সৌদি আরবের তেল স্থাপনা, বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে একের পর এক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে হুথি বিদ্রোহীরা। গ্রাফিক : সময়ের আলো সৌদি আরবের তেল স্থাপনা, বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে একের পর এক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে হুথি বিদ্রোহীরা। পাল্টা জবাবে হুথিদের সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে অভিযান চালাচ্ছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় সৌদি আরবে নিজেদের কূটনৈতিক উপস্থিতি সীমিত করার উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
একইসঙ্গে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর সদর দফতর সাময়িকভাবে খালি করে কর্মীদের বাসা থেকে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংঘাতের প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও। সব মিলিয়ে ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের সংঘাত নতুন আঞ্চলিক উত্তেজনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে আরও জটিল রূপ নিয়েছে। এমন অবস্থায় বিতর্কের মুখে পড়েছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। তার ক্ষমতায় থাকার সময় শেষ হয়ে আসছে বলেও অভিমত দিয়েছেন অনেকে।
সাম্প্রতিক হামলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটেছে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে। দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরামকোর শায়বাহ তেলক্ষেত্রের একটি স্থাপনা লক্ষ্য করে ছোড়া ড্রোন প্রতিহত করা হলেও এর ধ্বংসাবশেষের আঘাতে দুইজন নিহত এবং দুইজন আহত হন। নিহত ব্যক্তিদের একজন ফিলিপাইন ও অন্যজন নেপালের নাগরিক। আহতদের একজন পাকিস্তান এবং অন্যজন ভারতের নাগরিক। ড্রোনটির ধ্বংসাবশেষ তেলক্ষেত্রের সীমানার বাইরে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাড়িতে পড়ে আগুন ধরে যায়। তবে এ ঘটনায় স্থাপনাটির কার্যক্রম ব্যাহত হয়নি বলে জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
এর আগে সৌদির পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের দাম্মামে বাদশা ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও হামলার ঘটনা ঘটে। সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় দুইজন নিহত হন। তাদের একজন সৌদি নাগরিক, অন্যজন ভারতীয়। আহত হন আটজন, যাদের মধ্যে দুইজন বাংলাদেশি রয়েছেন। তাদের পরিচয় জানিয়েছে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। তারা হলেন— সজল চন্দ্র দাস ও মোহাম্মদ আবদুর রহিম।
বৃহস্পতিবার প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ২১ অক্টোবর রাত আনুমানিক ৯টায় দাম্মাম কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে এক হামলায় দুই বাংলাদেশি আহত হন। বর্তমানে তারা দাম্মামে সৌদি-জার্মান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রতিনিধি হাসপাতালে আহত ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তাদের চিকিৎসার বিষয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন। আহত দুই বাংলাদেশি গরম ও ধোঁয়ায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন। তাদের শরীরে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন নেই। বর্তমানে তারা সুস্থ আছেন এবং দূতাবাস প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলেছেন। শুক্রবার তারা হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেতে পারেন।
আহত অন্য ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন ভারতীয়, দুজন ইয়েমেনি, একজন সৌদি ও একজন নেপালি নাগরিক। তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং কয়েকজনের অবস্থা সংকটাপন্ন বলে জানানো হয়েছে। সাময়িক বিঘ্নের পর বিমানবন্দরটিতে বিমান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। তবে বেসামরিক বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার ঘটনা সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানিয়েছে, দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে একের পর এক ড্রোন শনাক্ত করে ধ্বংস করা হয়েছে। বুধবার জোটটি সৌদি আরবের দিকে ছোড়া সাতটি ড্রোন প্রতিহত করার দাবি করে। পরদিন বৃহস্পতিবার রিয়াদ, মদিনা ও পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের আকাশে আরও কয়েকটি ড্রোন ধ্বংস করার কথা জানানো হয়। জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব তথ্য জানান। তবে এসব হামলার দায় নিয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ ও হুথিদের বক্তব্যে বিরোধ রয়েছে। বিশেষ করে মদিনাকে লক্ষ্য করে ড্রোন ছোড়ার সৌদি দাবির সত্যতা অস্বীকার করেছে হুথিরা। গোষ্ঠীটির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, তারা মদিনার দিকে কোনো ড্রোন পাঠায়নি এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযানও পরিচালনা করেনি। মক্কা ও মদিনাকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগকেও তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে হামলার সংখ্যা ও লক্ষ্যবস্তু নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট মতবিরোধ রয়েছে।
এই সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সৌদি আরামকোর নিরাপত্তা পরিস্থিতি। বৃহস্পতিবার দাহরানে অবস্থিত কোম্পানিটির সদর দফতর খালি করে কর্মীদের বাসা থেকে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছয়টি সূত্র। হুথিদের ধারাবাহিক হামলার আশঙ্কায় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদন ও রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানটির এমন পদক্ষেপ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, আরামকোর স্থাপনায় হামলা শুধু সৌদি আরবের অর্থনীতি নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এর আগে দাহরানে কোম্পানিটির একটি ভবনে হামলায় কয়েকটি তলায় আগুন লাগা ও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়।
হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, তাদের যোদ্ধারা লোহিত সাগরের তীরবর্তী ইয়ানবু শহরের আরামকো স্থাপনা এবং রিয়াদে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ এসব হামলার সত্যতা নিশ্চিত করেনি। অন্যদিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, রিয়াদ ও ইয়ানবুর কাছাকাছি এলাকায় ড্রোন শনাক্ত করে ধ্বংস করা হয়েছে। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি দাবি থেকে বোঝা যায়, সংঘাতের পরিসর শুধু সৌদি আরবের দক্ষিণ সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই; দেশটির রাজধানী, পূর্বাঞ্চলীয় তেলসমৃদ্ধ এলাকা এবং লোহিত সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও নিরাপত্তাঝুঁকির আলোচনায় উঠে এসেছে।
সৌদি আরব ও হুথিদের বর্তমান সংঘাত বুঝতে হলে ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিতে হবে। ইয়েমেনে হুথিরা একটি শক্তিশালী সশস্ত্র রাজনৈতিক ও সামরিক গোষ্ঠী। দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বিরোধিতা করে তারা দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করছে। এই সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট। ইয়েমেনের সংঘাতে সৌদি আরবের সম্পৃক্ততার পেছনে সীমান্ত নিরাপত্তা, আঞ্চলিক প্রভাব এবং ইরানের সঙ্গে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। হুথিরা ইরানের সমর্থন পায়, যদিও তাদের সামরিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে কেবল তেহরানের নির্দেশের ফল হিসেবে দেখলে সংঘাতের স্থানীয় বাস্তবতা আড়ালে পড়ে যেতে পারে।
লোহিত সাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালিও এই সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এ প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ অঞ্চলে হুথিদের সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পেলে শুধু সৌদি আরবের নিরাপত্তা নয়, আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ও বাণিজ্যও ঝুঁকিতে পড়ে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের ইয়েমেন যুদ্ধে সম্পৃক্ততার সঙ্গে এই সামুদ্রিক নিরাপত্তার বিষয়টিও সম্পর্কিত। ফলে ইয়েমেনের সংঘাত ক্রমেই স্থানীয় ক্ষমতার লড়াইয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্বার্থের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।
সাম্প্রতিক উত্তেজনা বৃদ্ধির পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের প্রভাবও রয়েছে। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর তেহরান পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায়। এই বৃহত্তর সংঘাতের মধ্যে ইরান-সমর্থিত হুথিদের সৌদি আরববিরোধী তৎপরতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। তবে সৌদি আরবে প্রতিটি হামলার সঙ্গে ইরানের সরাসরি নির্দেশ বা সমন্বয় রয়েছে কি না, তা নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। বরং আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার, মিত্রগোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা এবং প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল এই বিষয়গুলো একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
নতুন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রও সৌদি আরবে নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সৌদি আরবে দায়িত্ব পালনরত জরুরি নন এমন কিছু সরকারি কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের দেশটি ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য কয়েকটি মার্কিন মিশন থেকেও কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র টমি পিগট বলেছেন, ইরান-সমর্থিত হুথিরা সৌদি আরবের বেসামরিক বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা বাড়িয়েছে। এসব হামলায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটছে এবং ভ্রমণব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। এর আগে রিয়াদের মার্কিন দূতাবাসও সৌদি আরবে সম্ভাব্য নতুন হুথি হামলার বিষয়ে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের তাৎপর্য হলো, সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখন শুধু দেশটির নিজস্ব প্রতিরক্ষা বা ইয়েমেন যুদ্ধের বিষয় নয়; এর সঙ্গে আঞ্চলিক কূটনৈতিক উপস্থিতি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িয়ে গেছে। তবে কূটনীতিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে সরাসরি বৃহত্তর যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এ ধরনের পদক্ষেপ সাধারণত ঝুঁকি মূল্যায়ন, কর্মীদের সুরক্ষা এবং সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা বিবেচনা করে নেওয়া হয়।
সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাবও দ্রুত দৃশ্যমান হচ্ছে। আরামকোর সদর দফতর খালি করার খবর প্রকাশের পর বৃহস্পতিবার সৌদি শেয়ারবাজারের প্রধান সূচক ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমে যায় বলে এলএসইজি ডেটায় উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে মে মাসের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর খবর পাওয়া যায়। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার্সের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ দশমিক ৬ ডলার বেড়ে ১১১ দশমিক ৮৮ ডলারে ওঠে। তবে তেলের দামের এই বৃদ্ধির পেছনে শুধু সৌদি আরবে হামলা নয়, বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধ, সরবরাহব্যবস্থার অনিশ্চয়তা এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে ঝুঁকি বৃদ্ধির মতো বিষয়ও ভূমিকা রাখতে পারে।
সৌদি আরব বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার একটি প্রধান কেন্দ্র। দেশটির তেল উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ বা রফতানিতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরকেন্দ্রিক নৌ-পথে অনিশ্চয়তা বাড়লে তেল পরিবহনের সময়, ব্যয় ও বিমা খরচও বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতে পড়তে পারে। বাংলাদেশসহ যেসব দেশ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি আমদানি করে, তাদের জন্য দীর্ঘস্থায়ী মূল্যবৃদ্ধি বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে। তবে এই প্রভাবের মাত্রা নির্ভর করবে সংঘাত কত দিন স্থায়ী হয় এবং বাস্তবে জ্বালানি সরবরাহ কতটা ব্যাহত হয় তার ওপর।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় প্রতিষ্ঠিত যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ইয়েমেনের যুদ্ধবিরতি সংঘাতের তীব্রতা কমাতে এবং রাজনৈতিক সমাধানের পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলা বেড়ে যাওয়ায় সেই সমঝোতার কার্যকারিতা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সৌদি জোট হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকেন্দ্র লক্ষ্য করে পাল্টা বিমান হামলা চালাচ্ছে বলে দেওয়া তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে হুথি মুখপাত্র দাবি করেছেন, জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে ইয়েমেনে সৌদি হামলায় অন্তত ৫৬২ জন হতাহত হয়েছেন। এই সংখ্যা ও দায়ের বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ অব্যাহত থাকলে বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, দুই পক্ষের সামরিক পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামবে। সৌদি আরবের জন্য তেল স্থাপনা, বিমানবন্দর ও জনবহুল এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যদিকে হুথিদের হামলা অব্যাহত থাকলে সৌদি জোটের পাল্টা অভিযান আরও বিস্তৃত হতে পারে। এতে ইয়েমেনের অভ্যন্তরে সংঘাত বাড়ার পাশাপাশি সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক নৌ-পরিবহন ও জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। মক্কা ও মদিনার মতো সংবেদনশীল ধর্মীয় স্থানকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলছে। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ও স্বাধীন যাচাই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যাতে ভুল তথ্য বা অপ্রমাণিত দাবি উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে না দেয়।
সব মিলিয়ে সৌদি আরব ও হুথিদের সংঘাত এখন আর কেবল ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের সম্প্রসারিত অংশ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরানকে ঘিরে বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা স্বার্থ, সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোর সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের স্থিতিশীলতা। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সামরিকভাবে প্রতিহত করা গেলেও তার ধ্বংসাবশেষে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং পাল্টা হামলার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে শুধু সামরিক প্রতিরক্ষা দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সংঘাত কমাতে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ, যুদ্ধবিরতি পুনরুজ্জীবন এবং ইয়েমেনের রাজনৈতিক সংকট সমাধানের পথ খুঁজে বের করা জরুরি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে