অধিকৃত পশ্চিম তীরে হেবরনের কাছে একটি সড়ক সংযোগস্থলে গুলির ঘটনার পর অ্যাম্বুলেন্সের পাশে জড়ো হয়েছেন ইসরায়েলি সেনা ও জরুরি সেবাকর্মীরা। ছবি : এপি অধিকৃত পশ্চিম তীরে গুলির ঘটনায় পাঁচ ইসরায়েলি আহত হওয়ার পর পুরো অঞ্চলটিতে ‘পূর্ণ অবরোধ’ আরোপের প্রস্তুতি নিতে নিরাপত্তা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনের হেবরন শহর ঘিরে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, পশ্চিম তীরের প্রতিটি শহর ও গ্রামকে ‘ছোট কারাগারে’ পরিণত করার অভিযোগ তুলে নেতানিয়াহু সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন ফিলিস্তিনি রাজনীতিক মুস্তাফা বারঘৌতি।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর পশ্চিম তীরে অবরোধ আরোপের নির্দেশ দেওয়ার কথা জানান নেতানিয়াহু। তার ঘোষণা অনুযায়ী, ওই দিন পরবর্তী সময়ে এ অবরোধ কার্যকর হওয়ার কথা।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ও উদ্ধারকারী সংস্থা ম্যাগেন ডেভিড অ্যাডমের তথ্য অনুযায়ী, হেবরনের কাছে ইসরায়েলি বসতি কিরিয়াত আরবার নিকটবর্তী একটি সড়ক সংযোগস্থলে গুলির ঘটনায় পাঁচ ইসরায়েলি আহত হন। তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, দুই ফিলিস্তিনি গাড়িতে করে ওই এলাকায় এসে গুলি চালিয়ে পালিয়ে যান। পরে ইসরায়েলি সেনাদের সঙ্গে গোলাগুলিতে তারা নিহত হন। সম্ভাব্য অন্য সন্দেহভাজনদের খোঁজে সংশ্লিষ্ট এলাকা ঘিরে রেখে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। তাৎক্ষণিকভাবে কোনো গোষ্ঠী এ হামলার দায় স্বীকার করেনি।
নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, পশ্চিম তীরজুড়ে ব্যাপক গ্রেফতার অভিযান চালাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী।
পশ্চিম তীরকে ‘ছোট কারাগারে’ পরিণত করার অভিযোগ
পশ্চিম তীরে অবরোধ জোরদারের উদ্যোগের সমালোচনা করে ফিলিস্তিনি রাজনীতিক মুস্তাফা বারঘৌতি বলেছেন, নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ আরও বাড়াচ্ছেন। তার অভিযোগ, অবরোধের মাধ্যমে পশ্চিম তীরের প্রতিটি শহর ও ছোট গ্রামকে কার্যত ছোট কারাগারে পরিণত করা হচ্ছে।
আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বারঘৌতি বলেন, পশ্চিম তীরে প্রায় ১ হাজার ৩০০টি সামরিক চেকপোস্টের পাশাপাশি বিভিন্ন সামরিক ফটক রয়েছে। এসব প্রতিবন্ধকতা ফিলিস্তিনি জনবসতিগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে রাখছে এবং মানুষের স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত করছে। এর ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ ও শিক্ষাব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিরা প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছেন। যেকোনো জায়গায় তারা হামলার শিকার হতে পারেন— হয় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হাতে, নয়তো ইসরায়েলি সেনাদের মাধ্যমে।
জলপাই সংগ্রহের মৌসুমেও ফিলিস্তিনিরা নিজেদের জমিতে যেতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেন বারঘৌতি। তার ভাষ্য, অনেকে নিজেদের জলপাইগাছের ফল সংগ্রহ করতে পারছেন না, এমনকি মালিকানাধীন জমিতেও পৌঁছাতে পারছেন না।
ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান পরিস্থিতিকে ‘আতঙ্কের যুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি। বারঘৌতির আশঙ্কা, এভাবে সম্মিলিত শাস্তি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি একসময় বিস্ফোরণমুখী হয়ে উঠতে পারে।
পশ্চিম তীরে সাম্প্রতিক গুলির ঘটনার জন্যও ইসরায়েল সরকারকে দায়ী করেন বারঘৌতি। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ, জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এবং অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের নাম উল্লেখ করেন তিনি।
পশ্চিম তীরে বাড়ছে সহিংসতা
পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান ও বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় ফিলিস্তিনিদের হতাহত হওয়ার ঘটনা বাড়ছে। এসব সহিংসতার কারণে বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে হচ্ছে।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক দফতরের (ওসিএইচএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবর মাসে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের হাতে পাঁচ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ২৪০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। বছরের শুরু থেকে বসতি স্থাপনকারীদের ২ হাজার ৬০টি হামলায় ফিলিস্তিনিরা হতাহত হয়েছেন অথবা তাঁদের সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ