ছবি : এআই জেনারেটেড দেশের অর্থনীতির আকার বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের অক্টোবর ২০২৬ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক অনুযায়ী দেশের মোট জিডিপির আকার এখন ৫০৬.৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৬২ লাখ কোটি টাকা, যা বিশ্বে ৩৬তম। ২০২৫ সালে ছিল ৪৫৮ বিলিয়ন, ২০২০ সালে ছিল ৩৫০ বিলিয়ন। আবার গত ১৫ বছর ধরে বলা হয়েছে— জিডিপি ৬ থেকে ৭ শতাংশ বাড়ছে। কিন্তু সেই জিডিপি কোথায় যাচ্ছে? কাদের পকেটে যাচ্ছে? বিশ্বব্যাংকের সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ প্রকাশিত সবশেষ গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখন ক্লাসিক ‘জবলেস গ্রোথ’ বা কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধির ফাঁদে পড়েছে। তার মানে দেশে জিডিপির আকার বাড়ছে কিন্তু চাকরি বা কর্মসংস্থান বাড়ছে না।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রকৃত জিডিপি গড়ে বছরে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ হারে বেড়েছে। কিন্তু সে হারে চাকরি বাড়েনি। অর্থনীতিতে একটি শব্দ আছে— এমপ্লয়মেন্ট ইলাস্টিসিটি বা কর্মসংস্থান স্থিতিস্থাপকতা। এর মানে হলো, জিডিপি ১ শতাংশ বাড়লে চাকরি কত শতাংশ বাড়ে। ২০০৩ থেকে ২০১০ সালে এই হার ছিল ০.৪৪। এর অর্থ জিডিপি ১ শতাংশ বাড়লে চাকরি বাড়ত ০.৪৪ শতাংশ। ২০১০ থেকে ২০১৭ সালে তা কমে ০.২২ শতাংশে নেমে আসে। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালে সামান্য বেড়ে ০.২৭ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ আগে জিডিপি বাড়লে প্রায় অর্ধেক হারে চাকরি বাড়ত, এখন এক-চতুর্থাংশও বাড়ে না। কর্মসংস্থানের স্থিতিস্থাপকতার আরও ভয়ংকর চিত্র শিল্প ও উৎপাদন খাতে। ২০০৩-২০১০ সালে শিল্প খাতের স্থিতিস্থাপকতা ছিল ০.৮৪ শতাংশ।
২০১৭-২০২৪ সালে সেটি ঋণাত্মক হয়ে দাঁড়ায় ০.০৪ শতাংশ। উৎপাদন বা ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের অবস্থা আরও খারাপ। এ খাতে স্থিতিস্থাপকতা ঋণাত্মক ০.১০ শতাংশ। এর অর্থ হলো— গত সাত বছরে দেশে শিল্পের উৎপাদন বেড়েছে, ফ্যাক্টরির মালিকদের আয় বেড়েছে, কিন্তু চাকরি কমেছে। বেসরকারি খাতের মালিকদের ফ্যাক্টরি বড় হয়েছে, কিন্তু শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে।
কেন এমন হচ্ছে?
এমনটি হওয়ার পেছনে বিশ্বব্যাংক তিনটি কারণ চিহ্নিত করেছে। প্রথমত— অটোমেশন ও সস্তা শ্রমের ফাঁদ। গার্মেন্টস মালিকরা এখন মানুষের বদলে অটো কাটিং মেশিন, অটো স্প্রেডিং মেশিন বসাচ্ছেন। একটি মেশিন ১০ জন শ্রমিকের কাজ করে। উৎপাদন বাড়ে, কিন্তু চাকরি বাড়ে না।
গবেষণা বলছে, এআই ও অটোমেশনের কারণে এশিয়ায় এআই-এক্সপোজড চাকরির চাহিদা ১০ শতাংশ কমেছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত থেকে মোট রফতানি আয়ের ৮২ শতাংশ এলেও এ খাতে মোট কর্মসংস্থান মাত্র ৬ শতাংশ।
দ্বিতীয়ত বেসরকারি বিনিয়োগ আটকে আছে। বাংলাদেশে বেসরকারি বিনিয়োগ ১০ বছর ধরে জিডিপির ২৩ শতাংশে আটকে আছে। নতুন ফ্যাক্টরি হচ্ছে না। মূলত দুটি কারণে নতুন কারখানা হচ্ছে না— ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ ও গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন ২০২৬-এ ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৩৩.২ শতাংশ। এর অর্থ হলো— প্রতি ১০০ টাকা ঋণের মধ্যে ৩৩ টাকাই খেলাপি। ব্যাংকের টাকা আটকে গেছে। ফলে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ঋণ পাচ্ছেন না। ঋণের সুদ ১৫-১৬ শতাংশ। এই সুদে ব্যবসা হয় না। ফলে নতুন চাকরি তৈরি হয় না। অন্যদিকে রয়েছে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট। ফ্যাক্টরি চালানোর গ্যাস নেই। বিশ্বব্যাংক বলছে, জ্বালানি সংকটে ফ্যাক্টরিগুলো ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ক্যাপাসিটিতে চলছে। শিল্প মালিকরা নতুন লোক নিতে পারছে না।
তৃতীয়ত শিক্ষা ও দক্ষতায় রয়েছে বিস্তর ফারাক। আইএমএফের অক্টোবর ২০২৬-এর আঞ্চলিক আউটলুকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে ২৯ শতাংশই বেকার। সার্বিক যুব বেকারত্ব ১২ থেকে ১৩ শতাংশ, কিন্তু গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে এর হার দ্বিগুণেরও বেশি। দেশে ৪০ শতাংশ তরুণ পড়াশোনায় নেই, চাকরিতেও নেই, প্রশিক্ষণেও নেই। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় সার্টিফিকেট দিচ্ছে, কিন্তু চাকরির দক্ষতা দিচ্ছে না।
পরিসংখ্যানের চিত্র :
বর্তমানে দেশে বেকার ২৭.৩ লাখ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আরও ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে। পিপিআরসি বলছে, দারিদ্র্য ২০২২ সালের পর ১০ শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে ২৫ শতাংশ হয়েছে। প্রতি ৪ জনে ১ জন এখন গরিব। ১৮ শতাংশ মানুষ ভালনারেবল নন-পুওর। অর্থাৎ এ ধরনের মানুষ একটু ধাক্কা খেলেই গরিব হয়ে যাবে। আইএমএফ ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩.২ শতাংশ করেছে, আগে ছিল ৪.৩ শতাংশ। বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি হবে ১০.৯ শতাংশ। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক বলছে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৩.৪ শতাংশ, এডিবি বলছে ৪ শতাংশ। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি কমছে, দাম বাড়ছে, চাকরি হচ্ছে না। একে অর্থনীতির ভাষায় বলে ‘স্ট্যাগফ্লেশন।’
জিডিপির এই সংখ্যার মারপ্যাঁচ সাধারণ মানুষ বোঝে না :
জিডিপির এই সংখ্যার মারপ্যাঁচ সাধারণ মানুষ বোঝে না। জিডিপির বাইরে জিডিপির অঙ্কে এই গল্প আসে না। রাজশাহীর তাঁতি, চুয়াডাঙ্গার পেঁপেচাষি, মিরপুরের খাবারের দোকানদারের গল্পে এসব বিষয় আসে না। কারণ চুয়াডাঙ্গায় পেঁপের পাইকারি দাম কেজি ৪ টাকায় নেমেছে, উৎপাদন খরচ ১৩ থেকে ১৫ টাকা। এক মৌসুমের লোকসানে একটি কৃষক পরিবার গরিব হয়ে যায়। দিনাজপুরে আমন ধান চাষে খরচ বিঘায় ২০ হাজার টাকা, বিক্রি ১৭ হাজার টাকায়— লোকসান ৩ হাজার। আবার বিদেশে যাওয়ার পথও ঝুঁকিপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে সৌদিগামী ফ্লাইট বিঘ্নিত, ভিসা বাতিল হচ্ছে। চাকরির নামে রাশিয়ায় পাঠানো ৩০ জন তরুণের ২০ জন যুদ্ধে মারা গেছেন। দেশে কাজ না পেয়ে তরুণরা যেকোনো ঝুঁকি নিতে রাজি হয়ে যাচ্ছে।
জিডিপির আকারও বাড়ছে :
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের অক্টোবর ২০২৬ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক অনুযায়ী মোট জিডিপির আকার ৫০৬.৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৬২ লাখ কোটি টাকা, যা বিশ্বে ৩৬তম। ২০২৫ সালে ছিল ৪৫৮ বিলিয়ন, ২০২০ সালে ছিল ৩৫০ বিলিয়ন। অবশ্য মাথাপিছু জিডিপি ২,৮৮৬ ডলার। এবার ভারতকে (২,৭৪৯ ডলার) ছাড়িয়ে গেছে। তবে ক্রয়ক্ষমতার (পিপিপি) হিসাবে ভারত এখনও এগিয়ে আছে। ভারত ১২,৯৯৮ ডলার, বাংলাদেশ ১০,৮৮৪ ডলার।
জিডিপির আকার ৫০৬ বিলিয়ন হয়েছে ঠিক, কিন্তু প্রবৃদ্ধির হার ৩.২ শতাংশ। যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আইএমএফ বলছে ২০২৮ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২.২১ শতাংশে নামবে। জিডিপির ৫০৬ বিলিয়ন ডলার ১৭.৭ কোটি মানুষ দিয়ে ভাগ করলে ২,৮৮৬ ডলার হয়।
কিন্তু বাস্তবে বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০২৫-২৬ সালে নতুন করে ২১ লাখ মানুষ গরিব হয়েছে। দেশে এখন ২৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে। অর্থাৎ জিডিপি বাড়ছে ওপরের ১০ শতাংশ মানুষের জন্য।
সমাধানের পথ কী :
এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, শুধু জিডিপি বাড়ানোর নীতি বাদ দিয়ে কর্মসংস্থানকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে আনতে হবে। বেশি চাকরি তৈরি করে এমন খাতকে উৎসাহ দিতে হবে— কৃষিভিত্তিক শিল্প, ছোট ও মাঝারি শিল্প, আইসিটি, রফতানিমুখী বৈচিত্র্যময় পণ্য, শ্রমঘন খাত। শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও মালিকদের মধ্যে সমন্বয়, যাতে কোর্স শেষে চাকরি পাওয়া যায়। তিনি আরও বলেন, পাশাপাশি চাকরির মানোন্নয়ন করতে হবে।
দেশের ৯০ শতাংশ শ্রমিক অনানুষ্ঠানিক খাতে, কোনো চুক্তি নেই, বীমা নেই। অর্থনীতিবিদদের মতে— এটি অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা। প্রবৃদ্ধি দিয়ে দারিদ্র্য কমবে না, যদি মানুষের শ্রমের দাম না বাড়ে। অর্থনীতি যথেষ্ট ভালো চাকরি তৈরি না করেও বড় হতে পারে। বড় অবকাঠামো প্রকল্প, আবাসন, কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর মুনাফা জিডিপির অঙ্ক বাড়ায়। কিন্তু সেই অর্থ স্বল্প আয়ের খেটে খাওয়া মানুষের কাছে পৌঁছে না। তাই জিডিপি ৬ শতাংশ থেকে ৩.২ শতাংশে নামাটাই বড় খবর নয়। বড় খবর হলো— এই ৩.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতেও কতজন তরুণের চাকরি হবে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, আগামী অর্থবছরে মাত্র ৬.৩ লাখ নতুন চাকরি হবে, যা দারিদ্র্য কমানোর জন্য যথেষ্ট নয়। অথচ প্রতি বছর ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে ঢুকছে।
প্রশ্ন তাই একটাই— জিডিপি কার জন্য বাড়ছে?
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি