ছবি : সংগৃহীতআওয়ামী লীগ সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে তার প্রত্যাবর্তন নিয়ে দলটির তৃণমূলের একাংশ এখন কেবল পুরোনো নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করে রাজনীতি করতে চায় না।
বরং দেশ ছেড়ে পালানো, দুর্নীতি, লুটপাট, অর্থ পাচার, রাজনৈতিক সহিংসতায় জড়িত ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগসহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে থাকা নেতাদের বাদ দেওয়ার প্রশ্নে দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীদের অনেকেই একমত। একই সঙ্গে জেলে থাকা নেতাদের মধ্যে যারা পরিচ্ছন্ন ও সৎ, ত্যাগী রাজনীতিবিদ তাদের নিয়ে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার আগেই গঠনমূলক দল পুনর্গঠনের দাবির পক্ষে দলটির তৃণমূলের একটি বড় অংশ।
এদিকে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিভক্তির পেছনে রয়েছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, দীর্ঘদিনের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির হিসাব-নিকাশ এবং ভবিষ্যতে দলটির গ্রহণযোগ্যতা ফিরিয়ে আনার প্রশ্ন। শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিয়ে আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই তৃণমূলের একাংশ দলটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, সাংগঠনিক কাঠামো ও রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
কারণ দলটির সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে অতীতের কর্তৃত্ববাদী শাসন, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, দুর্নীতির অভিযোগ এবং ২০২৪ সালের সহিংসতার বিষয়ে দলটির আত্মসমালোচনার ঘাটতির রয়েছে। অবশ্য শেখ হাসিনার ফেরা ও দল সাংগঠনিক শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে আপাতদৃষ্টিতে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে নেই কোনো কর্মসূচির নির্দেশনা। যদিও আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনের আলোচনা চললেও দলটির কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা একটি বড় বাধা।
২০২৫ সালের ১২ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দলটির নেতাকর্মীদের বিচারপ্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। এমনকি ২০২৬ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা একটি রিট খারিজ করে দেন আদালত। দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা মনে করেন, দলের নেতৃত্বে এমন ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনতে হবে, যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থ পাচার, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা রাজনৈতিক সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগ নেই। যারা দীর্ঘদিন মাঠপর্যায়ে সংগঠনের জন্য কাজ করেছেন, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও এলাকায় রয়েছেন এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে দলীয় আদর্শকে গুরুত্ব দিয়েছেন, তাদের মূল্যায়নের দাবি তুলছেন তারা।
তারা এও মনে করেন, দলটির ভেতরে পরিশুদ্ধ আওয়ামী লীগ বা গঠনমূলক আওয়ামী লীগ গঠনের আলোচনা এখন তুঙ্গে। বিশেষ করে ডিসেম্বর যত এগিয়ে আসছে, এই আলোচনা ততটাই সামনে আসছে। অবশ্য দলটির ভেতরে সংস্কারের ধারণা নিয়ে আলোচনা থাকলেও শীর্ষ নেতৃত্বের অবস্থানে পরিবর্তনের দৃশ্যমান লক্ষণ এখনও নেই।
একই সঙ্গে দলের মধ্যে সংস্কার এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বিতর্কিত নেতাদের বাদ দেওয়ার দাবি কীভাবে বাস্তব সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে রূপ নেবে। শেখ হাসিনার নেতৃত্ব বজায় রেখেই সংস্কার সম্ভব, নাকি নেতৃত্বের কাঠামোতেও পরিবর্তন আনতে হবে, সেটি নিয়েও ঐকমত্য তৈরি করা। সে ক্ষেত্রে পালিয়ে যাওয়া শতাধিক নেতা দল থেকে ছিটকে পড়তে পারেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায় থেকে দল গঠনমূলক সংস্কার চাইলে শুধু নেতৃত্বের পরিবর্তন নয়। বরং আইনি প্রক্রিয়া, জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ফেরার পথ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
গত ১৯ অক্টোবর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা আবারও ডিসেম্বরে দেশে ফেরার কথা জানিয়েছেন। তিসি দেশে ফেরার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের কথাও বলেছেন। তবে প্রত্যাবর্তনের নির্দিষ্ট দিনক্ষণ তিনি ঘোষণা করেননি। কিন্তু তিনি দেশে ফেরা মানেই দলটির অভ্যন্তরীণ সংকটের সমাধান হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং প্রত্যাবর্তনের আগে দল পুনর্গঠনের প্রশ্নটি আরও জোরালো হতে পারে।
ফলে একদিকে তৃণমূলের একটি অংশ নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক সংস্কারের দাবি তুলছে, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রকাশ্য অবস্থান এখনও শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করেই। এই ব্যবধান দূর না হলে পুনর্গঠনের প্রশ্নে দলটির ভেতরে মতবিরোধ আরও বাড়তে পারে বলেও মনে করেন তারা।
এদিকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বক্তব্যে এখন পর্যন্ত সংস্কারপন্থিদের প্রস্তাবের সঙ্গে স্পষ্ট মতপার্থক্য দেখা গেছে। অবশ্য আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজ কল্যাণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন পরিশুদ্ধ আওয়ামী লীগের ধারণা প্রত্যাখ্যান করে দলটির মূল পরিচয় ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি আস্থার কথা জানান। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত দল পুনর্গঠনের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তখন ভেবে দেখা হবে কার কী ভূমিকা। আওয়ামী লীগ একটি গণতান্ত্রিক দল। ফলে এখানে যে কেউ তার মতামত দিতে পারেন। তবে সবার মতামতের ওপর ভিত্তি করেই আগামী দিনে আওয়ামী লীগ পুনর্গঠন হোক বা পুরোনো নেতৃত্ব চলুক— সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
দেশের বাইরে অবস্থান করা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, আওয়ামী লীগ একটি গণতান্ত্রিক দল। সবার কথা বলার অধিকার আছে। তবে আওয়ামী লীগ এখন আগের চেয়েও বেশি ঐক্যবদ্ধ। এই মুহূর্তে দল কোনো কর্মসূচি না দিলেও সময় মতো একের পর এক কর্মসূচি দেবে।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন বলেন, বর্তমান সময়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে কোনো দ্বিধা-বিভক্ত নেই। দলের তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সরকারে থাকাকালীন সময়ের চেয়ে আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ। শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন হবে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ফলে দলে আলোচনা সমালোচনা থাকবেই, এটা গণতান্ত্রিক অধিকার।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা দেশে থেকে লড়াই সংগ্রাম করছি। হামলা মামলা মাথায় নিয়ে এখনও বেঁচে আছি। আর যারা দুর্নীতি, লুটপাট, অর্থ পাচার করে বিদেশে পালিয়ে থেকে আরাম-আয়েশে দিন কাটাচ্ছেন তাদেরকে দিয়ে আর আওয়ামী লীগ হবে না। গঠনমূলক আওয়ামী লীগ এখন সময়ের দাবি। পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির রাজনীতিবিদদের সামনে এনে দলকে জবাবদিহিমূলক ও জনসম্পৃক্ত করতে হবে।
আওয়ামী যুবলীগের এক সাংগঠনিক সম্পাদক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আওয়ামী লীগ কি পুরোনো নেতৃত্ব ও কাঠামো ধরে রাখবে, নাকি আত্মসমালোচনা ও জবাবদিহির মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক পথ তৈরি করবে, সেটি এখন অনেকের কাছেই বড় প্রশ্ন। দলের তৃণমূলের গঠনমূলক রাজনীতির দাবি বাস্তবে রূপ দিতে হলে শুধু বিতর্কিত নেতাদের বাদ দেওয়ার ঘোষণা নয়, বরং স্বচ্ছ নেতৃত্ব নির্বাচন, দুর্নীতির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, অতীতের ভুল স্বীকার এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ এম শাহান বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর জনরোষের পাশাপাশি প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নিয়ে বিরূপ অবস্থান দলটির টিকে থাকার পথ কঠিন হয়েছে। শুধু নেতৃত্ব বদল কিংবা বিতর্কিত ব্যক্তিদের বাদ দেওয়াই যথেষ্ট নয়। দলটির অতীত ভূমিকা নিয়ে আত্মসমালোচনা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের বিচার, দুর্নীতির জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চায় ফেরার প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক আলতাফ পারভেজ বলেন, আওয়ামী লীগের সংকটের অন্যতম কারণ অতীতের কর্তৃত্ববাদী শাসন, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, দুর্নীতির অভিযোগ। পাশাপাশি ২০২৪ সালের সহিংসতা বা গণহত্যার বিষয়ে দলটি এখন পর্যন্ত আত্মসমালোচনা করেনি। দলের ভেতর থেকেই ভুল স্বীকার ও সংস্কারের দাবি না এলে বাইরে থেকে পরিশুদ্ধ আওয়ামী লীগ গঠনের আলোচনা বাস্তব রূপ পাওয়া কঠিন। এ ছাড়া দলটির তৃণমূল পর্যায় থেকে গঠনমূলক আওয়ামী লীগ চাইলেও নতুন কাঠামো গড়ে তোলা নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকা অবস্থায় আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে