সংগৃহীত ছবিযানবাহনের বেপরোয়া গতি কেড়ে নিচ্ছে মানুষের প্রাণ। গতি রুখতে সরকার দেশের মহাসড়কগুলোতে বেঁধে দিচ্ছে গতিসীমা। বসানো হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ক্যামেরা। ইতিমধ্যে দেশের বেশ কিছু মহাসড়কে এই ক্যামেরা বসানো হয়েছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে সব মহাসড়ক এআই ক্যামেরার আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছে সরকার।
তবে যেসব মহাসড়কে এআই ক্যামেরা বসানো হয়নি সেখানে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না যানবাহনের গতি। এর অনিবার্য পরিণতিতে ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা। সর্বশেষ নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন ১৪ জন। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২৫ জন।
নাটোরে বাস দুর্ঘটনার জন্যও দ্রুতগতিকে প্রাথমিক কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। দুর্ঘটনার পর বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের উপ-পরিদর্শক (এসআই) শামীম হোসেন জানিয়েছেন, দ্রুতগতিতে চলা বাসটি অন্য একটি যানকে অতিক্রম করার সময় এ দুর্ঘটনা ঘটে। তবে তদন্তের পরই প্রকৃত কারণ জানা যাবে বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া যাত্রীদের সূত্রে জানা যায়, দুর্ঘটনার সময় চালকের পরিবর্তে সুপার ভাইজার বাসটি চালাচ্ছিলেন।
ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের রোড সেফটি প্রকল্প সমন্বয়কারী শারমিন রহমান বলেন, বিশ্বব্যাপী সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর প্রায় ৫৪ শতাংশের জন্য দায়ী অতিরিক্ত গতি। বাংলাদেশেও অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া যান চালানো দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ।
শারমিন রহমান জানান, ১৯৯৮ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত পুলিশের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৮২ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া চালানোর কারণে ঘটে।
এশিয়ান ট্রান্সপোর্ট অবজারভেটরির ২০২৫ সালের রোড সেফটি প্রোফাইল অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে প্রতি ১ হাজার কিলোমিটার সড়কে প্রায় ৬৭ জনের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জন নিহত হয়।
দুর্ঘটনায় নিহতদের ৫০ শতাংশের বেশি হচ্ছেন পথচারী, সাইকেল আরোহী এবং মোটরসাইকেলচালক, যারা উচ্চগতির দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
দেশের সড়ক পরিবহন খাতের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় ২০২৫ সালে দেশে ৫ হাজার ৪৯০ জনের মৃত্যু হয়। সংস্থাটির হিসাবে এটিই দেশের সড়কে সর্বোচ্চ মৃত্যুর সংখ্যা।
বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের বছর ২০১৮ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। আট বছর পর সংখ্যাটি দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। সড়ক পরিবহন খাতে কোনো পরিবর্তন না আসায় ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা। ২০১৯ সালে ৪ হাজার ১৩৮ জন, ২০২০ সালে ৩ হাজার ৯১৮ জন, ২০২১ সালে ৫ হাজার ৮৪ জন, ২০২২ সালে ৪ হাজার ৬৩৬ জন, ২০২৩ সালে ৫ হাজার ২৪ জন ও ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৫ হাজার ৪৮০ জন।
দেশে বর্তমানে ৭৫ হাজারের বেশি বাস ও ট্রাক মেয়াদোত্তীর্ণ। অর্থনৈতিক আয়ু শেষ হওয়া এসব মোটরযান সড়কে দুর্ঘটনা ও বিশৃঙ্খলার অন্যতম কারণ। ‘লক্কড়ঝক্কড়’ গাড়িগুলো পরিবেশদূষণেও রাখছে বড় ভূমিকা।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সরকার দেশের মহাসড়কগুলো গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তির সহায়তা নিচ্ছে। বসানো হচ্ছে এআই ক্যামেরা।
চলতি বছরের ১৮ আগস্ট থেকে সাইনবোর্ড থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত প্রায় ২৫০ কিলোমিটার মহাসড়কজুড়ে ১ হাজার ৪২৭টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত স্পিড ও ট্রাফিক নজরদারি ক্যামেরা বসানো হয়। যেকোনো ধরনের যানবাহন নির্দিষ্ট গতিসীমা অতিক্রম করলে এআই ক্যামেরাতে তা ধরা পড়ছে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরিমানা হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতেও কিছুসংখ্যক এআই ক্যামেরা বসানো হয়েছে।
এসব এআই ক্যামেরা বসানোর ফলে ওইসব মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশেই কমে গেছে এবং চালকরাও এখন অনেক বেশি সচেতন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা যায়, ৬৪ জেলা, সব মহানগর ও দেশের মহাসড়কগুলোতে এআই ক্যামেরার আওতায় আনা হবে। এ জন্য ১০ লাখ এআই ক্যামেরা কেনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে ব্যয় হবে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। আগামী দুই বছরের মধ্যে ক্যামেরাগুলো স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানায়, এআই ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধী শনাক্ত, যানবাহনের নম্বর প্লেট শনাক্ত, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন ও সন্দেহজনক গতিবিধি রিয়েল টাইমে চিহ্নিত করতে পারে।
হাইওয়ে পুলিশ প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক ফারুক আহমেদ বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়েতে এআই ক্যামেরা বসানোর পর চালকদের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। ফলে দুর্ঘটনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে সারা দেশের হাইওয়েগুলো এআই ক্যামেরার আওতায় আসবে বলে জানান তিনি।
উবার চালক আনোয়ার জানান, কয়েকদিন আগে তিনি ঢাকা থেকে কুমিল্লায় যান। হাইওয়েতে কিছু দূর পরপর এআই ক্যামেরা থাকার বিষয়টি তিনি জানতেন। তাই তিনি সচেতন ছিলেন, যাতে কোনোভাবেই স্পিড ৮০ কিলোমিটারের বেশি না ওঠে। তিনি আরও বলেন, দূরপাল্লার সব যানবাহনকেই এই গতিসীমা মেনে চলতে দেখা গেছে। এআই ক্যামেরা থাকার কারণে জরিমানার ভয়ে চালকরা এখন অনেক বেশি সচেতন। এভাবে চললে একদিকে দুর্ঘটনা যেমন কমবে তেমনি যাতায়াতের সময় কম লাগবে বলে জানান তিনি।
সম্প্রতি দেশে সড়ক দুর্ঘটনার ১৩টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। কারণগুলো হলো— ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, বেপরোয়া গতি, ওভারলোড, চালকদের অদক্ষতা ও অসুস্থতা, চালকদের বেতন-কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক অবকাঠামো, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল, তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতা ও জবাবদিহির ঘাটতি, আইন প্রয়োগে দুর্বলতা এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা