ছবি : সংগৃহীতপ্রধানমন্ত্রীর রংপুর সফর উপলক্ষে তড়িঘড়ি করে সংস্কার করা হয়েছিল সড়ক। কিন্তু সেই সংস্কার টিকেছে মাত্র কয়েক দিন। উঠে গেছে পিচের প্রলেপ, ভেঙে গুঁড়া হয়েছে নতুন বসানো সিমেন্টের ব্লক। কোথাও তৈরি হয়েছে গর্ত, কোথাও ক্ষতবিক্ষত সড়কের উপরিভাগ। এখন একই স্থানে আবারও চলছে মেরামতকাজ। এতে সড়ক সংস্কারের মান ও স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি অর্থের অপচয় নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও যানবাহনের চালকেরা।
রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কের পাগলাপীর থেকে মেডিকেল মোড় পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে প্রায় দুই কিলোমিটার অংশে এমন চিত্র দেখা গেছে।
গত ২০ অক্টোবর শারদীয় দুর্গোৎসব পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রংপুর সফরকে কেন্দ্র করে এর আগের চার দিন ধরে মহাসড়কের শতাধিক ভাঙাচোরা অংশ মেরামত করা হয়। এ সময় পুরোনো ইটের পাটাতন তুলে নতুন সিমেন্টের ব্লক বসানো হয় এবং তার ওপর দেওয়া হয় পিচের প্রলেপ।
দ্রুতগতিতে করা এসব সংস্কারকাজ কত দিন টিকবে, তা নিয়ে তখনই সংশয় প্রকাশ করেছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা, চালক ও পথচারীরা। কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের আশঙ্কা সত্যি হয়।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) সরেজমিনে দেখা যায়, সংস্কার করা কয়েকটি স্থানে নতুন বসানো ব্লক ভেঙে গেছে। কোথাও পিচের প্রলেপ উঠে গিয়ে তৈরি হয়েছে আগের মতো গর্ত। ক্ষতিগ্রস্ত এসব স্থানে আবারও মেরামতকাজ চলছে। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে একই সড়কের একই অংশে বারবার সংস্কার করতে হচ্ছে। এতে কাজের মান ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সিও বাজার এলাকার বাসিন্দা নাজমুল হক বলেন, ‘এখানে সড়ক সংস্কার করা হয় আবার নষ্ট হওয়ার জন্য। যাতে সারা বছর মেরামতের কাজ চলে, কর্মকর্তা আর ঠিকাদারদের কামাই ভালো থাকে। তা না হলে মাসে ১০ বার গর্ত বন্ধ করা হয় কেন? দুই দিন না যেতেই আবার গর্ত হয়।’
হাজীপাড়া মোড়ের ব্যবসায়ী রাকিব ইসলাম বলেন, ‘সাত দিন আগেই সড়কের এই অংশের ইটের পাটাতন তুলে সিমেন্টের ব্লক বসানো হয়েছিল। নিম্নমানের কাজের কারণে সেগুলো ভেঙে গুঁড়া হয়ে গেছে। এখন আবার ঠিক করছে। স্থায়ীভাবে টেকসই সংস্কার কেন করা হয় না, সেটাই বুঝি না।’
একই সড়কে নিয়মিত চলাচলকারী বাসচালক আব্দুর রশিদ বলেন, ‘দুই নম্বরি কাজ করলে তো বারবার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাগলাপীর থেকে মেডিকেল মোড় পর্যন্ত সড়কের অবস্থা খুবই খারাপ। এই অংশে দুর্ঘটনাও ঘটে। ভালোভাবে সড়কের কাজ করা দরকার।’
আগেও উঠেছিল কাজের মান নিয়ে অভিযোগ
এই মহাসড়কের সংস্কারকাজের মান নিয়ে আগেও অভিযোগ উঠেছে। সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রংপুর-সৈয়দপুর মহাসড়কের ১৭ কিলোমিটার সংস্কারের কাজ ২৬ কোটি ৮৯ লাখ ৫৯ হাজার ৯৪৬ টাকায় পায় রাজশাহীর ডন এন্টারপ্রাইজ। ওই বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার অংশে ডিবিএসটি পদ্ধতিতে সংস্কারকাজ করা হয়। তবে কাজের মান নিয়ে তখনই প্রশ্ন ওঠে।
অভিযোগ রয়েছে, টহলরত সেনাবাহিনীর একটি দল সড়কের প্রতি বর্গমিটারে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে পাঁচ কেজি কম পাথর ব্যবহারের বিষয়টি শনাক্ত করে। এতে প্রায় ৩৬৫ টন পাথর কম ব্যবহার করা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে।
সংস্কারকাজ শেষ হওয়ার আগেই সড়কের কার্পেটিং উঠে বিভিন্ন স্থানে গর্ত তৈরি হয়। পরে এসব গর্ত ইট দিয়ে ভরাট করায় যান চলাচলে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
ভিত্তি দুর্বল, স্বীকার সওজের
বারবার সংস্কার করেও সড়ক টেকসই করা যাচ্ছে না বলে স্বীকার করেছেন রংপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. কামাল পাশা।
তিনি বলেন, ‘কাজ করছি, উঠে যাচ্ছে। বারবার সংস্কার করছি, আবারও উঠে যাচ্ছে। ইট ভেঙে যাচ্ছে, ইট তুলে ব্লক দিচ্ছি, সেটিও ভেঙে যাচ্ছে। এত লোডেড গাড়ি চলার কারণে এমন হচ্ছে। কী করব ভাই আর? আসলে এ সড়কের নিচের ফাউন্ডেশন খারাপ, তাই কোনোটাই টিকছে না। এটা নতুন করে নির্মাণ ছাড়া কোনো বুদ্ধি নেই। নিচের ফাউন্ডেশন খারাপ হলে ওপরে যতই তেল দিই না কেন, কাজ হবে না।’
সওজের এই বক্তব্যে সড়কের নিচের ভিত্তির দুর্বলতার বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে সমস্যাটি জানা থাকার পরও কেন বারবার সাময়িক সংস্কার করা হচ্ছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। একই স্থানে অল্প সময়ের ব্যবধানে পুনরায় মেরামত করতে হওয়ায় সংস্কার পরিকল্পনা, কাজের মান যাচাই ও তদারকির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
তাদের দাবি, বারবার সাময়িক মেরামতের পরিবর্তে সড়কের প্রকৃত অবস্থা যাচাই করে টেকসই সংস্কার কিংবা পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় সরকারি অর্থ ব্যয় করেও সড়কের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলবে না।
সময়ের আলো/এসএকে