প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি : সময়ের আলো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ১৯৭১ সালে মানুষ জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিল। যুদ্ধের মাধ্যমে তারা এই মাতৃভূমিকে ছিনিয়ে এনেছিল। সেদিন যুদ্ধের মাঠে লাখ লাখ মানুষ যুদ্ধ করেছিল, কয়েক লাখ মানুষ শহীদ হয়েছিল। সেদিন আমরা দেখিনি কে মুসলমান, কে হিন্দু, কে বৌদ্ধ—আমরা কোনো ধর্ম দেখিনি। আমরা দেখেছি, তারা দেশকে স্বাধীন করতে চেয়েছিলেন। দেশের স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময় গণতন্ত্র হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। সে সময়ও ছাত্র-জনতাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা রাজপথে নেমে এসেছিল গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য। সেদিনও কিন্তু আমরা দেখিনি আমাদের পাশের বা সামনের-পেছনের কর্মী কোন ধর্মের।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে এ দেশের মানুষ ও ছাত্র-জনতা স্বৈরাচারকে বিদায় করেছিল। সমগ্র বাংলাদেশে লাখ লাখ মানুষ রাজপথে বেরিয়ে এসেছিল। শিশুরা ও মায়েরা-বোনেরা বেরিয়ে এসেছিল। স্বৈরাচার পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। গুলি খাওয়া মানুষ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ না খ্রিস্টান—কেউ কিন্তু আমরা তা জিজ্ঞেস করিনি। স্বৈরাচার গুলি করেছে, কারণ সে ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিল। আমার ভাই শহীদ হয়েছে, আমার ভাই আহত হয়েছে; হাসপাতালে নিতে কেউ তার ধর্মীয় পরিচয় জিজ্ঞেস করেনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এখানে উপস্থিত হয়েছি। এই দেশ আমাদের সবার। আমি যে ধর্মেরই হই না কেন, আমরা সবাই বাংলাদেশি। আমাদের একমাত্র পরিচয় হলো আমরা এই দেশের মানুষ। এ দেশেই আমরা বড় হয়েছি। রাজনৈতিক কারণে আমাকে ১৭ বছর বিদেশে থাকতে হয়েছে। আমি যখন লন্ডনে ছিলাম, তখন আমি সংখ্যালঘু ছিলাম। সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু বলে কোনো বিষয় নেই; মূল বিষয় হলো আমরা সবাই বাংলাদেশি। একাত্তরে এবং বিভিন্ন গণআন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন—আমি একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে সবার সহযোগিতা চাই। দেশের প্রতিটি ভাইবোনের কাছে কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা করছি।’
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরীর জেএমসেন হলের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে রাজশাহী থেকে সামরিক বিমানে করে তিনি চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিমানবন্দর থেকে সড়কপথে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তিনি নগরের রহমতগঞ্জের জেএমসেন হলের পূজামণ্ডপের উদ্দেশে রওনা হন এবং রাত ৮টার পর সেখানে পৌঁছান। সেখানে তিনি পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার, বিএনপির বিশেষ সম্পাদক বেলায়েত হোসেন মৃধা, হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের সহসভাপতি ও সংসদ সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরী, বিএনপির সহকারী সাংগঠনিক সম্পাদক জয়ন্ত কুমার কুন্ডু, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী এবং অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন।
বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের অভ্যর্থনা জানান বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগের সহসাংগঠনিক সম্পাদক, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এবং স্থানীয় সংসদসহ চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগরের নেতারা।
জেএমসেন হলের কর্মসূচি শেষে প্রধানমন্ত্রী নগরীর রেডিসন ব্লু হোটেলে চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির নেতাদের সঙ্গে একটি সাংগঠনিক সভায় অংশ নেন। এসব কর্মসূচি শেষে রাতেই তিনি চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। তার এই সফরকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এর আগে মঙ্গলবার সকালে রংপুরের রাধাগোবিন্দ মন্দিরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন তারেক রহমান। পরে তিনি রাজশাহীতে যান। সেখানে ধর্মসভা মন্দিরের দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শন শেষে ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে জনসভায় যোগ দেন এবং সেখান থেকেই চট্টগ্রামে আসেন।
অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আমি এখানে দুসপ্তাহ আগে এসে পূজাকমিটির সঙ্গে বৈঠক করেছিলাম। তখন আমি অন্যরকম পরিবেশ দেখেছিলাম। পুরো জাতিকে সঙ্গে নিয়ে কোনো রাষ্ট্র যদি সামাজিক কর্মকাণ্ড চালাতে না পারে, তা আধুনিক রাষ্ট্র হতে পারে না। একসময় ভিন্নমতের কোনো সুযোগ ছিল না। ফ্যামিলি কার্ডে ধর্ম-বর্ণের কোনো বিষয় নেই, যাদের প্রাপ্য, তারাই তা পাবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে পরিকল্পনার কথা বলেছেন, তা সবাইকে সঙ্গে নিয়েই বাস্তবায়ন করতে হবে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চেয়েছিলাম, যে বাংলাদেশে কোনো বৈষম্য থাকবে না। শহীদ মুক্তিযোদ্ধারাও এই বাংলাদেশ চেয়েছিলেন। আমরা সবাই বাংলাদেশি নাগরিক। চব্বিশ-পরবর্তী এই সংস্কৃতিকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। চব্বিশের গণআন্দোলনে ফ্যাসিবাদমুক্ত করতে সব ধর্মের মানুষ অংশ নিয়েছে। আমরা ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন চাই না। আমরা আশা করি, আপনারা কারও ভোটব্যাংক হবেন না। কেউ আমাদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করতে পারবে না। তারা (আওয়ামী লীগ) আপনাদের ওপর ভরসা করত, আপনারা তাদের ওপর ভরসা করতেন না।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘নতুন করে আমরা ভাবতে পারছি। এই ভাবতে পারার মাধ্যমেই আমরা এগিয়ে যেতে পারব। আসুন, আমরা সবাই মিলে চব্বিশের জুলাইয়ের রক্তভেজা ব্যালটে নির্বাচিত এই সরকারের হাত ধরে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাই।’
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘ভারত থেকে অনেক দম্পতি এসে বলেছেন যে বাংলাদেশে ভালো পূজা হচ্ছে। মিথ্যাচার দিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ইতিহাসকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।’
সময়ের আলো/আতা