বাংলাদেশ পুলিশ। সংগৃহীত ছবি বছরের পর বছর পদোন্নতি আটকে থাকা, একই ব্যাচের সহকর্মীদের এগিয়ে যেতে দেখা এবং দীর্ঘদিনের বঞ্চনা থেকে তৈরি হওয়া হতাশা— এসব কারণে পুলিশের কর্মকর্তাদের মধ্যে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা কাটাতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি বছরের নভেম্বরের মধ্যে পরিদর্শক থেকে ডিআইজি পদমর্যাদা পর্যন্ত প্রায় ৪৯২ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে অনেক কর্মকর্তার কর্মজীবনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ফিরে আসতে পারে তাদের হারানো মনোবল।
পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পদোন্নতির প্রক্রিয়া নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে চূড়ান্ত হতে পারে। এরপর জারি করা হতে পারে আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের সময়ে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ে এটিই প্রথম বড় ধরনের পদোন্নতি কার্যক্রম।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের পদোন্নতিজট নিরসন, ঊর্ধ্বতন পদে শূন্যতা পূরণ এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের মনোবল ফিরিয়ে আনাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
আগের সরকারের আমলে বছরের পর বছর পদোন্নতি আটকে থাকায় অনেক কর্মকর্তার পেশাগত জীবনে হতাশা জমেছে। একই বিসিএস ব্যাচের কেউ কেউ পদোন্নতি পেয়ে উচ্চতর পদে পৌঁছালেও অন্যদের একই অবস্থানে থাকতে হয়েছে। এমনকি কোনো কোনো কর্মকর্তা নিজেদের ব্যাচের জুনিয়র সহকর্মীদেরও পরবর্তী পদে দায়িত্ব পালন করতে দেখেছেন।
সম্প্রতি কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর পর পুলিশের উচ্চপর্যায়ে শূন্য পদ আরও বেড়েছে। এতে দীর্ঘদিনের পদোন্নতিজট নিরসনের বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।
শূন্য পদের বিপরীতে তিনজনের নাম প্রস্তাব
পদোন্নতি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত পুলিশ সদর দপ্তরের দুজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে জানিয়েছেন, প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে অন্তত তিনজন কর্মকর্তার নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। বিভিন্ন পদে যোগ্য কর্মকর্তাদের বিবেচনায় নিয়ে তালিকা তৈরি ও যাচাই-বাছাই চলছে।
তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটি (ডিপিসি) প্রায় ১৬০ জন পরিদর্শক ও ট্রাফিক পরিদর্শককে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে উন্নীত করার অনুমোদন দিয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি।
এ ছাড়া ৩৬তম, ৩৭তম ও ৩৮তম বিসিএস ব্যাচের প্রায় ১৫৫ জন সহকারী পুলিশ সুপারকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে, ২৮তম, ২৯তম ও ৩০তম বিসিএস ব্যাচের আরও ৯৫ জন কর্মকর্তা পুলিশ সুপার (এসপি) পদে পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন।
২৮তম ও ২৯তম বিসিএস ব্যাচের যেসব কর্মকর্তা আগে অতিরিক্ত পদ সৃষ্টি করে এসপি হয়েছিলেন, তাঁদের পদোন্নতি এবার নিয়মিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
একইভাবে, ২২তম ও ২৪তম বিসিএস ব্যাচের ৬০ জনের বেশি এসপি আগে অতিরিক্ত পদ সৃষ্টি করে অতিরিক্ত ডিআইজি হয়েছিলেন। তাঁদের পদোন্নতিও নিয়মিত করার কথা রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২১তম, ২২তম ও ২৪তম বিসিএস ব্যাচের প্রায় ২০ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ডিআইজি পদে পদোন্নতি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ১৭তম ও ১৮তম বিসিএস ব্যাচের দুজন কর্মকর্তা অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি পেতে পারেন।
পদোন্নতির তালিকায় থাকছেন না ২০তম বিসিএসের কর্মকর্তারা
পদোন্নতির এই উদ্যোগে সব ব্যাচের কর্মকর্তাদের জন্য সমান সুযোগ থাকছে না। এবার ২০তম বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তাদের ডিআইজি পদে পদোন্নতির জন্য বিবেচনা করা হবে না। এ ব্যাচের প্রায় ৩৩ জন কর্মকর্তা এখনো পদোন্নতি পাননি।
পদোন্নতি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই ব্যাচের কর্মকর্তারা পাঁচ দফায় পদোন্নতি পেয়েছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও তাদের আরও এক দফা পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল।
রাজনৈতিক বিবেচনায় বঞ্চিত কর্মকর্তারা কি অগ্রাধিকার পাবেন?
পদোন্নতি কার্যক্রমে আলোচনার অন্যতম বিষয় হলো, আগের সরকারের আমলে রাজনৈতিক পরিচয় বা সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে দাবি করা কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পদোন্নতি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একজন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিএনপিপন্থি হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কারণে যেসব কর্মকর্তার ভালো চাকরির রেকর্ড ও পেশাগত দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি বা উপযুক্ত পদায়ন হয়নি, তারা এবার অগ্রাধিকার পেতে পারেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, একই ব্যাচের অনেক কর্মকর্তা এবং তাদের চেয়ে জুনিয়ররাও আগেই পদোন্নতি পেয়েছেন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থানের কথা জানিয়েছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। দুজন অতিরিক্ত ডিআইজি বলেছেন, পদোন্নতি না পাওয়া সব কর্মকর্তা রাজনৈতিক বৈষম্যের শিকার হয়েছেন, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। কারও কারও মেধা, চাকরির রেকর্ড কিংবা অসদাচরণের অভিযোগও পদোন্নতির পথে বাধা হয়ে থাকতে পারে।
আরেক অতিরিক্ত ডিআইজি জানান, দুই বছর আগেই তার পদোন্নতি পাওয়ার কথা ছিল। একই বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়া অন্যান্য ক্যাডারের অনেক কর্মকর্তা ইতিমধ্যে পদোন্নতি পেলেও পুলিশের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। তাঁর মতে, এ ধরনের বৈষম্য কর্মকর্তাদের মনোবল মারাত্মকভাবে দুর্বল করেছে।
যেভাবে চূড়ান্ত হবে পদোন্নতি
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পদোন্নতির ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা, পেশাগত দক্ষতা, মেধা, চাকরির রেকর্ড, বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন এবং গোয়েন্দা যাচাই প্রতিবেদন বিবেচনা করা হয়।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটি (ডিপিসি) এএসপি থেকে এসপি পদে পদোন্নতির বিষয়টি পর্যালোচনা করে।
অন্যদিকে, অতিরিক্ত ডিআইজি থেকে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতির দায়িত্ব পালন করে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি)।
শূন্য পদ পূরণের পাশাপাশি মনোবল ফেরানোর প্রত্যাশা
প্রশাসনিক রদবদলের অংশ হিসেবে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর পর পুলিশের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে বেশ কিছু পদ শূন্য হয়েছে।
২০১৮ সালের সরকারি চাকরি আইনের ৪৫ ধারায় জনস্বার্থে ২৫ বছর চাকরি পূর্ণ করা কোনো সরকারি কর্মচারীকে নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ না করেও অবসরে পাঠানোর সুযোগ রয়েছে।
২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচন, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা কিংবা জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় ভূমিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগের ভিত্তিতেও বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানো হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে নভেম্বরের মধ্যে পদোন্নতির উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের শত শত কর্মকর্তার কর্মজীবনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের পদোন্নতিজট কমানো, শূন্য পদ পূরণ এবং কর্মকর্তাদের মনোবল ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রেও এ উদ্যোগ ভূমিকা রাখতে পারে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ