ছবি : সংগৃহীত সেঞ্চুরির অপেক্ষায় কেটেছে পুরো একটা রাত। আগের দিন ৯৯ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছেড়েছিলেন সাদমান ইসলাম। বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দিনের দ্বিতীয় বলেই পূর্ণ করেছেন তিন অঙ্কের ম্যাজিক ফিগার। ব্যক্তিগত অর্জনের সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি বাঁহাতি ওপেনারের। নিজের ইনিংসটা বড় করতে পারেননি, দলের বড় সংগ্রহের ভিতটাও পারেননি শক্ত করতে। বাংলাদেশ একসময় চারশ কিংবা পাঁচশ রানের স্বপ্ন দেখছিল, সেই দলই প্রথম ইনিংসে থেমেছে তিনশর আগে। তাই সেঞ্চুরির তৃপ্তির চেয়ে দলের ব্যাটিং বিপর্যয়ের আক্ষেপই বেশি সাদমানের কণ্ঠে।
মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম টেস্টের প্রথম দিন ৩ উইকেটে ২১৩ রান তুলেছিল বাংলাদেশ। হাতে ছিল ৭ উইকেট, ক্রিজে ছিলেন দারুণ ছন্দে থাকা সাদমান ও লিটন দাস। সেখান থেকে বড় সংগ্রহের পথে এগিয়ে যাওয়ার যথেষ্ট সুযোগ ছিল স্বাগতিকদের সামনে। কিন্তু দ্বিতীয় দিনের প্রথম সেশনেই বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। মাত্র ৫৯ রান যোগ করতেই বাকি ৭ উইকেট হারিয়ে ২৭২ রানে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশ। দিন শেষে সংবাদ সম্মেলনে তাই নিজের সেঞ্চুরির চেয়ে দলের ব্যাটিং ব্যর্থতা নিয়েই বেশি কথা বলতে হয়েছে সাদমানকে। বিশেষ করে টপ অর্ডারের ব্যাটাররা ভালো শুরু পেয়েও ইনিংস বড় করতে না পারায় হতাশ তিনি। তার মতে, শুরুটা কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিগত ইনিংসগুলো আরও বড় করতে পারলে দলের সংগ্রহও অনেক বেশি হতে পারত।
সাদমান বলেন, ‘এটা অবশ্যই আমাদের আরও ভালো করা উচিত। কারণ আমরা যদি টপ অর্ডাররা এই স্কোরটা আর একটু বড় ১৫০ বা ১৭০, ২০০ হয়, তা হলে হয়তোবা দলের রান ৪৫০-৫০০ হতে পারত। এটা আমাদের ভুল হয়ে গেছে। চেষ্টা থাকবে পরেরবার এরকম পরিস্থিতি এলে ইনিংস যত বড় করা যায়।’ বাংলাদেশের ব্যাটিং বিপর্যয়ের শুরুটা অবশ্য সাদমানের বিদায় দিয়েই। দিনের দ্বিতীয় বলেই সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন তিনি। মাইলফলক ছোঁয়ার পর বেশিক্ষণ উইকেটে থাকতে পারেননি। ২৩৪ বলে ১১ চারে ১০৫ রান করে অভিষিক্ত স্পিনার জশুয়া বিশপের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে ফেরেন এই ওপেনার।
এরপর দ্রুত বিদায় নেন আগের দিন আহত অবসর নেওয়া তাওহীদ হৃদয়ও। চোট কাটিয়ে ব্যাটিংয়ে ফিরলেও নতুন করে আর কোনো রান যোগ করতে পারেননি তিনি। ফলে ২২১ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে বাংলাদেশ। সেখান থেকে দলকে টেনে তোলার মতো জুটি আর গড়ে ওঠেনি। একের পর এক উইকেট হারিয়ে শেষ পর্যন্ত ২৭২ রানেই থামে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস। নিজের উইকেট হারানোকে এই বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সাদমান। তার মতে, লিটনের সঙ্গে জুটি ধরে রাখতে পারলে কিংবা আরও কিছুক্ষণ উইকেটে থাকতে পারলে ম্যাচের পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত।
সাদমানের ভাষায়, ‘আমি আর লিটন যখন ব্যাটিং করছিলাম, আমরা যদি বা আমি যদি কিছুক্ষণ খেলতে পারতাম বা আর একটু বড় করতে পারতাম, হয়তোবা সিনারিওটা অন্যরকম হতো। ওখানেই একটা মিস্টেক হয়ে গেছে।’ মিরপুরের উইকেটের আচরণ নিয়েও দ্বিতীয় দিনে আলোচনা হয়েছে। সকালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনারদের কয়েকটি বলে অস্বাভাবিক টার্ন দেখা গেছে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাটারদের দ্রুত ফিরে যাওয়ায় উইকেটের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে ব্যাটিং ব্যর্থতার জন্য উইকেটকে দায়ী করতে চাননি সাদমান। বরং প্রতিপক্ষের ভালো বোলিংয়ের পাশাপাশি নিজেদের ভুলকেও সামনে এনেছেন তিনি।
সাদমান বলেন, ‘উইকেটের জন্য এমন কিছু না। হয়তোবা ওরা ভালো বোলিং করছে, আমাদেরও কিছু ভুল ছিল। আমরা টপ অর্ডার বা আমি আর লিটন যদি একটা পার্টনারশিপ দিতাম, হয়তোবা এই সিনারিওটা হতো না।’ প্রথম দিনের শেষ দিকে আলোকস্বল্পতার কারণে নির্ধারিত সময়ের আগেই খেলা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাতে ব্যাটারদের ছন্দে কোনো ব্যাঘাত ঘটেছিল কি না, সংবাদ সম্মেলনে এমন প্রশ্নও করা হয় সাদমানকে। তবে বিরতির কারণে ব্যাটিংয়ের ছন্দ নষ্ট হয়েছে বলে মনে করেন না তিনি। তার যুক্তি, খেলা পুনরায় শুরু হওয়ার পরও তারা ভালো ব্যাটিং করেছেন এবং ওই সময়ে কোনো উইকেট পড়েনি।
ব্যাটিং নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল ও কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের কাছ থেকেও পরামর্শ নিয়েছেন সাদমান। সেই পরিশ্রমের প্রতিফলন মিলেছে তার তৃতীয় টেস্ট সেঞ্চুরিতে। তবে এই শতকও পুরোপুরি তৃপ্তি দিতে পারছে না তাকে। কারণ টেস্ট ক্রিকেটে শুধু তিন অঙ্কে পৌঁছানোই নয়, সেই ইনিংসকে আরও বড় করাও যে সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সাদমানের ১০৫ রানের ইনিংস বাংলাদেশের জন্য বড় সংগ্রহের ভিত গড়ার সুযোগ তৈরি করেছিল। কিন্তু টপ অর্ডারের অন্য ব্যাটারদের মতো তিনিও ইনিংসটা আরও লম্বা করতে পারেননি। অবশ্য ম্যাচে ফেরার সুযোগ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি বাংলাদেশের। দ্বিতীয় দিন শেষে ৪ উইকেট হারিয়ে ১৩৪ রান তুলেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের চেয়ে এখনও ১৩৮ রানে পিছিয়ে ক্যারিবীয়রা। এখন তৃতীয় দিনে বোলারদের পারফরম্যান্সের ওপরও নির্ভর করবে ম্যাচের গতিপথ।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি