ছবি : সংগৃহীতমুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হোসেন্দী ইউনিয়নের চর বলাকীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও মাদক কারবারের অভিযোগ উঠেছে। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ও নিয়মিত পুলিশি টহলের সীমাবদ্ধতার সুযোগে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র সেখানে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাঁদের আশঙ্কা, আধিপত্য বিস্তার ও স্বার্থের দ্বন্দ্বে অতীতের মতো আবারও বড় ধরনের সহিংসতা ঘটতে পারে।
চর বলাকীতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ২০১৬ সালের ১৫ জুলাই আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে ইউপি সদস্য গোলাপ সরকারসহ পাঁচজন নিহত হন। ওই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন অন্তত ১২ জন। ‘ফাইভ মার্ডার’ নামে পরিচিত সেই রক্তক্ষয়ী ঘটনার স্মৃতি এখনো স্থানীয়দের মনে রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, সেই জনপদে আবারও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিস্তার ঘটছে।
স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, চর বলাকীতে অবৈধ বালু উত্তোলন ও মাদক কারবারের সঙ্গে নাসির উদ্দিন, সুমন প্রধান ও ফজলা নামের তিন ব্যক্তি জড়িত। তাঁদের মধ্যে নাসির বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। আর সুমন অতীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর নিজেকে বিএনপির কর্মী হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন বলে স্থানীয়দের দাবি। তাঁদের অভিযোগ, এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে প্রভাবশালী মহলের সমর্থন রয়েছে। স্বার্থের প্রশ্নে বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের লোকজনও একসঙ্গে কাজ করছেন বলে দাবি তাঁদের।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, ওই চক্রের তিনটি ড্রেজার রয়েছে। কাঠের ট্রলারে স্থাপন করা ছোট আকৃতির এসব ড্রেজার দূর থেকে শ্যালো মেশিনের মতো দেখালেও এগুলো দিয়ে বালু উত্তোলন করা হয়। উত্তোলিত বালু বিক্রির অর্থ চক্রের সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
গত রোববার (২৫ অক্টোবর) বিকেলে চর বলাকী গ্রামে সরেজমিন গিয়ে একটি ড্রেজার চালু অবস্থায় দেখা যায়। স্থানীয়দের ভাষ্য, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু তুলে পাইপের মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দা আবু কালামের বাড়িতে ফেলা হচ্ছিল।
স্থানীয় বাসিন্দা রনি বলেন, ‘গত কয়েক দিন ধরে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু তুলে আবু কালামের বাড়িতে ফেলা হচ্ছে। সুমনের ড্রেজার দিয়েই এই বালু কাটা হচ্ছে। দিনের পর দিন এই অপকর্ম চললেও ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চর বলাকীর এক গৃহবধূ বলেন, আধিপত্য বিস্তার ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব থেকেই অতীতে এখানে ‘ফাইভ মার্ডার’-এর মতো ঘটনা ঘটেছে। তাঁর ভাষ্য, এখানে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে স্বার্থই বড়। কারা বালু উত্তোলন ও মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত, তা স্থানীয়দের অনেকেই জানেন। তবে চক্রটির ভীতিকর পরিস্থিতির কারণে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না।
অবৈধ বালু উত্তোলনের পাশাপাশি চর বলাকীতে মাদকের বিস্তার নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত উপস্থিতি কম থাকে। এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে মাদক কারবারিরা।
স্থানীয় বাসিন্দা সাকিব আল হাসান বলেন, ‘চর বলাকীতে বর্তমানে মাদকের অবস্থা ভয়াবহ। প্রশাসনকে বারবার অবগত করা হলেও আমরা কাঙ্ক্ষিত কোনো ফলাফল পাইনি। মাদক ব্যবসায়ী ও সেবীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আকুল আবেদন জানাই।’
মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মাসুদ ফারুক বলেন, তাঁদের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান রতন যেকোনো অপকর্ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার। বিএনপির নাম ব্যবহার করে কাউকে অপকর্ম করতে দেওয়া হবে না। মাদক ও সন্ত্রাস নির্মূলে গজারিয়াজুড়ে আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
গজারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নকীব আকরাম হোসেন বলেন, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়টি নৌ-পুলিশ দেখভাল করবে। চর বলাকী বিচ্ছিন্ন এলাকা হওয়ায় সেখানে নিয়মিত পুলিশি টহল পরিচালনা করা কঠিন। তবে মাদকের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
অন্যদিকে, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে গজারিয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) যায়েদ হোসাইন বলেন, সরকারি অনুমতি ছাড়া নদী থেকে বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। নদীর ওই অংশে বিচ্ছিন্নভাবে বালু উত্তোলনের খবর তাঁরা পেয়েছেন। জড়িত চক্রকে শনাক্ত ও ধরতে চেষ্টা চলছে। শিগগিরই অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সময়ের আলো/এসএকে