রাজধানীর কারওয়ান বাজার রেললাইনে দিবালোকে চলছে নিষিদ্ধ মাদকের কেনাবেচা। ট্রেনের কোলাহল ও জনাকীর্ণ পরিবেশের সুযোগ নিয়ে ছদ্মবেশী কারবারিরা প্রতিনিয়ত হাতবদল করছে বিভিন্ন মরণঘাতী মাদক। গতকাল বুধবার তোলা। ছবি : আবদুল হালিম ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে তাদের কয়েকটি গ্রুপ, ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চলে ছিনতাই। আর সেখান থেকে পাওয়া মোবাইল ফোন জমা দেয় কমলাপুরে থাকা এক ম্যানেজারের কাছে। চাইলেও সেই ম্যানেজার ছাড়া নিজেরা বিক্রি করতে পারে না সেসব ফোন। কমলাপুর রেলস্টেশন এলাকা যেন তাদের ‘হেড অফিস’। আর তার আশপাশ থেকে শুরু করে তেজগাঁও রেলস্টেশন ও কারওয়ান বাজার হয়ে পুরো রেললাইন তাদের দুষ্কর্মের বড় ক্ষেত্র।
সারাবেলা ছিনতাই-চুরির কাজ শেষে দুপুর গড়ালে লোকাল ট্রেনে চেপে দলবেঁধে তেজগাঁও স্টেশনে চলে আসে অপরাধীরা। পরে সাতরাস্তার ‘ভালো কাজের হোটেলে’ ভাত খায়। দুপুরের খাওয়া শেষে ফের ট্রেনে চড়ে ফিরে যায় কমলাপুর রেলস্টেশনসহ নিজ নিজ পয়েন্টে।
তাদের কেউ কেউ আবার ওই ভালো কাজের হোটেলে দুপুরের দিকে নির্দিষ্ট একটি সময় কাজ করে থাকে। পরে সেখান থেকে বেঁচে যাওয়া কিংবা কাজের বিনিময়ে পাওয়া খাবার অথবা বিভিন্ন উপায়ে নিয়ে আসা খাবার হোটেলে অল্প দামে বিক্রি করে দেওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। আর ওই রেললাইনের কোল ঘেঁষে ইয়াবা, গাঁজা ও বিয়ারসহ মাদক বিক্রি যেন চিরচেনা দৃশ্য। তবে সেখানকার মাদক বিক্রেতাদের বেশিরভাগই নারী। তারা যেন কেনাবেচায় কোনো বিপদে না পড়ে সে জন্য দূর থেকে মনিটরিং করে চক্রের কিছু পুরুষ সদস্য। এ ছাড়া তেজগাঁও এলাকার ওই রেললাইন এরিয়ায় জুয়া ও অনৈতিক কার্যকলাপসহ নানা অপকর্ম চলে। এতে জড়িত সবাই ছিন্নমূল কিংবা ভাসমান মানুষ। রেললাইন এলাকাটি এখন অন্ধকার জগৎ। যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ অন্যদের নজর নেই বললেই চলে। আর এক-দুবার মাদকবিরোধী অভিযান চালালেও তা যেন নিতান্তই বাধ্য হয়ে নিয়ম রক্ষার কাজের অংশ।
মঙ্গলবার তেজগাঁও রেলস্টেশন এলাকার কয়েক কিলোমিটার সরেজমিন ঘুরে এসব চিত্র দেখা যায়। সে সময় ছদ্মবেশে মাদক ও কম দামে চোরাই মোবাইল কিনতে গিয়ে একাধিক ছিনতাইকারী ও মাদক কারবারির সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। আর তাতেই মেলে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য। এদিন কারওয়ান বাজারের পেছনের রেললাইনে উঠতেই দেখা মেলে দুই নারীর— যাদের বয়স আনুমানিক ৩৫ বছর। কাছে যেতেই তাদের একজন আস্তে করে বলে ‘লাগবে নাকি?’ পরক্ষণে তার হাতের মধ্যে থাকা একটি পলিথিনে দেখা যায় লাল রঙের বেশ কিছু ইয়াবা। কথা বলে জানা যায়, প্রতি পিস আড়াইশ টাকা। তবে ১০০ পিস ইয়াবা চাইলে সে এতগুলো একসঙ্গে নিতে ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে দিতে হবে বলে জানায়। এ সময় তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক যুবক এগিয়ে আসে।
তারপর ১০০ পিসের কথা শুনে জিগ্যেস করে, ‘আসলেই কি ১০০ পিস লাগবে?’ সম্মতি জ্ঞাপন করলে তিনি বলেন, ‘আপনাকে প্রথমে না করা হয়েছে কারণ অনেক আইনের লোক সিভিলে এসে এভাবে চায়। পরে স্বাভাবিক কাস্টমার কি না— সেই বিষয়ে নিশ্চিত হয়েই আমরা মাল দিই।’
তিনি বলেন, ‘মাল দেওয়া যাবে। তবে ২৫ হাজার টাকার মাল কমিয়ে সর্বশেষ ২২ হাজার ৫০০ টাকা রাখা যাবে।’
এর চেয়ে কম দামে আর কেউ দেবে না বলেও জানায় সে। এ ছাড়া গাঁজার পোঁটলা ৫০ টাকা বলে জানায় ওই নারী। পরে রেললাইন ধরে একটু এগিয়ে গিয়েও এমন একাধিক নারীকে দেখা যায় ইয়াবা হাতে। তবে চোখ আটকে যায় ১০ থেকে ১২ বছরের একটি শিশুর দিকে। জায়গাটিতে কিছুটা ভিড়ও দেখা যায়। কাছে গিয়ে দেখা যায় ওই শিশু ক্রেতাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে গুনে গুনে বড় পলিথিনে রাখছে। পরে সঙ্গে থাকা একটি মহিলাকে বলছে ক্রেতাদের মাল দিতে। তখন টাকা হিসেবে ও চাহিদা অনুযায়ী ক্রেতাদের লাল ও লালচে-কমলা কালারের ইয়াবা দিচ্ছে ওই মহিলা। তবে ইয়াবা কিনতে আসা অধিকাংশ মধ্যবয়সি পুুরুষ ও কিছু তরুণও রয়েছে। তবে ওই নারী ১০০ পিস ইয়াবা একদাম ২৪ হাজার টাকা রাখবে বলে জানায় প্রতিবেদককে।
আরেকটু এগিয়ে এসে কথা হয় নজরুল নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে। প্রথমে সে কথা বলতে না চাইলেও ক্রেতা হিসেবে তার বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারার পর কথা বলে সে। এ সময় সে ইয়াবা ছাড়া মদ পাওয়ার কথাও জানায়। সে বলে, বিয়ার ৮০০ টাকা ও ব্র্যান্ডি ১৬০০ টাকা পড়বে। এ ছাড়া প্রয়োজনে জায়গা মতো দিয়ে আসা হবে মাল। তবে সে ক্ষেত্রে পরিচিত ও বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। অন্যথায় সেটা রিস্ক হয়ে যাবে তার জন্য।
ইয়াবা বিক্রিতে লাভের বিষয়ে সে বলে, এখানে যারা বিক্রি করে তারা ম্যানেজারদের কাছ থেকে এনে বিক্রি করে। প্রতি পিসে ১০-১৫ টাকা লাভ পায় বিক্রেতারা। আর বিয়ারে ১০০ টাকা।
মূল হোতা ওই ম্যানেজারদের কাছ থেকে অল্প দামে মাদক নিতে চাইলে তাদের কোথায় পাওয়া যাবে— এমন প্রশ্নে সে বলে, ম্যানেজাররা সরাসরি বিক্রি করেন না। তারা তো এই সময়ে (দুপুরে) বাসায় শুয়ে আছেন। আরাম করছেন। তারা অর্ডার দিয়েই কাজ করান।
এক পর্যায়ে পুলিশের অভিযানের বিষয়ে জানতে চাইলে সে বলে, ‘এখন একটু ঝামেলাই আছে। মাঝে মাঝে সিভিল বেশেও পুলিশ আসে। তবে এখানে অভিযান নিয়মিত চলে না। আর এখানকার বিক্রেতাদের ধরেই বা কী হবে! যারা ম্যানেজার তাদের ধরলে হয়তো এটা নিয়ন্ত্রণ হতো।’
অন্যদিকে সময় তখন বেলা প্রায় ৩টা। লোকাল একটি মেইল ট্রেন আসে তেজগাঁও স্টেশনে। তখন স্টেশনের সামনে প্ল্যাটফর্মের শেষ অংশে বসে আছে কয়েকজন। বেশভূষায় তাদের চিনতে খুব একটা বেগ পেতে হয় না। কাছে গিয়ে আস্তে করে জিগ্যেস করি ‘কমদামি ফোন আছে কি?’ তখনই টোপ গিলে নেয় ২৫ থেকে ৩০ বছরের ওই যুবক।
সে বলে, ‘এখন এখানে মোবাইল পাবেন না। কমলাপুর চলে যান। সব টানা (ছিনতাই) মোবাইল সেখানে ম্যানেজারের কাছে জমা দেওয়া হয়। তবে এখান থেকে নিতে হলেও দেওয়া যাবে। আপনি আগামীকাল আসেন।’
দামের বিষয়ে জানতে চাইলে সে বলে, ‘চার-পাঁচ হাজার হলে ভালো মোবাইল দেওয়া যাবে। যেগুলোর আসল দাম ১৮ থেকে ২০ হাজার।’
তবে দুই হাজারের মধ্যে একটি ফোনের ব্যবস্থা করে দেওয়া যাবে কি না জানতে চাইলে বলে, দেওয়া যাবে— সেগুলো কম দামি মোবাইল। তবে ম্যানেজার ছাড়া আমরা মোবাইল বিক্রি করতে পারি না। আমরা যা পাই তা ম্যানেজারকে দিই। পরে বিক্রির টাকা অর্ধেক করে ভাগাভাগি হয়। কেউ চাইলেও নিজে থেকে একা একা ফোন বাইরে বিক্রি করতে পারে না।
ওই যুবক বলে, ‘চুরি বা ছিনতাই করা মোবাইলগুলো গুলিস্তান ও যাত্রাবাড়ীতে বিক্রি হয়। তবে কেউ ম্যানেজারকে না জানিয়ে বিক্রি করতে গেলে ধরা খেয়ে যায়। কারণ যারা কিনে নেয় তারা জানিয়ে দেয়। সিন্ডিকেট টের পেয়ে যায়।’
এসব কথার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ট্রেনের হুইসেল বেজে ওঠে। তখন ওই যুবকের সঙ্গে থাকা কয়েকজন ট্রেনে উঠে পড়ে। সেও যেতে চায়। কোথায় যাচ্ছে জানতে চাইলে সে বলে, ‘সবাই কমলাপুর যাব।’
তা হলে এখানে কেন এসেছ? জানতে চাইলে বেরিয়ে আসে আরেক চাঞ্চল্যকর তথ্য।
সে বলে, ‘এখানে খাইতে আসছি। ওই সাতরাস্তার ওখানে থাকা ‘ভালো কাজের হোটেলে’ এসে আমরা খাই। আবার যার যার মতো কমলাপুর চলে যাই। এখানে ফ্রিতে এসে খাই, টেনশন নাই।’
খারাপ কাজ করে এসে ভালো কাজের হোটেলে খাও— এমন প্রশ্নে হেসে দেয় ওই ছিনতাইকারী।
পরে ট্রেনটি চলে গেলে আবারও কারওয়ান বাজারের দিকে এগোতে থাকলে ৭-৮ জন যুবককে বসে থাকতে দেখা যায়। যাদের মধ্যে একজন পলিথিনের ভেতরে থাকা খিচুড়ির মধ্য থেকে সিদ্ধ ডিম আলাদা করে আরেকটি পলিথিনে রাখছে। যেখানে তাদের ২১টি ডিম আলাদা করতে দেখা যায়। পরে তাদের কাছে জানতে চাইলে একজন বলে, ‘ভাই আমরা তিন ঘণ্টা কাজ করছি ভালো কাজের হোটেলে। তাই এই খিচুড়ি-ডিমগুলো দিয়েছে। ডিমগুলো আলাদা করে কী করা হবে জানতে চাইলে একপর্যায়ে বলে, ‘এগুলো দোকানে (ছোট হোটেল) দিয়ে দেব। প্রতি পিস ১০ টাকা করে পাওয়া যাবে। যেই টাকা আসবে তা দিয়ে চা-বিড়ি হয়ে যাবে।’
অন্যদিকে স্টেশনে ফেলে রাখা ট্রেনের বগির পেছনে ছিন্নমূল নারী-পুরুষরা অনৈতিক কার্যক্রমে জড়ানোর তথ্য মেলে। এদিন তেজগাঁও স্টেশনে ছিন্নমূল এক নারীকে আরেক ছিন্নমূল ব্যক্তি ১০০ টাকা দেওয়ার শর্তে অনৈতিক কাজ করার কথা বলতেও শোনা যায়। এ ছাড়া অনৈতিক কাজে জন্ম হওয়া নবজাতক বিক্রি করে দেওয়ার তথ্যও জানায় সেখানকার এক ছিন্নমূল ব্যক্তি। রেললাইনের পাশে খোলা জায়গায় গাঁজা ও ইয়াবাসহ জুয়া খেলতে দেখা গেছে তাদের অনেককেই। সব মিলিয়ে রেললাইনে এক অপরাধ জগৎ গড়ে উঠেছে। তবে সেসব অপরাধ নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শক্ত ভূমিকা নিতে দেখা যায় না। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে দিন দিন।
ছিন্নমূলরা এভাবেই এক পর্যায়ে অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠছে জানিয়ে অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক সময়ের আলোকে বলেন, মাদক, চুরি ও ছিনতাইসহ রেললাইনকেন্দ্রিক নানা ধরনের অপরাধপ্রবণতা রয়েছে। আর ছিন্নমূল মানুষদের বড় একটি অংশ রেললাইনের দুই পাশে আশ্রয় নিয়ে বসবাস করে। এসব মানুষের অনেকেই অসহায়, অনিরাপদ জীবনযাপন এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তারা বেঁচে থাকার প্রক্রিয়ায় একপর্যায়ে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে। আবার অনেকে অপরাধকে পুঁজি করেই জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছে। ফলে রেললাইন ও রেলস্টেশন ঘিরে অপরাধের একটি বাজার তৈরি হচ্ছে।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, রেললাইন ও রেলস্টেশনসংলগ্ন এলাকাকে অপরাধমুক্ত করতে রেল কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এর অংশ হিসেবে এসব এলাকায় ধারাবাহিকভাবে অভিযান পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে ছিন্নমূল ও অপরাধে জড়িয়ে পড়া ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে পুনর্বাসন করে স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তৌহিদুল হক বলেন, মাদকাসক্ত ও অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের চিকিৎসা এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে এনে যোগ্য ও আইন মান্যকারী নাগরিক হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ ধরনের উদ্যোগ ধারাবাহিকভাবে নেওয়া হলে রেললাইনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অপরাধের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
রেললাইন ঘিরে এসব অপরাধ দমনে প্রতিবন্ধকতা কী কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা জানতে চাইলে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) আক্কাছ আলী সময়ের আলোকে বলেন, রেললাইনকে ঘিরে গড়ে ওঠা অপরাধ দমনে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। থানা পুলিশের সঙ্গে রেলওয়ে পুলিশও কাজ করছে। তবে সর্বশেষ কবে অভিযান চালানো হয়েছে এমন প্রশ্নে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট সময় বলতে গেলে দেখে বলতে হবে। ডিসি স্যার ভালো বলতে পারবেন।
রেললাইন এলাকার অপরাধ দমনে পুলিশের দীর্ঘমেয়াদি কী পরিকল্পনা রয়েছে সেই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কিছু জানাতে পারেননি। এ সময় ডিসির সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।
তবে বিষয়টি নিয়ে মতামত জানতে ওই বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজানকে একাধিক বার কল করা হলেও তিনি কোনো রেসপন্স করেননি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে