ছবি : সংগৃহীতজীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অর্থায়ন বৃদ্ধি ও আবাসনসংকটের প্রতিবাদে নতুন করে উত্তাল ফ্রান্স। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শনিবার দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করেছে সরকার। একই সঙ্গে ইতালি, স্পেন, অস্ট্রিয়া, পর্তুগাল, আলবেনিয়া ও আয়ারল্যান্ডেও বিক্ষোভের প্রস্তুতি চলছে। গত সপ্তাহে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের পর নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের শনিবারের লাইভ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
ফ্রান্সে স্কুলশিক্ষার্থী, শ্রমিক সংগঠন, ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের সমর্থকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ টানা চতুর্থ সপ্তাহের মতো বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থায় বাড়তি অর্থায়ন, সাশ্রয়ী আবাসন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে সরকারি সহায়তা বৃদ্ধি।
বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্সের লিওঁ শহরে পুলিশ প্রায় ১৫০ জন বিক্ষোভকারীকে ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করেছে। শহরটির কেন্দ্রে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও বিক্ষোভকারীরা কিছুক্ষণের জন্য একটি রাস্তা অবরোধ করার চেষ্টা করলে এ ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া দেশটির বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ শুরু হয়েছে।
এর আগে গত সপ্তাহান্তে বিক্ষোভের একপর্যায়ে ফ্রান্সে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন শহরে দোকানপাট লুট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর এবং সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। তাই পরিস্থিতি সামাল দিতে এবার বিক্ষোভের স্থান ও মিছিলের পথ নির্ধারণে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে কর্তৃপক্ষ। ইতিমধ্যে প্যারিসে ২৪টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে। লুভর, ওর্সে ও পিকাসো জাদুঘরসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পর্যটনকেন্দ্রও বন্ধ রয়েছে। সম্ভাব্য লুটপাট ঠেকাতে অনেক দোকানপাটের জানালা ও প্রবেশপথ কাঠের পাটাতন দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।
ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান ও জিম্মি উদ্ধারে প্রশিক্ষিত বিশেষ ইউনিটও থাকবে। বিক্ষোভের নামে সহিংসতা বরদাশত করা হবে না বলেও সতর্ক করেছেন তিনি। এ ছাড়া প্যারিসে শ্রমিক সংগঠনগুলোর মিছিলের পথও পরিবর্তন করা হয়েছে। আগে বাস্তিল থেকে নাসিওঁ চত্বর পর্যন্ত মিছিলের অনুমতি দেওয়া হলেও পরে তা শহরের বাইরের দিকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, গত সপ্তাহে যেসব এলাকায় দোকানপাটে হামলা হয়েছিল, সেসব এলাকায় আবারও বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। তবে মার্সেই ও লিমোজ শহরে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত আদালত বাতিল করেছেন। ফ্রান্সের পশ্চিমাঞ্চলে শুক্রবার গাড়ি থেকে গুলি চালানোর ঘটনায় একজন নিহত ও পাঁচজন আহত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। নিহত ব্যক্তির বয়স ২৬ বছর। আহতদের মধ্যে ১২ বছরের এক শিশুও রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, হামলার শিকার ব্যক্তিদের গায়ের রং কিংবা তাদের ধর্মীয় পরিচয় সম্পর্কে হামলাকারীর ধারণার কারণে তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। তিনি ঘটনাটিকে বর্ণবাদী সহিংসতা হিসেবে নিন্দা করেছেন।
এ ঘটনার প্রতিবাদে শনিবার মধ্য ফ্রান্সের ওর্লেয়ঁ শহরে বর্ণবাদ, ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে। সেখানে কট্টর ডানপন্থি মেরিন লে পেনের ন্যাশনাল র্যালি দলের সম্মেলন চলছে। একই সঙ্গে লে পেনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারাভিযানও শুরু হচ্ছে। বামপন্থি রাজনৈতিক নেতা ও শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা বর্ণবাদবিরোধী বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন। সম্মেলন ঘিরে শহরে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। শনিবার প্রায় পাঁচ হাজার দলীয় সদস্য ও কর্মকর্তার সমাগমের কথা রয়েছে। রোববার লে পেনের প্রথম নির্বাচনি সমাবেশে ১০ হাজার মানুষ অংশ নিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর বিপরীতে বামপন্থিদের বিক্ষোভে ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার মানুষের সমাগমের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
ইতালিতেও বিক্ষোভের প্রস্তুতি : ফ্রান্সের পাশাপাশি ইতালিতেও নতুন করে বিক্ষোভের প্রস্তুতি চলছে। মিলান, তুরিন, রোম, বোলোনিয়া ও নেপলসসহ বিভিন্ন শহরে জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষায় অর্থায়ন, আবাসন ও ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থনের মতো ইস্যুতে কর্মসূচি পালনের কথা রয়েছে। গত সপ্তাহে মিলানে বিক্ষোভের একপর্যায়ে দোকানপাটে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। নতুন করে সহিংসতার আশঙ্কায় ইতালির পুলিশ মিলানসহ বিভিন্ন শহরে ১৫০টি বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছে। যাদের বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়েছে, তাদের মধ্যে ৫১ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক রয়েছে। বিক্ষোভের সময় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পরিকল্পনার সন্দেহে এ অভিযান চালানো হয়।
মিলানে অতিরিক্ত ৫০০ সেনা মোতায়েন করেছে সরকার। রেলস্টেশনগুলোতে পরিচয়পত্র পরীক্ষা জোরদার করা হয়েছে এবং নজরদারিতে ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। রোমেও টহল বাড়ানো হয়েছে এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় চলাচল সীমিত করা হয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চলমান এই বিক্ষোভের কেন্দ্রীয় দাবিগুলো অর্থনৈতিক চাপ, শিক্ষা ও আবাসনসংকট ঘিরে আবর্তিত হলেও গত সপ্তাহের সহিংসতা সরকারগুলোর সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ফ্রান্স ও ইতালিতে শনিবারের কর্মসূচি পরিস্থিতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে