ছবি : সময়ের আলোশীতের আগমনে চলনবিলে বাড়তে শুরু করেছে দেশি ও পরিযায়ী পাখির আনাগোনা। বিলের জলাশয়, জলাভূমি ও গাছপালায় আশ্রয় নিচ্ছে নানা প্রজাতির পাখি। তবে পাখির এই বিচরণে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে শিকারিদের পাতা ফাঁদ। এমন পরিস্থিতিতে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার উলিপুর গ্রামে পাখি রক্ষায় এগিয়ে এসেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। নিজেরাই পাহারা দিয়ে পাখির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন তারা। তবে স্থায়ীভাবে পাখির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাহারাদার নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন গ্রামবাসী।
চলনবিল অঞ্চলে শামুকখোল, ডাহুক, ত্রিশূলবক, বালিহাঁস, রাতচরা, নীলশির ও লালশিরসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি দেখা যায়। শীতকালে বিশেষ করে বিলের পানি ও জলাশয়গুলোতে জলচর পাখির বিচরণ বেড়ে যায়। জলাভূমিতে পর্যাপ্ত শামুক থাকায় শামুকখোলের জন্যও তৈরি হয়েছে অনুকূল পরিবেশ।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উলিপুর গ্রামের প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০টি গাছে পাখির বাসা রয়েছে। প্রতিদিন সকালে খাবারের সন্ধানে পাখিগুলো আশপাশের জলাশয় ও ফসলের মাঠে ছড়িয়ে পড়ে। দিন শেষে আবার ফিরে আসে নিজেদের বাসায়।
পাখির বিষ্ঠায় বাড়িঘর নোংরা হওয়া এবং রান্নাবান্নাসহ দৈনন্দিন কাজে কিছুটা অসুবিধা হলেও পাখিগুলোকে তাড়িয়ে দেন না গ্রামবাসী। বরং শিকারিদের হাত থেকে রক্ষা করতে নিজেরাই নজরদারি করেন।
তাড়াশ পৌরসভার উলিপুর গ্রামের ইউপি সদস্য আব্দুস সালাম বলেন, প্রথম দিকে কয়েকটি পাখি এসে গাছে বাসা বাঁধে। তখন থেকেই তারা নিজেরা পাহারা দেওয়া শুরু করেন। পাখি শিকার করতে আসা কয়েকজনকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
আব্দুস সালাম বলেন, পাখির বিষ্ঠায় কিছুটা অসুবিধা হলেও গ্রামের মানুষ পাখিগুলোকে ভালোবাসেন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থায়ী পাহারাদার নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।
ফাঁদ পেতে চলছে পাখি শিকার
গ্রামবাসীর উদ্যোগে পাখি রক্ষার চেষ্টা চললেও চলনবিলের বিভিন্ন এলাকায় এখনো পাখি শিকারের ঘটনা ঘটছে। সরেজমিনে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার পাটগাড়িপাড়া মৌজার একটি ধানক্ষেতে ফাঁদ পেতে পাখি শিকার করতে দেখা যায়।
সেখানে লতাপাতা দিয়ে ঝোপের মতো কাঠামো তৈরি করে তার ওপর জালের ফাঁদ বসানো হয়েছিল। ফাঁদের কাছে একটি পাখির পা সুতা দিয়ে বেঁধে বাঁশের লম্বা কঞ্চির সাহায্যে গাছের মগডালে ঝুলিয়ে রাখা হয়। বাঁধা পাখিটি ডানা ঝাপটে ডাকাডাকি শুরু করলে আশপাশের অন্য পাখিরা সেখানে এসে বসার চেষ্টা করে। এ সময় সেগুলো জালে আটকা পড়ে।
সেখানে পাখি শিকার করতে থাকা মোতালেব শেখ ফাঁদ পেতে পাখি ধরার কথা স্বীকার করেন। তিনি জানান, শখের বশে গত তিন-চার বছর ধরে এলাকার বিভিন্ন স্থানে ঘুরে পাখি শিকার করছেন। এ সময়ে তাকে কেউ বাধা দেননি।
চলনবিল জীব ও বৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, সিরাজগঞ্জ-নাটোর সীমান্তবর্তী এলাকায় নিয়মিত পাখি শিকারের ঘটনা ঘটে। তাড়াশের বারুহাসসহ চলনবিলের দুর্গম এলাকাগুলোতে শিকারিরা ‘কেল্লা ফাঁদ’ ব্যবহার করেন। এসব এলাকায় যাতায়াত কঠিন হওয়ায় প্রশাসনের পক্ষে সব জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব হয় না।
পরিযায়ী পাখির সংখ্যা কমছে
রাজশাহী বিভাগীয় বন্য প্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের পরিদর্শক জাহাঙ্গীর কবির বলেন, দেশে পাখির মোট সংখ্যা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোনো হিসাব নেই। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৭০০ প্রজাতির পাখি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০০ প্রজাতির পাখি অন্য দেশ থেকে আসে।
তিনি বলেন, চলনবিলে দেখা যাওয়া পাখির বড় অংশই দেশি প্রজাতির। তবে সাইবেরিয়া, নেপাল ও ভারতসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পরিযায়ী পাখির সংখ্যা আগের তুলনায় কমেছে। পাখির নিরাপদ আবাসস্থল থাকলে তারা সেখানে আশ্রয় নেয়। পাখি শিকার বন্ধে সচেতনতামূলক প্রচারও চালানো হয়।
উলিপুরকে অভয়ারণ্য ঘোষণার উদ্যোগ
তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান বলেন, শীতকালে চলনবিলে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আগমন ঘটে। স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে উলিপুর গ্রাম পাখির নিরাপদ আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উলিপুর গ্রামকে পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি পাখির নিরাপত্তায় পাহারাদার নিয়োগের বিষয়টিও গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হবে। পাখি শিকার বন্ধে প্রশাসন সতর্ক রয়েছে বলেও জানান তিনি।
সময়ের আলো/এসএকে