ছবি : সংগৃহীত শেরপুরের নালিতাবাড়ীর পানিহাটা সীমান্ত। বিকালের আলো তখন কিছুটা ম্লান। গারো পাহাড়ের ঘন জঙ্গল থেকে খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে এলো একদল বন্য হাতি। ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২২টি। কেউ কাদাপানিতে শরীর ভেজাচ্ছে, কেউ শুঁড় দিয়ে পানি তুলছে। মা হাতির পাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে শাবকরা। দূর থেকে দৃশ্যটি শান্ত মনে হলেও এই হাতিগুলোর জীবন এখন অনিশ্চয়তায় ঘেরা। খবর বিবিসির।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের এই বনাঞ্চলে আটকে পড়েছে প্রায় ১৩০ থেকে ১৩৫টি বন্য হাতি। একসময় যাদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল দুই দেশের বনভূমিতে, এখন তাদের অনেকেরই ভারতে ফেরার পথ বন্ধ। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ও বন্ধ গেট তাদের চলাচলে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ অংশে বনভূমি সংকুচিত হওয়া, খাবারের অভাব ও কৃষিজমি বাড়তে থাকায় হাতিরা বাধ্য হচ্ছে লোকালয়ে ঢুকতে। এতে বিপদের মুখে পড়ছে হাতি ও মানুষ— উভয়ই।
বন্ধ হয়ে গেছে চলাচলের পথ : জামালপুরের বকশিগঞ্জ থেকে শেরপুর হয়ে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত পর্যন্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে হাতির চলাচলের ঐতিহ্যগত পথ রয়েছে। একসময় এসব পথ ধরে বাংলাদেশ ও ভারতের মেঘালয় রাজ্যের বনাঞ্চলে যাতায়াত করত হাতির দল। সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে চলাচলের জন্য ছিল ৪৪টি গেট এবং নদী বা ছড়ার ১১টি পথ।
এসব পথ ব্যবহার করে হাতিরা এক দেশ থেকে অন্য দেশে যেত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মেঘালয় অংশে বেশ কিছু জায়গায় কাঁটাতারের বেড়া ও গেট নির্মাণ করায় তাদের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। হাতির পুরোনো বিচরণক্ষেত্রের কিছু জায়গায় কাজুবাদামের চাষও হচ্ছে। ফলে অনেক জায়গায় খাবার সংগ্রহের সুযোগ কমেছে। বাংলাদেশে ঢোকার পর হাতিরা আর আগের মতো ভারতে ফিরতে পারছে না।
প্রকৃতি সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক দশক আগে এ অঞ্চলে ৫০টির মতো হাতির বিচরণ ছিল। বর্তমানে বিভিন্ন হিসাবে সেই সংখ্যা বেড়ে ১৩০ থেকে ১৩৫টিতে দাঁড়িয়েছে। হাতির সংখ্যা বাড়লেও তাদের নিরাপদ আবাসস্থল ও খাবারের জোগান সেই অনুপাতে বাড়েনি।
খাবারের খোঁজে লোকালয়ে : একটি এশীয় হাতির প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ কেজি খাবার প্রয়োজন হয়। পানির
চাহিদাও বিপুল। এই খাবার ও পানি সংগ্রহ করতে হাতিকে প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। কিন্তু গারো পাহাড়ের বনাঞ্চলে খাবার ও পানির সংকট দেখা দিলে হাতিরা জঙ্গল ছেড়ে ফসলের মাঠ ও লোকালয়ে চলে আসে। শুষ্ক মৌসুমে এ প্রবণতা আরও বাড়ে।
পানিহাটা সীমান্তের বনেও হাতির দলকে আকাশমণি গাছের বাকল খেতে দেখা গেছে। বনের ভেতরে ছোট ছোট নালায় পানির উপস্থিতি থাকলেও খাবারের সংকট স্পষ্ট। বনভূমির ভেতরে ও আশপাশে ধানসহ নানা ফসলের আবাদ এবং মানুষের বসতি বাড়ায় হাতির বিচরণের জায়গাও কমে আসছে।
বন্য হাতির আগমন স্থানীয় কৃষকদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। রাতের আঁধারে হাতির দল ধান ক্ষেত ও অন্যান্য ফসলের জমিতে ঢুকে ফসল নষ্ট করে। কখনো বাড়িঘরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কয়েক মাসের শ্রম ও বিনিয়োগ এক রাতেই নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় কৃষকরা জমির চারপাশে তারের বেড়া দিচ্ছেন। কোথাও কোথাও এসব বেড়ায় অবৈধভাবে বৈদ্যুতিক সংযোগ দেওয়া হচ্ছে।
শেরপুরের এক কৃষক জানান, হাতির হাত থেকে ফসল বাঁচাতে জমির চারপাশে বৈদ্যুতিক তার বসিয়েছেন। হাতি এলে বিদ্যুতের শক খেয়ে সরে যায় বলে তার ধারণা। অন্য কৃষকরাও হাতি তাড়াতে মশাল জ্বালান, পটকা ফোটান কিংবা চিৎকার করে ভয় দেখান। কখনো হাতির দলকে তাড়াতে স্থানীয় লোকজন ধারালো অস্ত্র নিয়েও জড়ো হন।
দুই পক্ষেরই বাড়ছে বিপদ : হাতির চলাচলের পথ বন্ধ হওয়া এবং বনভূমি সংকুচিত হওয়ার প্রভাব পড়ছে মানুষ ও প্রাণী— দুই পক্ষের ওপরই। লোকালয়ে ঢুকে হাতি ফসল নষ্ট করছে, বাড়িঘর ভাঙছে; আবার মানুষের তৈরি বৈদ্যুতিক ফাঁদ ও হামলায় হাতির মৃত্যু হচ্ছে। কখনো হাতির আক্রমণে প্রাণ হারাচ্ছেন মানুষও।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত এক যুগে শেরপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে অন্তত ৩৫টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। এসব মৃত্যুর পেছনে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, গুলিবিদ্ধ হওয়া ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতের মতো কারণ রয়েছে।
হাতি ও মানুষের সংঘাত কমাতে বন বিভাগের পক্ষ থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম গঠন করা হয়েছে। হাতির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং প্রাণীটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষকে সচেতন করার উদ্যোগও চলছে। তবে শুধু হাতি তাড়ানো কিংবা ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করছেন গবেষকরা।
তাদের মতে, হাতির আবাসস্থল রক্ষা, বনের ভেতরে খাবার ও পানির জোগান বাড়ানো, নিরাপদ চলাচলের পথ নিশ্চিত করা এবং বৈদ্যুতিক ফাঁদ বন্ধ করা জরুরি। একই সঙ্গে ফসল রক্ষার নিরাপদ ব্যবস্থা ও হাতির আগমন সম্পর্কে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
ভারতের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ : সীমান্তে আটকে পড়া হাতির সংকট এখন দুই দেশের আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ভারতের কাছে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ চাইছে, হাতির চলাচলের ঐতিহ্যগত পথগুলো আবারও উন্মুক্ত করা হোক, যাতে প্রাণীগুলো দুই দেশের বনাঞ্চলে স্বাভাবিকভাবে বিচরণ করতে পারে।
বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিষয়টি ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। তার মতে, ভারতের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া না হলে এই সংকটের সমাধান কঠিন হবে। তিনি দুই দেশের মধ্যে বাঘের চলাচলের উদাহরণ টেনে হাতির ক্ষেত্রেও সীমান্তের পথ উন্মুক্ত রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
গারো পাহাড়ের হাতিরা শুধু বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী নয়; তাদের বিচরণ ও জীবনযাত্রা দুই দেশের বনাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত। তাই সীমান্তের পথ বন্ধ রেখে কিংবা শুধু বাংলাদেশের ভেতরে তাদের আটকে রেখে এ সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন দুই দেশের সমন্বিত উদ্যোগে হাতির চলাচলের পথ পুনরায় চালু করা এবং বাংলাদেশ অংশের বনভূমিকে তাদের জন্য উপযোগী করে তোলা।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি