পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কুয়াকাটায় হাফেজ শিকদারের জানাজা মানুষের শেষ বিদায়ের প্রস্তুতিতে নিঃস্বার্থভাবে পাশে দাঁড়ানোই ছিল তার জীবনের অন্যতম ব্রত। কারও মৃত্যুর খবর পেলেই ছুটে যেতেন কবর খনন করতে। বিনা পারিশ্রমিকে নিজের হাতে খুঁড়েছেন ৩৯৬টি কবর। অথচ নিজের মৃত্যুর বিষয়টিও যেন আগে থেকেই মেনে নিয়েছিলেন তিনি। বাড়ির সামনে নিজের কবরের জায়গা প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি কিনে রেখেছিলেন কাফনের কাপড়ও। সেই হাফেজ শিকদার (৭০) আর নেই।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকালে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কুয়াকাটায় জানাজা শেষে নিজ বাড়ির সামনে তাকে দাফন করা হয়েছে। রোববার (২৫ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
হাফেজ শিকদার কুয়াকাটা পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ছিলেন। পেশায় ব্যবসায়ী হলেও মানুষের শেষ বিদায়ের প্রস্তুতিতে সহযোগিতা করেই তিনি স্থানীয়দের কাছে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন।
সোমবার সকাল ১০টার দিকে কুয়াকাটা খানকা সাহালিয়া কমপ্লেক্স মাঠে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্থানীয় সাংবাদিক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার হাজারো মানুষ অংশ নেন। তার মৃত্যুতে পরিবার, স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
হাফেজ শিকদারের মেজো ছেলে মো. হারিস শিকদার জানান, এলাকায় কিংবা আশপাশের কোথাও কারও মৃত্যুর খবর পেলেই তার বাবা কবর খননের জন্য ছুটে যেতেন। বিনা পারিশ্রমিকে মানুষের এই সেবা করতেন তিনি। তার ইচ্ছা ছিল, আরও চারটি কবর খুঁড়ে সংখ্যাটি ৪০০-তে নিয়ে যাবেন। কিন্তু সেই ইচ্ছা পূরণের আগেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন তিনি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে হারিস শিকদার বলেন, ‘এলাকা ও আশপাশে কারও মৃত্যুর খবর শুনলেই বাবা কবর খুঁড়তে ছুটে যেতেন। তার ইচ্ছা ছিল, আরও চারটি কবর খননের মাধ্যমে সংখ্যাটি ৪০০ পূর্ণ করবেন। কিন্তু তার আগেই তিনি চলে গেলেন। সবাই আমার বাবার জন্য দোয়া করবেন।’
হাফেজ শিকদারের ছোট ছেলে এসএম আলমাস জানান, নিজের মৃত্যুর আগেই বাড়ির সামনে কবরের জায়গা প্রস্তুত করে রেখেছিলেন তার বাবা। এমনকি নিজের কাফনের কাপড়ও দোকান থেকে কিনে রেখে গিয়েছিলেন।
আলমাস বলেন, ‘বাবা গতকালও আমাদের মাঝে ছিলেন, কিন্তু আজ আর নেই। তিনি আগে থেকেই বাড়ির সামনে নিজের জন্য কবরের জায়গা প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। এমনকি নিজের কাফনের কাপড়ও দোকানে কিনে রেখে গিয়েছিলেন। বাবা আমাদের ছয় ভাই-বোনকে খুব ভালোবাসতেন। এলাকার সবাই তাকে খুব পছন্দ করতেন।’
স্থানীয় বাসিন্দা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, হাফেজ শিকদার ছিলেন অত্যন্ত ভালো মানুষ। এলাকার সবাই তাকে শ্রদ্ধা করতেন। কারও মৃত্যুর খবর পেলেই তিনি শেষ বিদায়ের প্রস্তুতিতে সহযোগিতা করতে ছুটে যেতেন।
তিনি বলেন, ‘আজ তার জানাজায় হাজার হাজার মানুষ ছুটে এসেছেন শুধু তাকে ভালোবেসে। আল্লাহ তাআলা যেন তাকে জান্নাত দান করেন।’
কুয়াকাটা পৌর যুবদলের সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম মিরন বলেন, হাফেজ শিকদার ছিলেন সদালাপী, ধর্মভীরু ও পরোপকারী মানুষ। মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানো এবং বিনা পারিশ্রমিকে কবর খননের মতো মানবিক কাজের জন্য তিনি এলাকাবাসীর কাছে শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে উঠেছিলেন।
তার মৃত্যুতে কুয়াকাটার মানুষ গভীরভাবে শোকাহত বলেও জানান তিনি।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হাফেজ শিকদার দীর্ঘদিন ধরে কিডনির সমস্যাসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাতে নিজ বাড়িতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
সময়ের আলো/এসকে