১৯৮১ সালের পর সর্বোচ্চ ভোট, ইসরায়েলের নির্বাচনে টানটান লড়াই

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ১৯৮১ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশটির ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে বিবেচিত এই ভোটে

2026-10-27T17:07:59+00:00
2026-10-27T17:07:59+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬,
১১ কার্তিক ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
১৯৮১ সালের পর সর্বোচ্চ ভোট, ইসরায়েলের নির্বাচনে টানটান লড়াই
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:০৭ পিএম 
গাদি আইজেনকোট (বামে) বর্তমান প্রেসিডেন্ট বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু (ডানে)। ছবি : সংগৃহীত
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ১৯৮১ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশটির ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে বিবেচিত এই ভোটে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

শুক্রবার প্রকাশিত জনমত জরিপে দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেতানিয়াহু ও আইজেনকট প্রায় সমান অবস্থানে রয়েছেন। তবে কোনো পক্ষই পার্লামেন্টের ৬১টি আসন পেয়ে এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠন করতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে না। ফলে সরকার গঠন নিয়ে কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস ধরে দর-কষাকষি চলতে পারে।

নির্বাচনী প্রচারে গণতন্ত্র ও নিরাপত্তা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। নেতানিয়াহুর শাসনামল নিয়ে এক ধরনের গণভোট হিসেবেও দেখা হচ্ছে এই নির্বাচনকে। ইসরায়েলের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের নির্বাচনী ব্যবস্থায় সরকার গঠনে সব সময়ই জোটের প্রয়োজন হয়। ফলে নির্বাচনের পর অপ্রত্যাশিত জোট গঠনের সম্ভাবনাও থাকে। তবে এবারের লড়াই বিশেষভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং বিভিন্ন দলের মধ্যে জোট গঠনের ক্ষেত্রে বেশ কিছু শর্ত ও সীমারেখা রয়েছে।

নতুন গঠিত ইয়াশার পার্টির নেতা আইজেনকট তথাকথিত ‘পরিবর্তনপন্থী জোটের’ প্রধান মুখ। আদর্শগত পার্থক্য থাকলেও নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর লক্ষ্য নিয়ে এই জোটে রয়েছে বিভিন্ন দল। তাদের মধ্যে আছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট, আভিগদর লিবারম্যান ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা ইয়াইর গোলান। বেনেট ও লিবারম্যান নিরাপত্তার প্রশ্নে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত, আর গোলান বামঘেঁষা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

১৯৯৬ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়া নেতানিয়াহুর আবার ক্ষমতায় ফেরা নির্ভর করছে তার বর্তমান জোটের ওপর। ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে ডানপন্থী হিসেবে পরিচিত এই জোটে রয়েছে কট্টর ডানপন্থী ও অতি-ধর্মীয় ইহুদি দলগুলো।

নির্বাচনে আরব ভোটারদের প্রতিনিধিত্বকারী দুটি জোটও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব; তাদের অনেকে নিজেদের ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেন। তাত্ত্বিকভাবে এসব দল সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে প্রধান ইহুদি দলগুলোর মধ্যে একটি ছাড়া বাকিরা আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট করার সম্ভাবনা নাকচ করেছে।

নির্বাচনী প্রচারে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি ছিল ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে চালানো হামলা ঠেকাতে নিরাপত্তাব্যবস্থার নজিরবিহীন ব্যর্থতা। ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়। বিরোধী জোট এ ঘটনার তদন্তে একটি স্বাধীন কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছে। নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে এমন কমিশনের বিরোধিতা করে আসছেন। তার দাবি, কমিশন তার বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট হবে।

নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাও চলছে, যদিও তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বিচারব্যবস্থায় বিতর্কিত সংস্কার পরিকল্পনা নিয়েও তার সরকারের সমালোচনা রয়েছে। ৭ অক্টোবরের হামলার আগে এসব পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ইসরায়েলে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল।

সমালোচনা সত্ত্বেও নেতানিয়াহু নিজেকে আবারও ‘নিরাপত্তার নিশ্চয়তা’ হিসেবে তুলে ধরেছেন। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের যুদ্ধগুলোতে কৌশলগত সাফল্যের দাবি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে তিনি প্রচারের অংশ করেছেন।

নির্বাচনের আগে ইরানকে ঘিরে নতুন সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে নেতানিয়াহু উদ্যোগী হয়েছিলেন বলে ইসরায়েলের চ্যানেল ১২ ও সিএনএনের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে ইসরায়েলের সেনাপ্রধান আইয়াল জামির এর বিরোধিতা করেন বলে চ্যানেল ১২ জানায়। অন্যদিকে, সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে ইরানে নতুন হামলা চালাতে রাজি করানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ট্রাম্প অনুমোদন দেননি। নেতানিয়াহু উভয় প্রতিবেদনই অস্বীকার করেছেন।

প্রচারের শেষ দিকে তেল আবিবে পারমাণবিক বোমা আঘাত হানার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি একটি ছবি প্রকাশ করেও আলোচনায় আসেন নেতানিয়াহু। ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করলে কেবল তিনিই ইসরায়েলকে রক্ষা করতে পারবেন বলে দাবি করেন তিনি। আইজেনকট এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় নেতানিয়াহুকে ‘উন্মত্ত’ বলে মন্তব্য করেন।

আরেকটি বড় ইস্যু ছিল সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ। পূর্ণকালীন ধর্মীয় শিক্ষায় নিয়োজিত অতি-ধর্মীয় ইহুদি পুরুষদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায় কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়েছে নেতানিয়াহুর সরকার। সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলোতে হাজারো মানুষকে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে বিভাজন আরও বেড়েছে।


গাজা নিয়ে আইজেনকটের অবস্থানও নেতানিয়াহুর অবস্থানের কাছাকাছি। তিনি ১৮ মাসের মধ্যে গাজায় হামাসের শাসনের অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এ লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন শান্তি পরিকল্পনার মাধ্যমে অর্জন করতে চান তিনি; তা সম্ভব না হলে সামরিক পদক্ষেপের পথও খোলা রেখেছেন।

গত বছর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও গাজায় প্রায় প্রতিদিন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। দেশটির দাবি, এসব হামলার লক্ষ্য হামাসের সদস্যরা। গাজার হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় ৭৪ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘ এ পরিসংখ্যানকে নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচনা করে।

গাজায় ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনা বেড়েছে এবং বিশ্বের বিভিন্ন মিত্র দেশের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের বিষয়েও আইজেনকটের সমর্থন রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনে এসব বসতি অবৈধ। তবে চরমপন্থী ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা দমনে কঠোর হওয়ার কথা বলেছেন তিনি। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফিলিস্তিনিদের জন্য ‘স্বায়ত্তশাসন বা রাষ্ট্রের কাছাকাছি কোনো ব্যবস্থা’ গড়ে তোলার কথাও বলেছেন আইজেনকট, তবে তার প্রস্তাবে ইসরায়েলের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে।

ইসরায়েলের মূলধারার রাজনীতিতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ‘দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান’ প্রায় হারিয়ে গেছে। আইজেনকটের নেতৃত্বে সংখ্যালঘু সরকার গঠনে আরব দলগুলো পরোক্ষভাবে সমর্থন দিতে পারে বলে আলোচনা থাকলেও লিবারম্যান এমন ব্যবস্থায় অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করেছেন।

এমন নানা শর্ত ও বিরোধের কারণে সরকার গঠনের হিসাব জটিল হয়ে উঠেছে। ভোটের ফল প্রকাশের পর দলগুলো কী ধরনের সমঝোতা, ছাড় বা অবস্থান পরিবর্তনে রাজি হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

এবার ভোট দিতে বিদেশ থেকে প্রায় ৭০ হাজার ইসরায়েলি দেশে ফিরেছেন বলে জানা গেছে। কয়েক লাখ ভোটারও প্রথমবারের মতো ভোট দিচ্ছেন। মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাত ১০টায় ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর দেশটির সম্প্রচারমাধ্যমগুলো বুথফেরত জরিপ প্রকাশ করবে। এসব জরিপ থেকে ভোটের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেলেও চূড়ান্ত ফলের সঙ্গে পার্থক্য থাকতে পারে।


দেশজুড়ে সমর্থকেরা ভোটের ফল দেখার জন্য জড়ো হবেন। জেরুজালেমে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি এবং তেল আবিবে আইজেনকটের ইয়াশার পার্টির সমর্থকেরা ফল পর্যবেক্ষণ করবেন। কয়েক লাখ সেনা ও রিজার্ভ সেনাও ভোট দেবেন। তবে তাদের অনেকের ভোট গণনা শুরু হবে বুধবার। এসব ভোট ডানপন্থী দলগুলোর পক্ষে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নির্বাচনকে নেতানিয়াহু ও আইজেনকটের লড়াই হিসেবে দেখা হলেও অন্য কোনো নেতাও ক্ষমতায় আসতে পারেন। কোনো দল জোটে সমর্থন দেওয়ার শর্ত হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর পদ দাবি করলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

কোনো পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে এবং সংখ্যালঘু সরকার গঠন সম্ভব না হলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা দেখা দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে নতুন নির্বাচন আয়োজন করতে হবে এবং অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকবেন নেতানিয়াহু। ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা না হওয়ায় ইসরায়েলে পাঁচবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। 

সময়ের আলো/জেডি 
  বিষয়:   সর্বোচ্চ ভোট  ইসরায়েল  নির্বাচন  টানটান লড়াই 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: