নতুন পরজীবীর হুমকিতে অস্তিত্ব সংকটে মৌমাছি

সময়ের আলো ডেস্ক

বিবিধ

মৌচাকের ভেতরে মোমে ঢাকা একটি ছোট্ট কোষ। সেখানে বেড়ে উঠছে মৌমাছির বাচ্চা। বাইরে থেকে সব স্বাভাবিক মনে হলেও কোষটির ভেতরে

2026-10-29T02:29:45+00:00
2026-10-29T02:29:45+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬,
১৩ কার্তিক ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
বিবিধ
নতুন পরজীবীর হুমকিতে অস্তিত্ব সংকটে মৌমাছি
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ২:২৯ এএম 
মৌমাছির শরীরে পরজীবী মাইটের (লাল বৃত্ত চিহ্নিত) আক্রমণ। ছবি : ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক
মৌচাকের ভেতরে মোমে ঢাকা একটি ছোট্ট কোষ। সেখানে বেড়ে উঠছে মৌমাছির বাচ্চা। বাইরে থেকে সব স্বাভাবিক মনে হলেও কোষটির ভেতরে লুকিয়ে আছে ভয়ংকর এক শত্রু। ক্ষুদ্র পরজীবীটি বাচ্চা মৌমাছির শরীর থেকে খাবার সংগ্রহ করছে। একই সঙ্গে সেখানে জন্ম নিচ্ছে তার নতুন প্রজন্ম। একসময় দুর্বল হয়ে পড়ে মৌমাছির বাচ্চাটি। বিকৃত হয়ে যেতে পারে তার পাখা ও পা। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে পুরো মৌচাক। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক।

এই পরজীবীর নাম ট্রোপিলাইল্যাপস। এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে মৌমাছির জন্য পরিচিত হুমকি হলেও এখন নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে বিজ্ঞানীদের। কারণ এর বিস্তার ঠেকাতে না পারলে উত্তর আমেরিকার মৌমাছি পালন ও কৃষির ওপরও বড় আঘাত আসতে পারে। এরই মধ্যে পরজীবীটির দ্রুত বংশবিস্তার, শীতকালে টিকে থাকার কৌশল এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের উপায় খুঁজতে মাঠে নেমেছেন গবেষকরা।

ভারোয়ার চেয়েও ভয়ংকর?

মৌমাছি পালনকারীদের কাছে ভারোয়া নামের আরেকটি মাইট বহুদিন ধরেই আতঙ্কের নাম। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৮৭ সালে শনাক্ত হওয়ার পর দেশটির মৌচাকগুলোতে এটি বড় সমস্যা হয়ে ওঠে। মৌমাছির শরীরের ক্ষতি করার পাশাপাশি বিভিন্ন ভাইরাস ছড়াতেও ভূমিকা রাখে এই পরজীবী। সংক্রমণ, কীটনাশকের প্রভাব, আবাসস্থল হারানো ও জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ মিলিয়ে মৌমাছির কলোনি টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এ অবস্থায় ট্রোপিলাইল্যাপসের বিস্তার বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবাচ্ছে। আকারে এটি মাত্র প্রায় শূন্য দশমিক ৭৫ মিলিমিটার। শরীর অনেকটা স্বচ্ছ হওয়ায় মৌচাকের ভেতরে সহজে চোখে পড়ে না। আরও বড় সমস্যা হলো— এর বংশবৃদ্ধির গতি তুলনামূলক বেশি। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ট্রোপিলাইল্যাপস প্রায় প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ডিম দিতে পারে এবং সাত দিন বা তার কম সময়ে পূর্ণবয়স্ক হয়ে ওঠে। অন্যদিকে ভারোয়ার পূর্ণবয়স্ক হতে সাধারণত প্রায় ১০ দিন লাগে।

ট্রোপিলাইল্যাপসের স্ত্রী মাইট মৌমাছির বাচ্চা বেড়ে ওঠার কোষে ঢুকে পড়ে। মোমের ঢাকনায় কোষটি বন্ধ হয়ে গেলে সেখানে ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে বের হওয়া নতুন মাইটগুলোও একই বাচ্চার শরীর থেকে খাবার সংগ্রহ করে বেড়ে ওঠে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই একটি মৌচাকে পরজীবীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে পারে।

সংক্রমণের শিকার মৌমাছির পাখা বিকৃত হওয়া, চলাচলে অক্ষমতা, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়া এবং ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় কলোনির নতুন প্রজন্ম। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে একপর্যায়ে পুরো মৌচাক ভেঙে পড়তে পারে।

একই কোষে দুই শত্রু

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো বোল্ডারের কীটতত্ত্ববিদ ও ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক এক্সপ্লোরার স্যামি রামসে ২০১৭ সালে থাইল্যান্ডে প্রথম কাছ থেকে ট্রোপিলাইল্যাপসের তাণ্ডব দেখেন। এরপর থেকে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে মৌমাছির ওপর এর প্রভাব নিয়ে কাজ করছেন তিনি।

সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপে গবেষণার সময় রামসে ও তার দল একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের মুখোমুখি হন। একই মৌকোষে তারা ট্রোপিলাইল্যাপস ও ভারোয়া— দুই পরজীবীকেই দেখতে পান। আরও বিস্ময়কর বিষয়, দুটিই সেখানে বংশবিস্তার করছিল।

আগে একই মৌচাকে দুই ধরনের মাইটের উপস্থিতি দেখা গেলেও একই কোষে একই সময়ে উভয়ের বংশবিস্তারের বিষয়টি গবেষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দুটি পরজীবী পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে একে অন্যের সংখ্যা কমিয়ে দেবে— এমন ধারণার পক্ষে নিশ্চিত প্রমাণ নেই। বরং একই বাচ্চা মৌমাছির ওপর দুই পরজীবীর আক্রমণ ক্ষতি আরও বাড়াতে পারে।


ট্রোপিলাইল্যাপস নিয়ে বিজ্ঞানীদের উদ্বেগের আরেকটি কারণ এর বিস্তারের ধরন। একসময় ধারণা ছিল, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই পরজীবী শীতপ্রধান অঞ্চলে সহজে টিকতে পারবে না। কারণ এটি মূলত মৌমাছির বেড়ে ওঠা বাচ্চার ওপর নির্ভরশীল। তাপমাত্রা কমলে মৌচাকে বাচ্চা উৎপাদন কমে যেতে পারে, ফলে পরজীবীর খাবার ও বংশবিস্তারের সুযোগও সীমিত হওয়ার কথা।

কিন্তু রাশিয়া, কাজাখস্তান ও জর্জিয়ার মতো শীতপ্রধান অঞ্চলেও এর উপস্থিতির খবর পাওয়া গেছে। সেখানে শীতের সময় মাইটগুলো কোথায় থাকে, কীভাবে টিকে যায় এবং পরে আবার সক্রিয় হয় তা এখনও স্পষ্ট নয়।

প্রতিরোধের উপায় খুঁজছেন বিজ্ঞানীরা

ট্রোপিলাইল্যাপস নিয়ন্ত্রণে একাধিক পদ্ধতি পরীক্ষা করা হচ্ছে। এর একটি হলো ফর্মিক অ্যাসিডের বাষ্প ব্যবহার। প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া এই অ্যাসিড নির্দিষ্ট মাত্রায় প্রয়োগ করলে মাইট মারতে পারে। জেজু দ্বীপে পরীক্ষামূলকভাবে অ্যাসিডে ভেজানো পাতলা কাঠের ফালি মৌচাকের ফ্রেমের নিচে রাখছেন গবেষকরা। সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়া বাষ্প পরজীবীর ওপর প্রভাব ফেলবে বলে তাদের আশা।

তবে এই পদ্ধতিতে ভারসাম্য রাখা জরুরি। অ্যাসিডের ঘনত্ব কম হলে মাইট মরবে না, আবার বেশি হলে মৌমাছিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ ছাড়া আক্রান্ত ফ্রেম নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা এবং মৌচাকে প্রয়োগযোগ্য অন্য কিছু উপাদানের কার্যকারিতাও পরীক্ষা করা হচ্ছে।

২০২৪ সালে সায়েন্টিফিক রিপোর্টস সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় মৌমাছির বাচ্চা উৎপাদনে সাময়িক বিরতি তৈরির সঙ্গে ফর্মিক বা অক্সালিক অ্যাসিডের চিকিৎসা মিলিয়ে ব্যবহারের ফল পরীক্ষা করা হয়। গবেষণায় এই সমন্বিত পদ্ধতিতে মাইটের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। তবে একটি পদ্ধতিতেই সব পরজীবী নির্মূল করা সম্ভব— এমন নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।

রামসে ও তার দল এমন একটি পরীক্ষাপদ্ধতিও তৈরির পরিকল্পনা করছেন, যার সাহায্যে মৌমাছির ক্ষতি না করেই দ্রুত মৌচাকে মাইটের উপস্থিতি শনাক্ত করা যাবে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের গবেষণাগারের মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং নিয়মিত নজরদারির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।

বিপদটি যে কেবল আশঙ্কার পর্যায়ে নেই, তার নজির মিলেছে যুক্তরাষ্ট্রেও। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দক্ষিণ এশিয়া থেকে নিউ জার্সির উদ্দেশে যাত্রা করা একটি পণ্যবাহী জাহাজে মৌমাছির একটি ঝাঁক শনাক্ত হয়। পরে পরীক্ষা করে ওই মৌমাছিগুলোর সঙ্গে ২৮টি ট্রোপিলাইল্যাপস মাইট পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর আগেই ঘটনাটি ধরা পড়ে। তবে এটি দেশটিতে পরজীবীটির স্থায়ী বিস্তারের প্রমাণ নয়।

বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, একবার কোনো অঞ্চলে স্থায়ীভাবে ছড়িয়ে পড়লে এই পরজীবী নির্মূল করা কঠিন হতে পারে। তাই শুধু আক্রান্ত মৌচাকের চিকিৎসা নয়, নতুন অঞ্চলে এর প্রবেশ ঠেকানো, দ্রুত শনাক্ত করা এবং এক মৌচাক থেকে অন্যটিতে ছড়িয়ে পড়ার পথ বন্ধ করাও জরুরি।


সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে
  বিষয়:   নতুন পরজীবী  হুমকি  অস্তিত্ব  সংকট  মৌমাছি 


Advertisement
Loading...
Loading...
বিবিধ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: