বুধবার দুপুরে কুমিল্লার লাকসামের নাওটি রেলস্টেশনের আউটারে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে হতাহতের খবর পাওয়া না গেলেও প্রশ্ন উঠেছে রেলওয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা, বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং দায়িত্ব পালনের পদ্ধতি নিয়ে। ছবি : সময়ের আলো রেললাইনে চলছিল মেরামতের কাজ। বিচ্ছিন্ন ছিল রেলপথের একটি অংশ। অথচ সেই পথে ট্রেন চালানোর আগে চালককে দেওয়া হয়নি কোনো সতর্কবার্তা কিংবা বিশেষ নির্দেশনা। স্টেশন থেকে লাইন ক্লিয়ারেন্স পেয়ে স্বাভাবিক গতিতেই এগিয়ে যাচ্ছিল ঢাকাগামী কর্ণফুলী কমিউটার। সামনে প্রায় ১০০ মিটার দূরে লাল পতাকা দেখতে পেয়ে ট্রেন থামানোর চেষ্টা করেন লোকোমাস্টার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রক্ষা হয়নি। ইঞ্জিনসহ তিনটি বগি লাইনচ্যুত হয়। বুধবার দুপুরে কুমিল্লার লাকসামের নাওটি রেলস্টেশনের আউটারে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে হতাহতের খবর পাওয়া না গেলেও প্রশ্ন উঠেছে রেলওয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা, বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং দায়িত্ব পালনের পদ্ধতি নিয়ে।
দুর্ঘটনার পর ট্রেনটির লোকোমাস্টার মোয়াজ্জেম হোসেনের অভিযোগ, রেললাইনে মেরামতের কাজ চলার বিষয়ে তাঁকে কিছুই জানানো হয়নি। অন্যদিকে, ট্রেনটিকে লাইন ক্লিয়ারেন্স দেওয়া নাঙ্গলকোট স্টেশনমাস্টার জামাল হোসেনও দাবি করেছেন, এ ধরনের কাজের কোনো বার্তা তাঁরা পাননি। এমনকি কন্ট্রোল রুম থেকেও কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি। ফলে রেললাইনে মেরামতের কাজ চলার মধ্যেই কীভাবে ওই পথে ট্রেন চলাচলের অনুমতি দেওয়া হলো, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে গুরুতর প্রশ্ন।
বুধবার দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে দুর্ঘটনাটি ঘটে। লাকসাম রেলওয়ে থানার ওসি রাজিব চন্দ্র কর জানান, নাওটি স্টেশনের আউটারে ঢাকাগামী কর্ণফুলী কমিউটার ট্রেনের ইঞ্জিনসহ তিনটি বগি লাইনচ্যুত হয়। দুর্ঘটনার পর যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
দুর্ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে লোকোমাস্টার মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, নাঙ্গলকোট স্টেশন থেকে লাইন ক্লিয়ারেন্সের সংকেত ও কাগজপত্র নিয়ে তিনি লাকসামের দিকে যাত্রা শুরু করেন। রেললাইনে মেরামতের কাজ চলছে,এমন কোনো সতর্কবার্তা, কশন অর্ডার কিংবা গতিসীমা-সংক্রান্ত বিশেষ নির্দেশনা তাঁকে দেওয়া হয়নি।
তাঁর ভাষ্য,স্বাভাবিক গতিতে ট্রেন চালানোর সময় হঠাৎ সামনে প্রায় ১০০ মিটার দূরে লাল পতাকা দেখতে পান। তখন হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন থামানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ট্রেন থামাতে থামাতে সামনে গিয়ে দেখতে পান, রেললাইন বিচ্ছিন্ন এবং সেখানে মেরামতের কাজ চলছে।
দুর্ঘটনার সময় ট্রেনটির গতি ঘণ্টায় প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার ছিল বলে জানান তিনি। লোকোমাস্টারের অভিযোগ, লাইনে কাজ চলার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কেউ তাঁকে সতর্ক করেননি। তাঁর কাছে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পৌঁছালে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
স্টেশনমাস্টারেরও একই অভিযোগ
ট্রেনটিকে লাইন ক্লিয়ারেন্স দেওয়া নাঙ্গলকোট স্টেশনমাস্টার জামাল হোসেনও রেললাইনে মেরামতের কাজের বিষয়ে কোনো তথ্য না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন,রেলপথে মেরামতের কাজ করা হবে,এমন কোনো বার্তা তাঁদের কাছে আসেনি। কন্ট্রোল রুম থেকেও এ বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। এ কারণে তাঁরা কর্ণফুলী কমিউটার ট্রেনকে লাইন ক্লিয়ারেন্স দেন। পরে নাওটি স্টেশনের আউটারে ট্রেনটি লাইনচ্যুত হওয়ার খবর পান।
অন্যদিকে,এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে লাকসাম জংশনের স্টেশনমাস্টার ওমর ফারুকের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সাড়া পাওয়া যায়নি।
দুই বিভাগের দায় দেখছেন প্রকৌশলী
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে রেলওয়ের ট্রাফিক ও প্রকৌশল দুই বিভাগেরই দায় থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগের পূর্বাঞ্চলের ফেনী অঞ্চলের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী জয়দেব শীল।
তিনি বলেন, দুর্ঘটনার পেছনে দুটি বিষয় থাকতে পারে। প্রথমত, লাল পতাকা দেখানোর পরও ট্রেনটি সময়মতো থামানো সম্ভব হয়নি। দ্বিতীয়ত, আগের দিন থেকে রেললাইনে মেরামতের কাজ চললেও সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা বা কাগজপত্র পাঠানো হয়নি।
দুটি বিষয়ই খতিয়ে দেখা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, এ ঘটনায় ট্রাফিক কিংবা প্রকৌশল দুই বিভাগেরই দায় থাকতে পারে।
তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে দুর্ঘটনার জন্য কোনো নির্দিষ্ট বিভাগ বা কর্মকর্তাকে দায়ী করা যাচ্ছে না।
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা ফারহান মাহমুদকে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। রেলের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান এ তথ্য জানিয়েছেন।
তদন্তে রেললাইনে মেরামতের কাজের অনুমতি, কাজ চলাকালে ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, সংশ্লিষ্ট স্টেশন ও কন্ট্রোল রুমের মধ্যে যোগাযোগ এবং লোকোমাস্টারকে প্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল কি না,এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
রেলপথে মেরামতের কাজ চলার সময় ট্রেন চলাচল নিরাপদ রাখতে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও সতর্কবার্তা আদান-প্রদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নাওটির দুর্ঘটনায় সেই ব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি ছিল কিনা, তা তদন্তে স্পষ্ট হওয়ার কথা।
সময়ের আলো/আতা