স্পেনে একের পর এক প্রাণঘাতী ট্রেন দুর্ঘটনা। ছবি : ইউরোনিউজ স্পেনে একের পর এক প্রাণঘাতী ট্রেন দুর্ঘটনার ঘটনায় ইসরায়েলের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা ও সন্দেহ ছড়িয়ে পড়েছে। সর্বশেষ দুর্ঘটনার আগে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের কম্পিউটার ত্রুটি এবং স্বয়ংক্রিয় সংকেতব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ার বিষয়টি এ সন্দেহ আরও উসকে দিয়েছে। তবে এসব দুর্ঘটনার পেছনে ইসরায়েলের কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, এমন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
চলতি বছর স্পেনে তিনটি ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় অন্তত ১১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশটিতে রেল নিরাপত্তা ও সুরক্ষাব্যবস্থার মান নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। এর মধ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে স্পেনের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক বিরোধ এবং দেশটির সাবেক রেল নিরাপত্তা ও পরিবহন কর্মকর্তার একটি ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পাওয়ার ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তুরস্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
গত ২৮ অক্টোবর স্পেনের তোলেদো প্রদেশের উর্দা শহরের কাছে একটি দ্রুতগতির ট্রেন দাঁড়িয়ে থাকা আরেকটি ট্রেনের পেছনে ধাক্কা দেয়। এতে অন্তত ৬৮ জন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হন।
প্রাথমিক তদন্তে দুর্ঘটনার পেছনে কম্পিউটার ব্যবস্থার ত্রুটি এবং মানুষের একটি ‘ব্যাখ্যাতীত’ ভুলের বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেলপথের প্রায় ৬৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে স্বয়ংক্রিয় সংকেত ও নিরাপত্তাব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ে। এতে ওই এলাকার সব ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং নিয়ন্ত্রকদের ম্যানুয়ালি ট্রেন পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হয়।
এ সময় মাদ্রিদে দায়িত্ব পালনকারী এক নিয়ন্ত্রক পেছনের ট্রেনটিকে কোনো গতিসীমা ছাড়াই স্বাভাবিক গতিতে চলার অনুমতি দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পরই দ্রুতগতির ট্রেনটি সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনের পেছনে সজোরে ধাক্কা দেয়। ঘটনাটি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি পরিকল্পিত নাশকতা— তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন উঠছে।
এর আগে, গত ১৮ জানুয়ারি স্পেনের মাদ্রিদ-সেভিয়া রেলপথের আদামুজ এলাকায় একটি দ্রুতগতির ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে বিপরীত লাইনে চলে যায়। এ সময় বিপরীত দিক থেকে আসা আরেকটি ট্রেনের সঙ্গে সেটির সংঘর্ষ হয়। এতে ৪৬ জন নিহত এবং দেড় শতাধিক মানুষ আহত হন। তদন্তে রেললাইনের একটি অংশ ভেঙে যাওয়াকে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর আগে রেলচালকদের ইউনিয়ন নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছিল বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এর দুই দিন পর, ২০ জানুয়ারি বার্সেলোনার কাছে একটি যাত্রীবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হয়। এতে ট্রেনের চালক নিহত হন এবং আহত হন কয়েক ডজন যাত্রী। তদন্তে রেলপথের পাশের একটি সাপোর্ট ওয়াল ধসে পড়াকে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। দেয়ালের ধ্বংসাবশেষ রেললাইনে পড়ে ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়েছিল।
কেন ইসরায়েলের দিকে অভিযোগের আঙুল
স্পেনের ট্রেন দুর্ঘটনার সঙ্গে ইসরায়েলের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা নিয়ে আলোচনার পেছনে দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা।
প্রথমত, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও গণহত্যার সমালোচনা, ইসরায়েলের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং ইরানে হামলার উদ্দেশ্যে যাওয়া মার্কিন সামরিক উড়োজাহাজের জন্য নিজেদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেওয়াসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
এর জেরে স্পেনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এক বিবৃতিতে তিনি স্পেনের ‘ভণ্ডামি ও বৈরিতা’ সহ্য করবেন না বলে জানান। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনপন্থী কূটনৈতিক অবস্থানের কারণে দেশটিকে ‘তাৎক্ষণিক মূল্য’ দিতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন।
দ্বিতীয়ত, স্পেনের সাবেক পরিবহন সচিব ও রেল অবকাঠামো প্রতিষ্ঠানের প্রধান ইসাবেল পার্দো দে ভেরার একটি ইসরায়েলি রেল সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি সন্দেহ বাড়িয়েছে।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তেল আবিবভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সাইলাস তাকে নিজেদের উপদেষ্টা পর্ষদে নিয়োগ দেয়। এর আগে তিনি স্পেনের রাষ্ট্রীয় রেল অবকাঠামো প্রতিষ্ঠানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২০২১ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত দেশটির পরিবহনবিষয়ক সচিব ছিলেন।
তবে স্পেনের রেলব্যবস্থায় ওই প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা বা সাবেক কর্মকর্তার নিয়োগের সঙ্গে সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাগুলোর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
নাশকতা ও সাইবার হামলার অতীত
বিদেশে গোপন অভিযান, নাশকতা ও সাইবার হামলার অভিযোগে ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এবং সামরিক সাইবার ইউনিট ৮২০০-এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশে গোপন তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে।
২০০০-এর দশকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করতে স্টাক্সনেট নামের একটি কম্পিউটার ভাইরাস ব্যবহার করা হয়। এটিকে বিশ্বের প্রথম প্রকাশ্যে পরিচিত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত সাইবার অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ভাইরাসটি ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনার প্রায় এক হাজার সেন্ট্রিফিউজ অকেজো করে দিয়েছিল।
২০২০ সালে ইরানের বন্দর আব্বাসের কৌশলগত শহীদ রাজায়ি বন্দরে বড় ধরনের সাইবার হামলার পেছনেও ইসরায়েলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। ওই হামলায় বন্দরের যানবাহন চলাচল, জাহাজ পরিবহন ও টাগবোট নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত কম্পিউটার ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। এতে স্থল ও সমুদ্রপথে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়।
এ ছাড়া ২০২৪ সালে লেবাননে হিজবুল্লাহ সদস্যদের ব্যবহৃত হাজার হাজার পেজার ও হ্যান্ডহেল্ড রেডিওতে বিস্ফোরণের ঘটনায় ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের সংশ্লিষ্টতার কথা উঠে আসে। এতে বহু মানুষ নিহত ও আহত হন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা দাবি
স্পেনের সর্বশেষ ট্রেন দুর্ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে। দুর্ঘটনার আগে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় কম্পিউটার ত্রুটি, ইসরায়েলের সঙ্গে স্পেনের কূটনৈতিক বিরোধ এবং দেশটির রেলব্যবস্থায় ইসরায়েলি সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার বিষয়গুলোকে একসূত্রে মেলাচ্ছেন অনেকে।
জো ব্ল্যাক নামের এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী এক্সে লিখেছেন, ‘ইসরায়েল স্পেনের ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে।’
আরেক ব্যবহারকারী দাবি করেছেন, স্পেনের রেলব্যবস্থায় ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্ত রয়েছে এবং ইসরায়েলের হুমকির পর থেকেই দেশটিতে একের পর এক ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটছে।
অন্য এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘যেসব দেশ ইসরায়েলের বিরোধিতা করছে, সেসব দেশেই এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। অথচ তাদের কম্পিউটার ও নিরাপত্তাব্যবস্থার চুক্তি ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। বিষয়টি সত্যিই ব্যাখ্যাতীত।’
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ সামনে আসেনি। স্পেনের ট্রেন দুর্ঘটনাগুলোর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করতে হবে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ