এখন এইখানে না, রাস্তার ওই পাশে মাল পাবেন...

সালাহ উদ্দিন চৌধুরী

জাতীয়

রাজধানীর গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর যেন মাদকের এক প্রকাশ্য আস্তানা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (ডিএনসি) নিয়মিত অভিযান, দিন-রাত পুলিশের

2026-10-22T01:12:17+00:00
2026-10-22T01:12:17+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬,
৬ কার্তিক ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
জাতীয়
ইশরাকের পিস্তল কাণ্ডের পর যে চিত্র মিলল ঘুণ্টিঘরের
এখন এইখানে না, রাস্তার ওই পাশে মাল পাবেন...
সালাহ উদ্দিন চৌধুরী
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ১:১২ এএম 
মাদক সেবন করে অচেতন হয়ে ঘুণ্টিঘর এলাকায় স্যুয়ারেজ লাইনের পরিত্যক্ত পাইপে শুয়ে আছে একজন। বুধবার তোলা। ছবি : আবদুল হালিম
রাজধানীর গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর যেন মাদকের এক প্রকাশ্য আস্তানা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (ডিএনসি) নিয়মিত অভিযান, দিন-রাত পুলিশের টহল— কোনো কিছুতেই থামছে না মাদকের কেনাবেচা ও সেবন। এমনকি পুলিশের উপস্থিতিতেই চলছে প্রকাশ্যে গাঁজা কেনাবেচা। 

তবে এই মাদক স্পট ঘিরে সাম্প্রতিক অভিযানে মূলত ছিন্নমূল ও প্রান্তিক মাদকসেবীদেরই ধরপাকড় করা হচ্ছে। তবে মাদকের সরবরাহ চেইন ভেঙে কারবারের নেপথ্যের হোতাদের আইনের আওতায় আনা এবং মাদকাসক্তদের পুনর্বাসন ছাড়া এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বুধবার দুপুরে ঘুণ্টিঘরে গিয়ে দেখা যায়, গেন্ডারিয়া থানা পুলিশের একটি টহল গাড়ি অবস্থান করছে সেখানে। গাড়িটিতে কমপক্ষে ৫ জন পুলিশ অবস্থান করছিলেন। অদূরেই তিনটি মোটরসাইকেলে আরও ৫ জন পুলিশ সদস্যকে সেখানে অবস্থান করতে দেখা যায়। 

কর্তব্যরত এএসআই আরিফ জানান, তারা নিয়মিত টহলের অংশ হিসেবেই এখানে অবস্থান করছেন। অন্যদিকে সেখানে অবস্থানরত গেন্ডারিয়া থানা পুলিশের একজন এসআই জানান, এমপি ইশরাক হোসেনের ‘পিস্তলকাণ্ডের’ পর তারা চাপে আছেন। প্রতিদিনই পুলিশকে এখানে টহল দিতে হচ্ছে।

সেখানে অবস্থানকালেই একটি জিপ গাড়িতে গেন্ডারিয়া ঘুণ্টিঘরে মাদক স্পটে আসে বাংলাদেশ রেলওয়ের উচ্চপর্যায়ের একটি টিম। রেলের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি বেশ কিছুক্ষণ আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রেল কর্মকর্তা বলেন, এই মাদক স্পটে এমপি ইশরাক হোসেনের ‘পিস্তলকাণ্ডের’ পর তারাও চাপে আছেন। রেললাইন পার্শ্ববর্তী জমিতে বাউন্ডারি দেয়াল দেওয়ার বিষয়ে সরেজমিন পরিদর্শন করতে তারা এখানে এসছেন।

গেন্ডারিয়া রেলস্টেশন, রেললাইনের আশপাশ এবং পার্শ্ববর্তী এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ছিন্নমূল মানুষ রেললাইনের পাশে বিচ্ছিন্নভাবে অলস সময় কাটাচ্ছে। এরই মধ্যে একাধিকজনকে প্রকাশ্যেই মাদক (গাঁজা) সেবন করতে দেখা যায়। রেললাইনসংলগ্ন প্রধান সড়কের পাশে রেলওয়ের পক্ষ থেকে উঁচু সীমানাপ্রাচীর দেওয়া থাকলেও অপর পাশের সীমানাপ্রাচীর বেশ নিচু। পুরোনো ভাঙা সীমানাপ্রাচীরের অপর পাশেই ঘিঞ্জি আবাসিক এলাকা। রেললাইনসংলগ্ন সেসব আবাসিক এলাকার কোনো কোনো বাসার ছাদ থেকেই দেখা যায় মাদক বিক্রির দৃশ্য। এ সময় এক তরুণকে রেললাইনের পার্শ্ববর্তী ছোট সীমানাপ্রাচীরের পাশ থেকে টাকা দিয়ে অপর পাশে ছাদ থেকে মাদক সরবার করতে দেখা যায়। অপর পাশে ৪-৫ জন গ্রহণ করছিল গাঁজার পোটলা।


পুলিশের সামনে দিয়েই নির্ভয়ে হেঁটে যেতে দেখা যায় ছিন্নমূল মাদকাসক্ত অনেককে। এরকমই এক মাদকাসক্ত যুবক সুমনকে পরিচয় গোপন রেখে মাদকের প্রাপ্যতার বিষয়ে জিগ্যেস করলে তিনি জানান, ‘এখন এখানে নয়, মাল পাবেন (গাঁজা) রাস্তার ওই পাশে।’ তার কথার সূত্র ধরে রাস্তার বিপরীত পাশে রেলগেটসংলগ্ন চায়ের দোকানের সামনে গিয়ে দেখা যায় জটলা। আরেকটু এগিয়ে গেলে দেখা যায়, দিন-দুপুরেই প্রকাশে বিক্রি হচ্ছে মাদক। ঠিক ওই সময়ে রাস্তার বিপরীত পাশে পুলিশের জিপ গাড়ি ও মোটরসাইকেলসহ কমপক্ষে ১০ জন পুলিশ সদস্য অবস্থান করছিলেন।

স্থানীয়দের সঙ্গে এখানকার মাদকের বিষয়ে কথা বলতে চাইলে অধিকাংশই মুখ খুলতে চাননি। তবে একজন নাম প্রকাশ না করে বলেন, এসব বিষয়ে কথা বললে সমস্যায় পড়তে হবে। এখানকার লোকজন (মাদকের ক্রেতা-বিক্রেতা) খুবই ভয়ংকর।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এখানকার মাদকসেবীদের প্রায় সবাই ছিন্নমূল মানুষ। রেললাইনের আশপাশের খালি জায়গায় খোলা আকাশের নিচে, কেউবা ওয়াসার ফেলে যাওয়া পাইপের ভেতর, কেউবা পলিথিন দিয়ে খুপরি বানিয়ে তার ভেতরেই রাত কাটায়। সেখানেই এরা মাদক সেবন করে।

সরেজমিনও এসব তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায়। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আবর্জনার স্তূপে পরিত্যক্ত স্যুয়ারেজ পাইপের ভেতর এক ছিন্নমূল ব্যক্তিকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখা যায়। তবে এখানে পুলিশের নিয়মিত উপস্থিতির কারণে দিনের বেলায় এসব মানুষের উপস্থিত কম বলে জানান স্থানীয়রা। রাত হলে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।

এলাকবাসী জানায়, সময় বাঁচাতে অনেক সময় রেললাইনের পাশ দিয়ে পার্শ্ববর্তী মহল্লাগুলোতে তাদের যাতায়াতের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু মাদক ক্রেতা-বিক্রেতাদের আগ্রাসী মনোভাবে কারণে তারা এই পথ দিয়ে যাতায়াত করতে ভয় পান। এখানে মাদক বিক্রি ও সেবন একপ্রকার ওপেন সিক্রেট বিষয় বলে জানান তারা। মাদকসেবীদের অধিকাংশই গাঁজা সেবন করে।

তাদের মতে, গত শুক্রবার মন্ত্রী (পদত্যাগী) ইশরাক হোসেন এখানে অভিযান চালানোর পর থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ডিএনসির পক্ষ থেকে প্রতিদিনই অভিযান চালানো হচ্ছে। এসব অভিযানকে তারা ‘মশা মারতে কামান দাগানো’র সঙ্গে তুলনা করেন।

তারা বলেন, সাম্প্রতিক যেভাবে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা এখানে অভিযান চালাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে বড় ধরনের মাদক কারবার হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এখানকার মাকসেবীদের সবাই গাঁজা সেবন করে এবং সবাই সমাজের একেবারেই প্রান্তিক মানুষ।  অথচ দেশের বিভিন্ন স্থানে যেভাবে ইয়াবা ও সিনথেটিক মাদকে ছেয়ে গেছে ওইসব স্থানে এভাবে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা গেলে এবং মাদকের গড়ফাদারদের আইনের আওতায় আনতে পারলে প্রকৃত সুফল পাওয়া সম্ভব ছিল।

এখানকার মাদকসেবীদের ধরন সম্পর্কে পুলিশের কাছ থেকেও একই ধরনের বক্তব্য পাওয়া যায়। নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে গেন্ডারিয়া থানার একাধিক পুলিশ সদস্য বলেন, এসব মাদকাসক্তকে ধরার পর অনেক সময় তারা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন। থানার হাজতেই অনেক সময় এসব নেশাসক্তরা প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে ফেলে। এমনকি পুলিশের গাড়িতে নিয়ে যাওয়ার সময়ও অনেক সময় একই কাজ করে বসে তারা।

তবে শুধু মাদকাসক্ত আটক করে সমাজ থেকে মাদক দূর করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক। তিনি বলেন, মাদকাসক্ত নয়, মাদকের মূলোৎপাটন করতে হলে এর সরবরাহ চেইন ভেঙে ফেলতে হবে। এ জন্য মাদকের গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে হবে। সীমান্তে নজরদারি বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে মাদকাসক্তদের সুচিকিৎসা করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে। 

তবে পুলিশে বা ডিএনসির একার পক্ষে সমাজ থেকে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে। সেই সঙ্গে পরিবার ও সমাজের নেতৃস্থানীয়দেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। সুপরিকল্পিত সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া দেশ থেকে মাদকের অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।


সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে
  বিষয়:   ইশরাক  পিস্তল  কাণ্ড  ঘুণ্টিঘর 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: