদের দখল, দূষণ ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের চাপে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে কুমিল্লার লাকসাম থেকে নোয়াখালীর চৌমুহনী পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ ঐতিহ্যবাহী বেরুলা খাল। বিভিন্ন স্থানে খাল ভরাট করে দোকানপাট ও বসতবাড়ি নির্মাণ করায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ। এতে একদিকে বর্ষায় পানি নিষ্কাশন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির সংকটে পড়ছেন কৃষকেরা। একসময় যে খালের পানিতে হাজারো একর জমিতে ফসল ফলত, সেটির অস্তিত্ব রক্ষায় এখন দ্রুত দখলমুক্তকরণ ও পুনঃখননের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষকেরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ডাকাতিয়া নদীর একটি শাখা বেরুলা খালের উৎপত্তি লাকসামের দৌলতগঞ্জ বাজারের দক্ষিণাংশের ফতেহপুর এলাকায়। কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের পূর্ব পাশ ঘেঁষে প্রবাহিত হয়ে খালটি নোয়াখালীর চৌমুহনী পর্যন্ত বিস্তৃত। দীর্ঘদিন ধরে কৃষিকাজ, পানি নিষ্কাশন ও স্থানীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে খালটি।

তবে গত কয়েক বছরে লাকসাম ও মনোহরগঞ্জ উপজেলার উত্তরদা বাজার, তুগুরিয়া, খিলাবাজার, নাথেরপেটুয়া ও বিপুলাসারসহ বিভিন্ন এলাকায় খালের জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। কোথাও টিনের ঘর, কোথাও পাকা দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। এতে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কোনো কোনো স্থানে খালের মূল গতিপথ চিহ্নিত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করাসহ বিভিন্ন উন্নয়নকাজের সময় খালটির বড় একটি অংশ ভরাট করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে অবশিষ্ট অংশের বিভিন্ন জায়গাও ভরাট করে দখলে নেওয়া হয়। এতে পানি চলাচলের পথ ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে। ফলে বর্ষায় পানি নিষ্কাশন এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষিজমিতে সেচের পানি সরবরাহ নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে।


সরেজমিনে দেখা যায়, মহাসড়কের পাশের বিভিন্ন স্থানে খালের জায়গা দখল করে অস্থায়ী ও স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। কোথাও খালটি সরু নালায় পরিণত হয়েছে, আবার কোথাও ভরাটের কারণে এর অস্তিত্ব প্রায় বিলীন। দীর্ঘদিন ধরে চলা এ পরিস্থিতিতে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা নিয়ে উদ্বিগ্ন স্থানীয় বাসিন্দারা।

নাথেরপেটুয়া বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাফর ইকবাল বাচ্চু বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই খাল ভরাট করে দখল করার প্রবণতা চলছে। গত কয়েক বছরে খালের ওপর দোকান নির্মাণ করে কেউ নিজে ব্যবসা করছেন, আবার কেউ ভাড়া দিয়ে আয় করছেন। এভাবে চলতে থাকলে একসময় খালটির অস্তিত্ব পুরোপুরি হারিয়ে যাবে। জনস্বার্থে খালটি দখলমুক্ত করতে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

বিপুলাসার এলাকার কৃষক আবু জাহের সবুজ বলেন, এক যুগ আগেও এ খালের পানি ব্যবহার করে তাঁরা ইরি-বোরো ধানের আবাদ করতেন। এখন খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় সেচের সেই সুযোগ অনেকটাই কমে গেছে। খালটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা গেলে কৃষকেরা আবারও সেচসুবিধা পাবেন।

প্রবীণ কৃষক কাজী আবু তাহের বলেন, একসময় লাকসাম, মনোহরগঞ্জ ও নাঙ্গলকোট উপজেলার পাশাপাশি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী ও বেগমগঞ্জ উপজেলার তিন হাজার একরেরও বেশি কৃষিজমির আবাদে এ খাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। বর্তমানে বিভিন্ন অংশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় কৃষিকাজে খালটির ব্যবহার কমেছে। এটি রক্ষা করা না গেলে কৃষি ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এ বিষয়ে মনোহরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিফাত জাহান বলেন, কৃষিকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রবহমান খালের বিকল্প নেই। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে এবং খাল রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, সরকারি খাল দখল করা দণ্ডনীয় অপরাধ। বেরুলা খাল দখলমুক্ত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয় কৃষক ও সচেতন মহলের দাবি, শুধু আশ্বাস নয়, খালের প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ করে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে হবে। পাশাপাশি ভরাট অংশ পুনঃখনন করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। তাদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ঐতিহ্যবাহী বেরুলা খাল হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি কৃষি ও পরিবেশের ক্ষতির মুখে পড়বে কয়েকটি উপজেলার মানুষ।

সময়ের আলো/জোই
  বিষয়:   দখল  দূষণ  অস্তিত্ব সংকট  বেরুলা খাল  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: