চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শয্যা না পেয়ে মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ছবি : সময়ের আলোজ্যামিতিক হারে রোগী বাড়ছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক)। বিপরীতে রোগীর শয্যা বেড়েছে কচ্ছপগতিতে। পঞ্চাশের দশকে প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতালে শয্যা একেবারেই অপ্রতুল। স্বাভাবিক সময়েই বাড়তি রোগীর চাপে ঠাঁই নেই ঠাঁই অবস্থা থাকে। বিশেষ কোনো রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পেলে শয্যা সংকট প্রকট রূপ নেয়। বর্তমান ডেঙ্গু-হাম প্রকোপের সময় শয্যা সংকট বহুগুণ বেড়েছে। ভর্তি রোগীর একটি বড় অংশ চিকিৎসা নিচ্ছেন ফ্লোরে শয্যা পেতে। সার্জারি বিভাগসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে আছে যন্ত্রপাতির সংকট। বছরের বেশিরভাগ সময় বিকল থাকে এমআরআই মেশিন।
পাশাপাশি এনজিওগ্রাম মেশিন, সিটি স্ক্যান মেশিনও ঘন ঘন বিকল হওয়ার রেকর্ড আছে। রোগীর গুরুত্বপূর্ণ এসব মেশিন এক মাস সচল থাকলে পরের মাসে বিকল হয়ে যায়। এতে চড়ামূল্যে আশপাশের ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করতে বাধ্য হন গরিব রোগীরা। অপরদিকে চমেকে স্বল্পমূল্যে ডায়ালাইসিস সেবা বন্ধের শঙ্কায় পড়েছেন কিডনি রোগীর স্বজনরা। ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় চমেক হাসপাতাল।
তখন শুধু চট্টগ্রাম নয়, চট্টগ্রাম বিভাগে বড় পরিসরের একমাত্র হাসপাতাল ছিল এটি। এখনও চট্টগ্রামের বাইরে কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, ফেনী, নোয়াখালী কুমিল্লার রোগীদের বড় অংশ এখানেই চিকিৎসা নেন। এসব হাসপাতাল থেকে গুরুতর রোগীদের রেফার করা হয় চমেকে। প্রতিষ্ঠার পর ছয় দশক পার হতে চললেও বড় ধরনের কোনো উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়নি।
২০২২ সালে ১৩১৩ শয্যা থেকে ২২শ শয্যায় উন্নীত হয়। অথচ এই সময় রোগীর চাপ বেড়েছে শয্যার বিপরীতে অন্তত ১০ গুণ বেশি। বাড়তি রোগীর চাপ সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। তাই ফ্লোরেই বেড পেতে রোগী ভর্তি করা হচ্ছে। প্রতিদিন প্রতিটি ওয়ার্ডেই দেখা যায় নির্ধারিত শয্যার বাইরে রোগীরা ফ্লোরে শয্যা পেতেছেন। সেখানেই চিকিৎসা নেন অনেক গুরুতর রোগী।
গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ঘন ঘন বিকল : সাধারণ রোগীদের কাছে ব্যয়বহুল ডায়াগনোস্টিক পরীক্ষার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ এমআরআই সেবা। এমআরআই মেশিন দিয়ে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা করা হয়। অন্তত ১৫ থেকে ১৮ কোটি টাকা দামের এই মেশিনটি বছরের প্রায় সময়ই থাকে বিকল। স্বল্প অর্থে এই পরীক্ষার জন্য গরিব রোগীদের চাপ থাকে চমেকে। কিন্তু বেশিরভাগ সময় বিকল থাকায় বেশি অর্থ ব্যয় করে আশপাশের ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করতে হয় রোগীদের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৭ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রায় ১০ কোটি টাকার জাপানি হিটাচি ব্র্যান্ডের ১ দশমিক ৫ টেসলা এমআরআই মেশিন চমেক হাসপাতালকে প্রদান করে। ওই বছরের ২৪ অক্টোবর হৃদরোগ বিভাগের নিচ তলায় স্থাপন করা হয় এই মেশিন। ২০১৮ সালের ১৯ এপ্রিল থেকে শুরু হয় রোগী পরীক্ষা। ওয়ারেন্টির সময় ছিল তিন বছর। কিন্তু ওয়ারেন্টির সময় শেষ হওয়ার আগেই ২০২০ সালে একাধিকবার মেশিনটি বিকল হয়। প্রায় সাত মাস পর ২০২১ সালের মে মাসে মেরামত করে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান।
তবে মাস না যেতে আবারও অকেজো হয়ে যায়। এভাবে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত মেশিনটি থেকে খুব ভালো সেবা পায়নি রোগীরা। এক মাস সচল থাকলে এক মাস বিকল থাকে। প্রশ্ন উঠেছে কোটি টাকার এই মেশিন কেনাকাটায় নয়ছয় নিয়ে। বেসরকারি ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে বছরের পর বছর এমআরআই মেশিন সচল থাকে। চমেকে কেন ঘন ঘন বিকল হয় তা নিয়ে আছে বিস্তর অভিযোগ।
রোগী শয্যা মিলে না ওয়ার্ডে : চট্টগ্রাম অঞ্চলে সময়ের সঙ্গে বাড়ছে জনসংখ্যা। রোগীর চাপ সামনে রেখে চট্টগ্রাম নগরীতে গড়ে উঠেছে বহু বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিক। কিন্তু সাধারণ রোগীদের চিকিৎসায় চমেক এখনও ভরসার জায়গা। তাই বছরজুড়েই চমেকে রোগীর প্রচণ্ড চাপ থাকে। শয্যা সংকটে দীর্ঘদিন ধরে ফ্লোরেই শয্যা পেতে চিকিৎসা নেন শত শত রোগী। প্রতিষ্ঠার পর ছয় দশক পার হতে চলেছে। কিন্তু বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন হয়নি। রোগী বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। আর শয্যা বেড়েছে কচ্ছপগতিতে। ফলে সাধারণ রোগীদের সংকট প্রকট রূপ নিয়েছে।
২০২২ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত চমেকে ছিল ১৩১৩ শয্যা। ওই বছরের শেষের দিকে ২২শ শয্যায় উন্নীত হলে সংকট কিছুটা কমে। তবে প্রতিদিন ভর্তি রোগীর চাপের তুলনায় তা ছিল খুবই কম। হাসপাতালের বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ ও ওয়ার্ড সবখানেই থাকে ভিড়। রোগী ভর্তি কেবল বেড়েই চলেছে। এর মধ্যে জরুরি বিভাগে রোগী ভর্তি অনেক বেড়েছে। ২০২০ সালের তুলনায় ২০২৫-২৬ সালে জরুরি বিভাগে রোগী বেড়েছে ৮৫ থেকে ৯১ শতাংশ।
একই সময়ে বহির্বিভাগে রোগী বেড়েছে ৫০ থেকে ৫২ শতাংশ। বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়েছে অন্তত ৭০ শতাংশ। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় পৌনে চার হাজার রোগী বহির্বিভাগে, ১১শ রোগী জরুরি বিভাগে, প্রায় এক হাজার রোগী ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছেন। চিকিৎসাধীন রোগীর প্রতিদিন গড় মৃত্যু হয় ৩৮ জনের।
অস্ত্রোপচার যন্ত্রপাতির সংকট প্রকট : চমেকের সার্জারি বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে যন্ত্রপাতি সংকট আছে। বছরের পর বছর সংকট চললেও নতুন যন্ত্রপাতি কেনা হচ্ছে না। এতে রোগী দুর্ভোগ অনেক বেড়ে গেছে। বিশেষ করে কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগে যন্ত্রপাতি সংকট অনেক বেশি।
জানা গেছে, দুই কারণে চমেকে সার্জারি সেবা সীমিত হয়েছে। প্রথম সংকট চাহিদা অনুযায়ী জনবল নেই। দ্বিতীয় সংকট সার্জারির পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতির অভাব। কার্ডিয়াক বিভাগটি পূর্ণ সেবা দিতে ৩৫ জন চিকিৎসক, ৩০ জন নার্সসহ অন্তত একশ জনবল প্রয়োজন। বাড়তি জনবলের চাহিদা দেওয়া আছে সংশ্লিষ্ট দফতরে। কিন্তু এখনও মেলেনি জনবল ও যন্ত্রপাতি।
২০১৩ সালে চালু কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগে আছে ৪০ শয্যা। যন্ত্রপাতি ও জনবল সংকটে ২০২৪ সালে এক মাস কার্ডিয়াক সার্জারি বন্ধ ছিল। করোনার সময় ২০২০ সালে জনবল সংকটে দুই মাস বন্ধ ছিল অস্ত্রোপচার। বর্তমানে বহির্বিভাগ, আইসিইউ, অস্ত্রোপচার ও সাধারণ শয্যা চার ধরনের সেবা দেওয়া হয় কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগে।
এখানে ওপেন হার্ট সার্জারির জন্য দুটি অস্ত্রোপচার কক্ষ (ওটি) আছে। কিন্তু ব্যবহার হচ্ছে একটি। যন্ত্রপাতি বিকল থাকায় অন্য ওটি ব্যবহার করা যায় না। অস্ত্রোপচারের পর রোগীকে লাইফ সাপোর্টে রাখার গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র চারটি ভেন্টিলেটরের মধ্যে সচল আছে একটি। এভাবে চলছে কার্ডিায়াক সার্জারি বিভাগ।
বন্ধের পথে ডায়ালাইসিস সেবা : শত সংকটের মধ্যে প্রায় সময় দুঃসংবাদ আসে চমেকের কিডনি রোগীদের। ডায়ালাইসিস সেবা বন্ধের শঙ্কার মধ্যে চলে ডায়ালাইসিস সেন্টার। বর্তমানে কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা নেওয়া ২৭৬ জন রোগী পড়েছেন বিপাকে। কারণ আগামী ২৯ নভেম্বর হাসপাতালটির ডায়ালাইসিস সেন্টার পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ১০ বছরের চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এরপর ডয়ারাইসিস নিরবচ্ছিন্ন থাকা নিয়ে শঙ্কার মধ্যে আছেন রোগী ও স্বজনরা।
চমেকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ডায়ালাইসিস সেন্টার চালুর প্রক্রিয়া চলছে। নতুন ডায়ালাইসিস মেশিন কেনার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। তবে নতুন মেশিন স্থাপন ও প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করতে সময় লাগবে। মাঝখানের সময়ে রোগীরা হয়তো চমেকে সেবা পাবে না। এই সময় বাইরে থেকে ডায়ালাইসিস করাতে হতে পারে।
সূত্র জানায়, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) আওতায় ২০১৭ সালের ৪ মার্চ থেকে ডায়ালাইসিসের জন্য স্যান্ডর সেন্টারটি চালু হয়। এখানে মোট ৩১টি মেশিন রয়েছে। এর মধ্যে ২৪টি নেগেটিভ-প্রেশার ও ৭টি পজিটিভ-প্রেশার মেশিন। চিকিৎসক, টেকনিশিয়ান ও ইঞ্জিনিয়ারসহ মোট ৪৫ জন কর্মী এই সেন্টারে কর্মরত আছেন।
একজন রোগীকে প্রতিবার ডায়ালাইসিসের জন্য দিতে হয় ৬২১ টাকা। বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিকে ডায়ালাইসিস ফি অনেক বেশি। চমেকে নামমাত্র মূল্যে ডায়ালাইসিস সেবা পাওয়ায় রোগী চাপ বেশি থাকে। তবে সেন্ডর রোগী থেকে কম টাকা নিলেও সরকার থেকে বেশি অর্থ নেয়। স্যান্ডরের সঙ্গে চুক্তির শুরুতে প্রতি সেশনে ডায়ালাইসিসের ব্যয় ছিল ২ হাজার ১৯০ টাকা। প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে বাড়তে বাড়তে বর্তমানে তা ৩ হাজার ৩৯৭ টাকায় পৌঁছেছে। এর মধ্যে রোগীরা দিচ্ছেন ৬২১ টাকা, বাকি অর্থ সরকার ভর্তুকি হিসেবে স্যান্ডরকে পরিশোধ করছে।
ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চমেকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ডায়ারাইসিস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। ৩১টি ডায়ালাইসিস মেশিন কেনারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে স্যান্ডরের সঙ্গে বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষের পথে থাকায় ডায়ালাইসিস রোগীরা শঙ্কায় পড়েছেন। নতুনভাবে সেন্টার চালু হতেও আরও কয়েক মাস বাকি আছে। মধ্যবর্তী সময়ে রোগীরা বিকল্প পথে কীভাবে ডায়ালাইসিস সেবা পাবেন তা নিয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
চমেকে রোগী কল্যাণে নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেন সমাজকর্মী কায়ছার আলী চৌধুরী। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, রোগীর তুলনায় শয্যা নেই বললেই চলে। চমেক শুধু চট্টগ্রামের নয়, অন্তত সাত জেলার রোগীর ভরসা এই হাসপাতাল। বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের মতো প্রধান হাসপাতালে শয্যা সংকট মেনে নেওয়া যায় না।
যা বললেন বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক : চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শয্যা কম বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. সেখ ফজলে রাব্বি। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, চমেকে শয্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। তবে চমেকের ইউনিট-২ নামে আরেকটি হাসপাতাল, পতেঙ্গা এলাকায় ৫শ শয্যার হাসপাতালের পাশাপাশি হাটহাজারী উপজেলায় হাসপাতাল করার পরিকল্পনা আছে। এসব হাসপাতাল গড়ে তোলা হলে চমেকে শয্যা সংকট আর হবে না।
এমআরআই মেশিন, সিটি স্ক্যান ও এনজিওগ্রাম মেশিন ঘন ঘন বিকল হওয়া নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, চমেকে রোগীর চাপ অনেক বেশি। এসব মেশিনে পরীক্ষার চাপও বেশি থাকে। তাই হয়তো বারবার বিকল হয়। মেরামত বা নতুন মেশিন কিনতে কিছু প্রক্রিয়া থাকে। এসব শেষ করতে সময় ক্ষেপণের কারণে রোগীরা সাময়িক অসুবিধার মুখে পড়েন। এসব বিষয়ে চমেকের পরিচালক ভালো বলতে পারবেন।
এ বিষয়ে জানতে চমেকের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিনকে কয়েকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও