ছবি : সংগৃহীত পুরান ঢাকার ধোলাইখাল পুকুরের চিত্র বদলে দিতে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া হয়েছিল নগর পুনরুজ্জীবন প্রকল্প। সংস্কারের পর ময়লা ও দুর্গন্ধে ভরা জলাশয়টি ঘিরে তৈরি হয়েছে হাঁটার পথ, বসার জায়গা ও সবুজ পরিসর। ঘনবসতিপূর্ণ পুরান ঢাকায় নতুন এই উন্মুক্ত স্থান পেয়ে স্বস্তি ফিরেছিল স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে। তবে প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই জলাশয়ের পানিতে আবারও দেখা যাচ্ছে আবর্জনা ও সবুজ আস্তরণ। এতে দূষণের ঝুঁকি এবং জলাধারটির রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, জলাশয়ের পানিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য। কোথাও পানির ওপর জমেছে সবুজ স্তর। স্থানীয়দের আশঙ্কা, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে সংস্কার করা জলাধারটি আবারও দূষণের কবলে পড়বে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বিশেষ নগর পুনরুজ্জীবন প্রকল্পের আওতায় সূত্রাপুর ও ধোলাইখাল-সংলগ্ন প্রায় ৫ দশমিক ৩০৯ একর এলাকায় জলাধারটির উন্নয়ন করা হয়েছে। প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল জলাশয়ের পরিবেশ উন্নয়ন, নাগরিকদের হাঁটাচলা ও অবসর কাটানোর সুযোগ তৈরি এবং পুরান ঢাকায় উন্মুক্ত পরিসর বাড়ানো।
নারিন্দার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, আগে জায়গাটি ছিল মশার প্রজননস্থল ও ময়লা পানির ডোবা। দুর্গন্ধের কারণে আশপাশে থাকা কঠিন ছিল। সংস্কারের পর জায়গাটির চেহারা বদলেছে। এখন মানুষ এখানে হাঁটতে ও বসতে আসেন। তার ভাষায়, জায়গাটি এখন ‘মিনি হাতিরঝিল’। তবে সৌন্দর্য ধরে রাখতে আরও উন্নয়ন ও নিয়মিত পরিচর্যা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় ২০২৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৪ সালের ৩১ মে’র মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে সব কাজ শেষ হয়নি। অসম্পূর্ণ কাজ রেখেই এলাকাটি জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ফলে প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ও পরবর্তী ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
জলাধারটির নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সম্প্রতি ৯ বছর বয়সি এক শিশু বন্ধুদের সঙ্গে ধোলাইখালে মাছ ধরতে নেমে পানিতে পড়ে মারা যায়। ওই ঘটনার পর দুই সপ্তাহ জলাশয়টি বন্ধ রাখা হয়েছিল। এ ঘটনা জলাশয়ের চারপাশে সুরক্ষাবেষ্টনী, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড ও নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। পাশাপাশি সন্ধ্যার পর পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে নিরাপত্তাকর্মী এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
প্রকল্পের পরিকল্পনায় প্রায় দুই লাখ বর্গফুটের জলাধার ঘিরে ১ হাজার ৯৬৮ ফুট দীর্ঘ হাঁটার পথ এবং ২ হাজার ১৫৫ ফুটের সাইকেল ট্র্যাক নির্মাণের কথা রয়েছে। সবুজায়ন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য উন্মুক্ত মঞ্চ ও শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান তৈরির পরিকল্পনাও ছিল।
ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের পর জলাধারটির রক্ষণাবেক্ষণে বিশেষ তদারকি সেল গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। জলাশয়ে বর্জ্য ও পয়োবর্জ্য মিশ্রিত পানি প্রবেশ ঠেকাতে নিয়মিত অভিযান চালানোর কথাও বলা হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের বাস্তবায়ন ও কার্যকারিতা সম্পর্কে স্পষ্ট অগ্রগতি জানা প্রয়োজন।
ঐতিহাসিক ধোলাইখাল একসময় ঢাকার নৌ যোগাযোগ, পণ্য পরিবহন ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। নগরায়ণ, দখল ও ভরাটের কারণে খালটির বড় অংশ সংকুচিত হয়েছে বা হারিয়ে গেছে। এ অবস্থায় অবশিষ্ট জলাধার সংরক্ষণ পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি ঢাকার ঐতিহাসিক জলপথের স্মৃতি ধরে রাখার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
ধোলাইখালের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ সফল করতে তাই শুধু অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়। জলাশয়ের দূষণ নিয়ন্ত্রণ, অসমাপ্ত কাজের সমাপ্তি, নিরাপত্তা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করাও জরুরি। অন্যথায় বিপুল অর্থ ব্যয়ে তৈরি এই উন্মুক্ত পরিসর আবারও ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে