জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর । ছবি : সময়ের আলো চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগরে শীর্ষ সন্ত্রাসী ও ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান মো. ইয়াসিনের নামে থাকা ৬৫টি জমির বিক্রয় দলিল এক দিনে রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীবের বিরুদ্ধে। বদলির আদেশ কার্যকরের ঠিক আগমুহূর্তে গত বুধবার এসব দলিল নিবন্ধন করা হয়। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। এর পরিপ্রেক্ষিতে সাব-রেজিস্ট্রারের বদলির আদেশ সাত দিনের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।
এদিকে, এক দিনে এতগুলো স্পর্শকাতর জমির দলিল নিবন্ধনের বিষয়টি সামনে আসার পর সীতাকুণ্ডের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফখরুল ইসলাম সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীবকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।
জিজ্ঞাসাবাদে সাব-রেজিস্ট্রার জানান, ইয়াসিন নিজে কার্যালয়ে উপস্থিত হননি। তার নামে থাকা জমিগুলো নিবন্ধন ও হস্তান্তরের আবেদনসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন। পরে এসব জমি বিভিন্ন ব্যক্তির নামে বিক্রির দলিল নিবন্ধন করা হয়।
এক দিনে এতগুলো দলিল নিবন্ধনের বিষয়ে জানতে চাইলে রায়হান হাবীব বলেন, ‘সীতাকুণ্ড ভূমি অফিসের কাগজপত্র অনুযায়ী জমিগুলো ইয়াসিনের নামে নামজারি করা রয়েছে। তিনি খাজনাও পরিশোধ করেছেন। কাগজপত্র সঠিক থাকায় দলিলগুলো নিবন্ধন করা হয়েছে। এ বিষয়ে আগে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানানো হয়েছে।’
জঙ্গল সলিমপুরের জমি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ ও প্রশাসনের তৎপরতার পরও কীভাবে দলিলগুলো নিবন্ধন করা হলো, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তারা কাগজপত্র যাচাই করেন। জঙ্গল সলিমপুরের জমি নিয়ে তাদের বিশেষ কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। আইন অনুযায়ী প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই দলিলগুলো নিবন্ধন করা হয়েছে।’
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘বিষয়টি বুধবার বিকেলে তারা জানতে পেরেছেন। পরে আইন মন্ত্রণালয়কে তদন্ত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। ইউএনও সাব-রেজিস্ট্রারকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ইয়াসিন নিজে কার্যালয়ে আসেননি। অন্য একজন কাগজপত্র নিয়ে আসায় বিধিমালা ও আইন অনুযায়ী দলিলগুলো নিবন্ধন করা হয়েছে।’
জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সংযোগ সড়ক ধরে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের বিপরীত পাশের পাহাড়ি সড়ক দিয়ে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় প্রবেশ করতে হয়। এলাকাটি মূলত জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর— এই দুই ভাগে বিভক্ত। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এখানে প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর মূল্যবান সরকারি খাসজমি রয়েছে।
নগরের লিংক রোডের আশপাশে প্রতি শতক জমির দাম ৯ থেকে ১০ লাখ টাকা হওয়ায় এলাকাটির ভূসম্পদের মূল্যও বিপুল। দীর্ঘদিন ধরে পাহাড় দখল, ভূমিদস্যুতা ও সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর তৎপরতার কারণে এলাকাটি আলোচিত। আলীনগর অংশটি পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ইয়াসিন ও তার সহযোগীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। সেখানে সরকারি খাসজমির পাশাপাশি কিছু ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিও রয়েছে।
গত ১৯ জানুয়ারি জঙ্গল সলিমপুরে এক চিহ্নিত আসামিকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালায় এসআরবির ( তৎকালীন র্যাব ) একটি দল। এ সময় ইয়াসিন বাহিনীর নেতৃত্বে স্থানীয়দের একাংশকে সঙ্গে নিয়ে এসআরবি সদস্যদের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে এসআরবি-৭ -এর উপসহকারী পরিচালক নায়েক সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। আহত হন বাহিনীর আরও তিন সদস্য। এ ঘটনায় ইয়াসিনসহ তার বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে সীতাকুণ্ড থানায় হত্যা মামলা হয়।
এরপর গত ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, এসআরবি, পুলিশ ও বিজিবির প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্যের সমন্বয়ে জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানের মাধ্যমে এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরপর ইয়াসিন ও তার সহযোগীরা আত্মগোপনে চলে যান।
যৌথ অভিযানের পর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জঙ্গল সলিমপুরের এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয় ও আলীনগর উচ্চবিদ্যালয়ে র্যাব-পুলিশের সমন্বয়ে দুটি স্থায়ী চৌকি স্থাপন করা হয়। বর্তমানে সেখানে বিভিন্ন বড় সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে সরকার।
এমন পরিস্থিতিতে গত সোমবার দেশের ৮৫ জন সাব-রেজিস্ট্রারকে একযোগে বদলি করা হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন সীতাকুণ্ডের সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীবও। বৃহস্পতিবারের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থলের দায়িত্ব হস্তান্তরের নির্দেশনা ছিল তাদের। বদলির ঠিক আগে ইয়াসিনের নামে থাকা ৬৫টি জমির দলিল নিবন্ধনের ঘটনায় তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি বর্তমানে প্রশাসনিক তদন্তের আওতায় রয়েছে।
সময়ের আলো/এসকে