ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ী ও যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। সংগৃহীত ছবি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক তৎপরতা নতুন গতি পেয়েছে। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ীর সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। চলমান যুদ্ধের অবসানে সমঝোতার পথ খুঁজতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এ প্রস্তাবের বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি এবং কোনো চুক্তিও ঘোষণা করা হয়নি।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য আলোচনার বিষয়ে ওয়াশিংটন পোস্টের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে গালফ নিউজ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কমান্ডার রেজাইকে তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে দেশটির নেতৃত্বের মধ্যে ঐকমত্য তৈরির সক্ষমতা রয়েছে তার।
এ ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে কাতার। দেশটির প্রতিনিধিরা রেজায়ীসহ ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরান সম্মত হলে আগামী সপ্তাহের শুরুতেই কাতার অথবা তুরস্কে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা শুরু হতে পারে। এ ছাড়া সম্ভাব্য বৈঠকের স্থান হিসেবে ইস্তাম্বুল ও দোহারের নামও আলোচনায় রয়েছে।
আলোচনায় বসার ক্ষেত্রে ইরানের পক্ষ থেকে পারমাণবিক ইস্যুতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন অনুমোদিত প্রতিনিধিদের পাঠানোর শর্ত দিয়েছেন ভ্যান্স। তাসনিম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পাঠানো চিঠি ইরান পেয়েছে, তবে এখনো এর জবাব দেয়নি।
অন্যদিকে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক জানিয়েছেন, তেহরানের দেওয়া সাতটি শর্ত পূরণ হলেই আলোচনায় অগ্রগতি সম্ভব হবে। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউস মনে করছে, কূটনৈতিক সমঝোতার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরানের অবস্থানেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি।
সামরিক প্রস্তুতিও অব্যাহত
কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক প্রস্তুতিও জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) মার্কিন কর্মকর্তারা আঞ্চলিক মিত্রদের সতর্ক করে বলেছেন, আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে সম্ভাব্য হামলা এবং এর জবাবে ইরানের পাল্টা আঘাতের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি বলে জানিয়েছেন দুই কূটনীতিক।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ দূত টম ব্যারাক বলেছেন, কাতার ও পাকিস্তানের সহযোগিতায় ওয়াশিংটন ও তেহরান আবারও কূটনৈতিক আলোচনার কাছাকাছি এসেছে। উত্তেজনা আরও বাড়ার আগেই দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাত বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ব্যারাক বলেন, আঞ্চলিক মিত্রদের সহযোগিতায় দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের একটি প্রক্রিয়া নিয়ে সমঝোতার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘চলুন, কিছু সময়ের জন্য বিরতি দিই এবং উত্তেজনা কমিয়ে আনি।’ প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছানোর ক্ষেত্রে দুই পক্ষকে ‘খুব কাছাকাছি’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট অগ্রসর হচ্ছে বলে জানা গেছে। এর সঙ্গে রয়েছে ১৩তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট। নভেম্বরের শেষ নাগাদ এগুলো ওই অঞ্চলে পৌঁছাতে পারে।
নিউক্লিয়ার শক্তিচালিত নিমিটজ শ্রেণির এ রণতরির সঙ্গে কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ রয়েছে। পাশাপাশি দুই হাজারের বেশি মেরিন সেনা বহনকারী আরেকটি উভচর সামরিক দলও মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে যাত্রা করেছে।
রুজভেল্ট মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ এবং ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনের সঙ্গে যুক্ত হবে। এর আগে এপ্রিলে জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ এবং আগস্টে আব্রাহাম লিংকনের পরিবর্তে জর্জ ওয়াশিংটন ওই অঞ্চলে পৌঁছায়।
ভ্যান্সের চিঠিতে পারমাণবিক ইস্যু
গত সপ্তাহে কাতারের মধ্যস্থতায় রেজাইয়ের কাছে একটি চিঠি পাঠান ভ্যান্স। এতে দুই দেশের জাতীয় স্বার্থের বিষয়গুলো তুলে ধরার পাশাপাশি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখাকে ওয়াশিংটনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিমান চলাচল স্বাভাবিক হচ্ছে
এদিকে আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যেও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) আকাশসীমা উন্মুক্ত রয়েছে। দেশটির বিমানবন্দরগুলোর কার্যক্রমও আগের অবস্থায় ফিরছে।
দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বর্তমানে শতভাগ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে। আকাশসীমা পুনরায় চালুর পর যাত্রীদের ট্রানজিট কার্যক্রম বৃদ্ধির মাধ্যমে বিমানবন্দরের ব্যস্ততা বেড়েছে।
সৌদি আরবের সঙ্গে বিমান চলাচলও ধাপে ধাপে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এমিরেটস ৩০ অক্টোবর থেকে জেদ্দায় ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা করেছে। রিয়াদ ও দাম্মামের ফ্লাইট ৮ নভেম্বর থেকে চালুর কথা রয়েছে। অন্যদিকে ফ্লাইদুবাই ৩০ অক্টোবর থেকে রিয়াদ, দাম্মাম ও আবহায় ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা করেছে। তবে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ৩০ অক্টোবরের নির্ধারিত ফিরতি ফ্লাইটগুলোর কোনোটিই পরিচালিত হয়নি। এ কারণে যাত্রীদের বুকিংয়ের সর্বশেষ অবস্থা যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ইতিহাদ এয়ারওয়েজের আবুধাবি থেকে রিয়াদ ও দাম্মামের সব ফ্লাইট ৫ নভেম্বর পর্যন্ত বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি জেদ্দাগামী চারটি ফ্লাইট (ইওয়াই৬০১ থেকে ইওয়াই৬০৪) বাতিল রয়েছে। পরিস্থিতির কারণে ফ্লাইট সূচিতে আরও পরিবর্তন আসতে পারে।
তেল আবিবের সঙ্গে এমিরেটসের কোডশেয়ার ফ্লাইটও পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত রয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩ ফ্লাইটকে ঘিরে নিরাপত্তা ঘটনার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে ইরানি এয়ারলাইনসগুলোর ইউএইগামী ও ইউএই থেকে ছেড়ে যাওয়া ফ্লাইটও বন্ধ রয়েছে।
যাত্রীদের বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফ্লাইটের অবস্থা নিশ্চিত হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কারণ দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আগমন বোর্ডে কিছু ফ্লাইট বাতিল দেখালেও সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের ওয়েবসাইটে সেগুলো নির্ধারিত বা চালু হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
ইউএইতে নতুন কোনো আকাশ প্রতিরক্ষা ঘটনা নেই
গালফ নিউজের সর্বশেষ দৈনিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের অভ্যন্তরে নতুন কোনো আকাশ প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
এর আগে চলতি মাসে দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, স্কুল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বিমানবন্দর কিংবা জরুরি সেবাগুলো সাধারণভাবে বন্ধ রাখার কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে জাতীয় জরুরি অবস্থা, সংকট ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনসিইএমএ) এবং স্থানীয় পুলিশের নির্দেশনা অনুসরণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কোনো সতর্কসংকেত শোনা গেলে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র বা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে পড়ে থাকা কোনো ধ্বংসাবশেষের কাছে যাওয়া, স্পর্শ করা কিংবা ছবি তোলা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
এদিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়েও উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। বাণিজ্যিক জাহাজ মাইনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে আইআরজিসির দেওয়া দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। সংস্থাটি জানিয়েছে, জাহাজ চলাচলের প্রধান পথগুলো মাইনমুক্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে আইআরজিসি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়াসহ তাদের দেওয়া কয়েকটি দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে না।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হলেও সামরিক প্রস্তুতি, বিমান চলাচলে বিধিনিষেধ এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যে অনিশ্চয়তা বজায় রেখেছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ