ছবি : সংগৃহীতমধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন স্থানে থাকা মার্কিন কর্মকর্তা ও কূটনীতিকদের হত্যার পরিকল্পনা করছে ইরান— এমন দাবি করা হয়েছে এক মার্কিন গোয়েন্দা নথিতে। দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমস ও দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন গোয়েন্দাপ্রধান জে ক্লেটন গত ২৩ অক্টোবর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কো রুবিওকে পাঠানো এক নথিতে এ বিষয়ে সতর্ক করেন। স্মারকটির তথ্য প্রথম প্রকাশ করে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এক্সিওস। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে ইরানের প্রাণঘাতী হামলার পরিকল্পনাগুলো ‘উচ্চ পর্যায়ে’ পৌঁছেছে।
জে ক্লেটন স্মারকে বলেন, এ বিষয়ে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্য ঝুঁকিতে থাকা অনেক কর্মকর্তার নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই তাদের সতর্ক করতে তিনি তথ্যগুলোর গোপনীয়তা কমানোর সিদ্ধান্ত নেন। দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সৌদি আরবের রিয়াদে মার্কিন দূতাবাস ও কয়েকটি কনস্যুলেট থেকে অতিরিক্ত কর্মী ও তাদের পরিবারকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া জর্ডান, লেবানন, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মার্কিন কূটনৈতিক মিশনগুলোতেও কর্মী কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র দফতর।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার মধ্যে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরাও সৌদি আরবের তেল অবকাঠামো ও বেসামরিক বিমানবন্দরে হামলা বাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, হুথিদের ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রিয়াদের দিকে ধেয়ে এলে শনিবার ভোরে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সেটি ধ্বংস করে। অঞ্চলটিতে যুদ্ধ বাড়ার আশঙ্কার মধ্যে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৭ ডলারে পৌঁছেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্লোরিডার এক সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে আবারও ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র মতো সামরিক অভিযান চালানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার অচলাবস্থা আরও এক বছর পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হতে পারে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র আবারও সামরিক অভিযান চালাতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার ফ্লোরিডায় এক সমাবেশে তিনি বলেন, আমরা হয়তো আবারও ছোটখাটো এপিক ফিউরি অভিযান চালাতে পারি। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের আট মাস পূর্ণ হতে চলেছে। জ্বালানির দাম বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনেও এর প্রভাব পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প এ মন্তব্য করলেন।
এর আগে শুক্রবার হোয়াইট হাউসের দক্ষিণ লনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে দ্রুত যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারে। তবে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করা হবে, নাকি সংঘাতকে ধীরে ধীরে স্তিমিত হতে দেওয়া হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা যা চাই, সবই পাচ্ছি।
রয়টার্স জানিয়েছে, যুদ্ধের লক্ষ্য ও সময়সীমা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন ট্রাম্প। চলতি মাসের শুরুতে তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা চালাবে না। ওই নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হবে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা এবং লেবাননে ইসরাইলি হামলায় হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
ইরানের উদ্দেশে ট্রাম্প আরও বলেন, তারা যদি বুদ্ধিমত্তা দেখায়, তবে তাদের উচিত এখনই আলোচনায় বসা। তবে আমি সন্দেহ করি তারা তা করবে না, কারণ সম্ভবত তারা ততটা বুদ্ধিমান নয়। বক্তব্যে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফিরে আসা মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প কিউবার কাছাকাছি উপকূলের প্রসঙ্গ টানেন এবং জানান, সেক্রেটারি অব স্টেট মার্কো রুবিওকে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শেষ করার জন্য পাঠানো হতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এমন হুমকির জবাবে ইরানও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল যদি নতুন করে কোনো হামলা চালায়, তবে সাবমেরিন বা সমুদ্রের তলদেশের ইন্টারনেট ক্যাবলগুলোসহ সামরিক ঘাঁটিগুলো তেহরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই ইরানি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়, যদি ইরানের ওপর হামলা চালানো হয়, তবে আর কোনো রেড লাইন থাকবে না— সমুদ্রের তলদেশের ক্যাবল থেকে শুরু করে গোপন সামরিক ঘাঁটি পর্যন্ত সব ধ্বংস করা হবে। মার্কিন প্রশাসনকে উদ্দেশ করে তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা যেন ‘আগুন নিয়ে না খেলে’, কারণ ইরানের কাছে সাবমেরিন ক্যাবলগুলো ধ্বংস করার পূর্ণ সক্ষমতা রয়েছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে