নিজের পা নিজেই কাটলেন ইউক্রেনীয় সেনা, ড্রোনে ঝুলে ফিরলেন মৃত্যুপুরী থেকে

সময়ের আলো ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ ড্রোন হামলায় প্রথমে বাঁ পা হারান ইউক্রেনীয় সেনা কোস্তিয়ান্তিন ভ্লাসেনকো। গুরুতর আহত ডান পা নিয়েও হামাগুড়ি দেওয়ার ক্ষমতা

2026-10-24T17:43:40+00:00
2026-10-24T17:54:09+00:00
 
  শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬,
৮ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
নিজের পা নিজেই কাটলেন ইউক্রেনীয় সেনা, ড্রোনে ঝুলে ফিরলেন মৃত্যুপুরী থেকে
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:৪৩ পিএম  আপডেট: ২৪.১০.২০২৬ ৫:৫৪ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ ড্রোন হামলায় প্রথমে বাঁ পা হারান ইউক্রেনীয় সেনা কোস্তিয়ান্তিন ভ্লাসেনকো। গুরুতর আহত ডান পা নিয়েও হামাগুড়ি দেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন তিনি। বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টায় নিজের ছুরি দিয়ে কেটে ফেলেন সেই পা-ও। এরপর ধ্বংসস্তূপের নিচে একটি পুরোনো বয়লারের তলায় আটকে থেকে মৃত্যুর অপেক্ষা করছিলেন ৪৯ বছর বয়সী এই সেনা। অবশেষে বিশাল এক ড্রোনে ঝুলে ১৫ কিলোমিটার দূরের নিরাপদ স্থানে পৌঁছে উদ্ধার হন তিনি।

গত ৪ অক্টোবর ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভ অঞ্চলের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। ইউক্রেনীয় সামরিক কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আকাশপথে ড্রোন ব্যবহার করে কোনো সেনাকে উদ্ধারের এটিই প্রথম জানা ঘটনা।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভ্লাসেনকো প্রায় আট মাস একটি ধ্বংসস্তূপে আটকে ছিলেন। ড্রোন-অধ্যুষিত যুদ্ধক্ষেত্রে টানা ৪৯১ দিন কাটানোর পর তার এই উদ্ধারকে যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের নতুন ব্যবহারের নজির হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নিজের পা নিজেই কাটতে বাধ্য হন

ভ্লাসেনকো ইউক্রেনের ৩০তম মেকানাইজড ব্রিগেডের সদস্য। গত বছরের মে মাসে তাকে খারকিভ অঞ্চলের সামনের সারিতে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি বাস্কি নামের এক সহযোদ্ধার সঙ্গে অবস্থান করছিলেন।

প্রথমে তারা মাটির নিচে ছোট একটি গর্তে থাকতেন। ড্রোনের মাধ্যমে তাদের কাছে নিয়মিত খাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পৌঁছে দেওয়া হতো। কিন্তু গত বছরের শরৎকালে তাদের বদলি করতে আসা দুই সেনা পথেই নিহত হন। তাদের মরদেহ উদ্ধারে যাওয়া আরও দুই সেনাও প্রাণ হারান।

ভ্লাসেনকো তখনই বুঝতে পারেন, সেখান থেকে বেরিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব। পরে তাদের আশ্রয়স্থলে পানি ঢুকে পড়লে দুজন একটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া স্কুল ভবনে আশ্রয় নেন।

সেখানেই ঘটে ভয়াবহ ঘটনা। শুকনা কাপড় ও খাবারের প্যাকেট আনতে বাইরে বের হলে একটি রুশ নজরদারি ড্রোন তাদের শনাক্ত করে। এরপর আরেকটি ড্রোন তাদের ওপর বোমা ফেলে। এতে বাস্কি নিহত হন। বিস্ফোরণে ভ্লাসেনকোর বাঁ পা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় এবং ডান পায়েও গুরুতর আঘাত লাগে।

তিনি কোনোমতে একটি ছোট গর্তে আশ্রয় নেন। সেটি ছিল স্কুলের পুরোনো ধাতব বয়লারের নিচে। সেখানে বসে থাকতে থাকতে তার বাঁ পায়ে পচন ধরে। ডান পায়ের অবস্থাও ক্রমেই খারাপ হতে থাকে। হাড় বেরিয়ে আসা ও পা ঝুলে থাকার কারণে শেষ পর্যন্ত নিজের ছুরি দিয়ে সেটি কেটে ফেলেন তিনি। রক্তপাত বন্ধ করতে পায়ে ব্যান্ডেজ বাঁধেন।

ভ্লাসেনকো বলেন, ‘আমাকে পা-টা কাটতেই হতো। কারণ, এটা আমার পেছন পেছন ঝুলছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘পা-টা এতটাই ঝুলছিল যে হাড় আরও বেশি করে বাইরে বেরিয়ে আসছিল। ফলে আমার আর কোনো পা অবশিষ্ট রইল না।’

উদ্ধার প্রায় অসম্ভব মনে হচ্ছিল

যুদ্ধক্ষেত্রের ওই এলাকাকে বলা হয় ‘কিল জোন’ বা মৃত্যুপুরী। সেখানে আকাশে প্রায়ই ড্রোন ঘুরতে থাকে। সামান্য নড়াচড়াও নজরে পড়ে যেতে পারে, আর যেকোনো মুহূর্তে হামলার শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এমন পরিস্থিতিতে আহত সেনাদের পিকআপ ট্রাক বা সাঁজোয়া যান দিয়ে উদ্ধার করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। ভ্লাসেনকোর কাছে পৌঁছানোর জন্য চালকবিহীন স্থলযান পাঠানো হলেও রুশ ড্রোন হামলায় দুটি যানই ধ্বংস হয়ে যায়।

তখন তার কমান্ডাররা বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করেন। পরে তারা গুরজুফ ডিফেন্স নামের একটি স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের তৈরি ভারী ড্রোন ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন। ছয় পাখার এই ড্রোনটি সর্বোচ্চ ২৫ কিলোমিটার দূরে ৯০ কেজি পর্যন্ত ওজন বহন করতে পারে।

পরিকল্পনা ছিল, ড্রোনের সঙ্গে নিরাপত্তা বেল্টে যুক্ত করে ভ্লাসেনকোকে ১৫ কিলোমিটার দূরের একটি নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হবে। তবে অভিযানটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, বড় ড্রোনগুলোকে প্রায়ই রাশিয়ার ছোট ড্রোনের হামলার মুখে পড়তে হয়।

ড্রোনে ঝুলে ১৫ কিলোমিটার যাত্রা

অক্টোবরের শুরুতে ভ্লাসেনকোর কাছে নিয়মিত সরবরাহের প্যাকেটের সঙ্গে একটি বেল্ট ও নির্দেশনাসংবলিত ভিডিও রাখা ফোন পাঠানো হয়। তখন তিনি বুঝতে পারেন, তাকে উদ্ধারের একটি পরিকল্পনা করা হয়েছে।

৪ অক্টোবর ছয় পাখার বিশাল ড্রোনটি তার কাছে পৌঁছায়। ভ্লাসেনকো ড্রোনের তার থেকে ঝুলে থাকা একটি ধাতব সংযোগের সঙ্গে নিজেকে আটকে নেন। এরপর ড্রোনটি তাকে মাটি থেকে প্রায় ৭০ মিটার ওপরে তুলে নেয়।

তিনটি ছোট ড্রোন মূল ড্রোনটিকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যায়। একই সময়ে ইউক্রেনীয় বাহিনীর একাধিক ড্রোন ও গোলন্দাজ ইউনিট রুশ ড্রোনের অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালায়, যাতে উদ্ধার অভিযানের পথ নিরাপদ রাখা যায়।

প্রায় ১৫ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস যাত্রা শেষে ড্রোনটি গন্তব্যে পৌঁছায়। নিরাপত্তার কারণে সামরিক বাহিনী উদ্ধারস্থলের সুনির্দিষ্ট অবস্থান প্রকাশ করেনি।

‘আমি নিজেকে কবর দিয়েই ফেলেছিলাম’

উদ্ধারের পর খারকিভের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়টার্সকে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান ভ্লাসেনকো। দীর্ঘদিন আটকে থাকার সময় তিনি বেঁচে ফেরার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, ‘আমি নিজেকে কবর দিয়েই ফেলেছিলাম।’

ব্যান্ডেজে মোড়ানো দুই পায়ের দিকে তাকিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমি জানতাম, বেঁচে ফেরার আর কোনো আশা নেই।’

এত ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পরও ড্রোনে ঝুলে নিরাপদ স্থানে ফেরার সময় তার ভয় ছিল অন্য কিছু নিয়ে। নিচে পড়ে যাওয়ার চেয়ে পানিতে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কাই তাকে বেশি ভাবাচ্ছিল।

ভ্লাসেনকো বলেন, ‘আমি নিচে পড়ে যাওয়ার ভয় পাচ্ছিলাম না। ধরুন, বনের মধ্যে কোথাও পড়ে গেলে আমার ভয় লাগত না। তবে আমি পানিতে পড়ে যাওয়ার ভয় পাচ্ছিলাম। কারণ, আমি সাঁতার জানি না।’

রয়টার্স জানিয়েছে, ভ্লাসেনকোর কষ্টের দিনগুলোর বিবরণ ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী নিশ্চিত করেছে এবং উদ্ধারকারী ড্রোনের ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিওও প্রকাশিত হয়েছে। তবে তার বর্ণনার প্রতিটি তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি সংবাদ সংস্থাটি।

ভ্লাসেনকোর উদ্ধার শুধু একজন আহত সেনার জীবন বাঁচানোর ঘটনা নয়; ড্রোনের ক্রমবর্ধমান ব্যবহারে কীভাবে যুদ্ধক্ষেত্রের উদ্ধার অভিযানও বদলে যাচ্ছে, তারও একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ।

সূত্র : রয়টার্স

সময়ের আলো/টিকে
  বিষয়:   নিজের পা নিজেই কাটলেন  ইউক্রেনীয় সেনা  ড্রোনে ঝুলে ফিরলেন  মৃত্যুপুরী থেকে  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: